shono
Advertisement

Breaking News

Tarique Rahman

আইনের শাসন থেকে অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, জিয়নকাঠির খোঁজে তারেক 

দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পুনর্গঠন ও দলীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা– আপাতত এই চারটি ‘কি ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের ভাবী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাফল্যের চাবিকাঠি।
Published By: Kishore GhoshPosted: 07:09 PM Feb 16, 2026Updated: 08:18 PM Feb 16, 2026

‘প্রধানমন্ত্রী’ তারেককে প্রথমে চারটি বড় চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে–প্রথমত, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। গত ১৮ মাসে ‘মব’ সংস্কৃতির নামে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, চাঁদাবাজি-দখলবাজি, জুলুম ও হিন্দু-সহ ভিন্ন মতাবলম্বী মানুষদের উপর হামলার অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে। ইউনুস সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুরোপুরি ব্যর্থ ছিল। সাধারণ মানুষ অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি চায়। তাই আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠাকে দিতে হবে অগ্রাধিকার। লিখছেনবাংলাদেশ প্রতিদিন’ পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক ও ‘নিউজ টোয়েন্টি ফোর টিভি’র প্রাক্তন সিইও নঈম নিজাম

Advertisement

বাংলাদেশে ইউনুস যুগের অবসান হতে চলেছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি চলছে। যদিও কিছু আসনে ভোটের হার বাস্তবসম্মত নয়, ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ ভোটের পরিমাণ নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে, জামায়াতে ও এনসিপি-র কিছু আসনে শেষ মুহূর্তের জয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে– তবু আপাতত নতুন পথের দিকে যাত্রা শুরু হচ্ছে বাংলাদেশের।

‘ল‌্যান্ডস্লাইড’ বিজয় নিয়ে বিএনপি প্রধান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চলেছেন। ঘরে-বাইরে আলোচনা– কেমন হবে খালেদাপুত্রর নেতৃত্বাধীন আগামীর বাংলাদেশ? তিনি কি পারবেন ইউনুসের-সৃষ্ট উগ্রবাদের দিকে ঝুঁকে পড়া বাংলাদেশকে নতুনভাবে পথ দেখিয়ে ঐক্যবদ্ধ করে তুলতে? প্রশ্ন অনেক।

একটা সময়ে আওয়ামি লিগের বিরুদ্ধে বিএনপি ও উগ্র ডানপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী একই জোটে ছিল। এখন জামায়াতে বসছে বিরোধী দলের আসনে। শেখ হাসিনার দল আওয়ামি লিগ ভোটে অংশ নেওয়ার অনুমতি পায়নি। বিবিধ অজুহাতের ফিকির তুলে তাদের নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে রেখেছিল ইউনুস সরকার। নির্বাহী আদেশে আওয়ামি লিগের রাজনীতিও এই মুহূর্তে দেশে কার্যত নিষিদ্ধ। এদিকে, তাদের মিত্র জাতীয় পার্টি ভোটে অংশ নিলেও কোনও আসন পায়নি। তাদের ফলও ভয়াবহ খারাপ। জাতীয় পার্টির দুর্গ রংপুর অঞ্চলের দখল নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। আওয়ামী লীগের ঘাঁটি খুলনা– যার দেখভাল করতেন শেখ হাসিনার খুড়তুতো ভাই শেখ হেলাল– সেখানেও জামায়াতের ফল ভালো।

একটা সময়ে আওয়ামি লিগের বিরুদ্ধে বিএনপি ও উগ্র ডানপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী একই জোটে ছিল।

