ট্রেনের মধ্যে বেআইনিভাবে ভিক্ষা করলে মোটা অঙ্কের জরিমানার ঘোষণা। ভিক্ষার আড়ালে দুষ্টচক্র তৈরি হওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট।
ভিখু ছিল ডাকাত। তার ভয়ে বাঘে-বদলে একঘাটে জল খেত। শরীরে যেমন জোর, বুকের যেমন পাটা, তেমনই উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন। একবার ডাকাতি করতে গিয়ে ভিখু গুলি খেল। প্রাণে মরে গেলে কেউ অবাক হত না। কিন্তু বনের পশুও যেরকম পরিস্থিতিকে বেঁচে থাকতে পারে না, সেই ধরনের প্রতিকূলতা কাটিয়ে ভিখু টিকে রইল। তবে সুচিকিৎসার অভাবে ভিখুর ডানহাতটি গেল পঙ্গু হয়ে। মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। ভিখু মেনে নিল। এবং আস্তে আস্তে শিখে গেল অন্যতম আদিম পেশা ভিক্ষাবৃত্তির নানা প্যাঁচপয়জার। যেটি দুর্বলতা, সেটিকে প্রদর্শনযোগ্য করে তুলতে পারলে ভিক্ষাবৃত্তিতে সাফল্য।
ভিখুর ডানহাতটি কর্মক্ষম নয়। সুতরাং সেটিকেই বেশি করে দৃশ্যমান করে তুলতে হবে। পাঁচিও তাই করে। যুবতী। শরীরের বাঁধন ভাল। কিন্তু একটি পায়ে দগদগে ঘা। ভিখু জিজ্ঞেস করেছিল, এই ঘা কি নিরাময়যোগ্য নয়? উত্তরে পাঁচি বলেছিল, খুব সারে। ওষুধ দিলেই সারে। অর্থাৎ ওষুধ সে খাবে না, মলম সে দেবে না, ডাক্তারের কাছে সে যাবে না। নিজের ঘা-কে আরও উন্মুক্ত করে তুলে ভিক্ষাবৃত্তি করবে। পাঁচি থাকে যার সঙ্গে, সেই বশিরের পেশাও ভিক্ষাবৃত্তির। জীবন ও যৌবনের অমোঘ নিয়মে এই তিন ভিক্ষুক জড়িয়ে পড়ে ভালবাসার ত্রিকোণে। বশির ও ভিখু হয়ে ওঠে প্রতিদ্বন্দ্বী, একে-অন্যের।
নৈতিক মানদণ্ডে ভিক্ষাবৃত্তিকে দেখা যেতে পারে কি না, সে এক প্রশ্ন। যে প্রকৃতই লাচার, তাকে সহায়তা করা যায়। তবে যে বানিয়ে তোলে নিজ-বিপন্নতা, সে কি সহায়তা পাওয়ার যোগ্য?
ট্রেনে, বাসে এমন কত মানুষকে আমরা ভিক্ষাবৃত্তি করতে দেখি, যাদের সম্বল শরীরপ্রদর্শনের খেলা। অর্থাৎ খুঁত তুলে ধরে, অসামর্থ্য তুলে ধরে পরোক্ষে বার্তা দেওয়া, কেন তারা অন্যের অনুগ্রহ ও সমব্যথার উপর নির্ভরশীল। খোঁড়া মানুষটি লাঠি ধরে ভিক্ষা চায়। অন্ধ মানুষ অন্যের হাত ধরে গান গেয়ে ভিক্ষা চায়। কারও হয়তো দুর্ঘটনায় একটি হাত কনুই থেকে অ্যাম্পুট করতে হয়েছে। সে, সেটিকেই দেখিয়ে ভিক্ষা চায়। একা নারী তিনটি কচি বাচ্চাকে সঙ্গে নিয়ে ভিক্ষা করছে: এ-দৃশ্য কত না দেখা। এখন তো সিনেমায় পর্যন্ত উঠে এসেছে এই তথ্য যে, ভিক্ষাবৃত্তিতে সহায়তা করা এসব শিশুকে ভাড়া নেওয়া হয় চরম অভাবী সংসার থেকে। যে-অসহায়তাকে মূলধন করে এভাবে ভিক্ষা করা হচ্ছে, দেখা যাবে, তা হয়তো তৈরি করা। মূল অসহায়তা: দারিদ্র।
নৈতিক মানদণ্ডে ভিক্ষাবৃত্তিকে দেখা যেতে পারে কি না, সে এক প্রশ্ন। যে প্রকৃতই লাচার, তাকে সহায়তা করা যায়। তবে যে বানিয়ে তোলে নিজ-বিপন্নতা, সে কি সহায়তা পাওয়ার যোগ্য? লেন্স ঘুরিয়ে একইভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ও অভিযুক্ত করা যায় রাষ্ট্রের কল্যাণকামী ভূমিকাকে। কেন এমন স্থিতি তৈরি হল বা হচ্ছে, যেখানে মানুষ ভিক্ষুকে পরিণত হল! সম্প্রতি, ভারতীয় রেল ‘জনবিশ্বাস (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ দ্বারা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বেআইনিভাবে ভিক্ষাবৃত্তি চলন্ত রেলের কামরায় যাবে না। ধরা পড়লে, ২ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। ভিক্ষাবৃত্তির পেশার আড়ালে দুষ্টচক্র গড়ে ওঠার ইঙ্গিত এখানে দ্ব্যর্থহীনভাবে ধরা পড়ে। এখন দেখার, অন্যান্য আইনের মতো এ-বয়ানেও ছিদ্র তৈরি হয় কি না।