আওয়ামি লিগ ভোট বয়কট করলেও তাদের সমর্থকদের বড় অংশ ভোট দিয়েছে কোথাও বিএনপি আবার কোথাও জামায়াতে ইসলামীকে। অনেকে ভোটের সময় ঘরে ফিরেছে। নানামুখী সমীকরণে এই ভোট মোটামুটি অনেক বার্তাই দিয়ে গেল বাংলাদেশকে।
হাসিনা সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন সরকার প্রকারে-প্রকারান্তরে ধর্মীয় উগ্রবাদের উত্থানে হাওয়া দিচ্ছিল। ছাত্রদের বড় অংশ সেই উগ্রপন্থার সমর্থক হয়ে পড়ে। দোসর হয়েছিল জামায়াতে। এ নিয়ে দেশে রীতিমতো উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। নির্বাচনের ফলাফলে একদিকে অতি উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির ক্ষমতার উত্থান ঠেকেছে। ক্ষমতার মসনদে বসার মোহ ভঙ্গ হয়েছে জামায়াতে ও তাদের সহযোগীদের। অন্যদিকে, বামেদেরও কোনও ঠাঁই হয়নি। কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ভোট পেয়েছেন হাজারের নিচে। অতএব বলা যায়, মধ্যপন্থার প্রতিই আস্থা রেখেছে বাংলাদেশের জনগণ।
তুলনামূলক ঝামেলাহীন এই নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৫৯.৪৪ শতাংশ।

একদিকে বিএনপি যখন সরকার গঠনের প্রস্তুতিতে রত, জামায়াতের ভিতরে তখন চলছে পরাজয়ের বিশ্লেষণ। যদিও দলটি একক ক্ষমতার ধারেকাছে ছিল না কখনওই। ২০০১ সালে বিএনপির সঙ্গে ভোটের জোট করার কারণে দু’টি মন্ত্রণালয় পেয়েছিল। ’৭১-এ তাদের ভূমিকা ছিল স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের বিরোধিতা করা। আর এবারও ভোটের আগে তাদের বক্তৃতা-বিবৃতি ছিল অস্পষ্ট। অসংগতিতে ভরা। নারীদের স্বাধীনতা-বিরুদ্ধ অবস্থানে, বলা বাহুল‌্য, তারা অনড় ও এককাট্টা ছিল। জামায়াতেকে মানুষ জবাব দিয়েছে। তারপরও তাদের এত বেশি আসন লাভ নিয়ে উৎকণ্ঠা অবশ‌্য একটা থেকেই যায়। এদিকে বিএনপি কোনও কিছু নিয়ে চিন্তিত নয়। মানুষ দলীয় প্রধান তারেক রহমানের উপর আস্থা রেখেছে। সব ঠিক থাকলে তিনিই প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ‘প্রধানমন্ত্রী’ তারেককে প্রথমে চারটি বড় চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে। ফাইল চিত্র।

১৭ বছর প্রবাস থেকেও তারেকের দৃঢ় নেতৃত্ব বিএনপিকে সংঘবদ্ধ রেখেছিল। তবে এই বিশাল বিজয় তাঁর দায়িত্ব বহুগুণে বাড়িয়ে দিল। মানুষের প্রত্যাশা এখন অনেক বেশি। তিনি কতটা পূরণ করতে পারবেন এবং অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎকে কীভাবে রূপ দেবেন, তা সময় বলবে। উপমহাদেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের প্রশ্নে তার পদক্ষেপ কী হবে, তার দিকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের নজর থাকবে।

তবে তারেক রহমান অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে এই ভোটে উতড়ে গিয়েছেন। কৌশলে সামাল দিয়েছেন ড. ইউনুস অ‌্যান্ড কোম্পানিকে। এখন তাঁর চ্যালেঞ্জ, দেশীয় রাজনীতিতে বিরাজমান আগাছা পরিষ্কারের। নতুন প্রধানমন্ত্রীর ‘প্ল‌্যান অফ অ‌্যাকশন’ বা ‘নীল নকশা’ আশা করি ইতিমধ্যেই তৈরি রেখেছে বিএনপি। কাজ শুরু করতে এবং দেশকে তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনতে অনেক কাঠখড় পোহাতে হবে খালেদাপুত্র ও তাঁর টিমকে। চাণক্য কূটনীতি নিয়ে বিশ্বের কাছে তাক লাগানো দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অতীতের সব অভিযোগের জবাব দিয়ে ইতিবাচক কাজের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।
তিনি কি পারবেন?

ঘরে-বাইরে আলোচনা– কেমন হবে খালেদাপুত্রর নেতৃত্বাধীন আগামীর বাংলাদেশ?

বিশ্লেষকদের মতে, ‘প্রধানমন্ত্রী’ তারেককে প্রথমে চারটি বড় চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা
করতে হবে–প্রথমত, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। গত ১৮ মাসে ‘মব’ সংস্কৃতির নামে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, চাঁদাবাজি-দখলবাজি, জুলুম ও হিন্দু-সহ ভিন্ন মতাবলম্বী মানুষদের উপর হামলার অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে। ইউনূস সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় পুরোপুরি ব্যর্থ ছিল। সাধারণ মানুষ অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি চায়। তাই আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠআকে দিতে হবে অগ্রাধিকার।

দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের আর্থিকভাবে কঠিন চাপে রয়েছে। ব‌্যাঙ্কিং সেক্টরে টানাপোড়েন, রফতানি বাণিজ‌্য বিশেষত পোশাক নির্মাণে সমস্যা ব্যাপক। সার্বিকভাবে ব্যবসায়ীদের আস্থাহীনতা কাটিয়ে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি ফেরাতে হবে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন।

দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের আর্থিকভাবে কঠিন চাপে রয়েছে।

ড. ইউনুসের সস্তা কূটনীতিতে অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নষ্ট হয়েছিল। প্রতিবেশী দেশ-সহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্পর্কের স্বাভাবিকতা ফেরানো হবে নতুন সরকারের জরুরি চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি ভিসা জটিলতা ও রপ্তানি বাজারে সংকোচন-হেতু দেশে যে আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে কূটনৈতিক সক্রিয়তা বাড়াতে হবে।
শেষত, দলীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। চাঁদাবাজি, অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা, এসব নিয়ন্ত্রণে কঠোর বার্তা দিতে হবে। যদিও শুরু থেকে তিনি এই বিষয়ে কঠোর ছিলেন ও আছেন, তবে রাষ্ট্র পরিচালনায় দলীয় শৃঙ্খলার ‘বিকল্প’ নেই।

এক অন‌্যতম কঠিন সময়ে খালেদাপুত্র সুযোগ পেয়েছেন দেশগঠনের। এই সুযোগ ইতিবাচক রাষ্ট্রগঠনে ব্যয় করতে পারলে তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। অন্যথায় সামান্য বিচ্যুতিও দেশকে আরও কঠিন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে। বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্র ঘরে-বাইরে বহাল। অনেক ‘শত্রু’ই চায় দেশটি তার স্বাভাবিক স্থিতিশীলতা হারিয়ে ফেলুক। নানাভাবে তারা বাংলাজেশের মাটিতে উগ্রপন্থার চাষে মদত দিয়ে চলেছে। অভ্যন্তরীণ অশান্তি তো লেগেই রয়েছে। শান্তি ও স্থিতি ফেরাতে ক্ষমতাসীনদের হতে হবে সহনশীল। এখানে গান্ধীবাদের অহিংস রাজনীতির প্রশংসা সবাই করেন, নিজের জীবনে অনুকরণ করেন ক’জন? নেলসন ম্যান্ডেলার কথা স্মরণ করেন, বাস্তবে তাঁর মতাদর্শ পালন করেন না।

তারেক রহমান ভোটের আগে বিদেশি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, শেখ হাসিনার পরিবারের কারও রাজনীতি করতে তিনি বাধা দেবেন না। ভোটের পর সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক তৈরিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা। সজীব ওয়াজেদ জয় যখন বিয়ের পর সস্ত্রীক দেশে ফিরলেন, শুভেচ্ছাবার্তায় তাঁকেও ফুল পাঠিয়েছিলেন খালেদাপুত্র। ২০০১ সালের পর বিএনপি শাসনামলে ‘বঙ্গবন্ধু’ শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারত করেছিলেন। বাংলাদেশে সেই রাজনীতি এখন আর নেই। আওয়ামী লীগের শাসনকালেই সহনশীলতার রাজনীতি উঠে যায়। সবকিছু ভুলে মানুষ চায় ইতিবাচক রাজনীতির ধারা তৈরি হোক নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশে। তারেকের হাত ধরে বিরোধী মত ও রাজনৈতিক সহাবস্থান ফিরে আসুক।

আওয়ামি লিগ তাদের নিজেদের ভুলের মাশুল গুনছে। এখন পরীক্ষা বিএনপির। বিএনপি ভাল কিছু করলে তা আগামীর বাংলাদেশে উদাহরণ হবে। না করলে খেই হারাবে বাংলাদেশ। কী হবে, উত্তর লুকিয়ে কালের গর্ভে।

(মতামত নিজস্ব)

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement