শিল্প নেই। রাজস্ব কমছে। রাজস্ব কমায় পরিকাঠামো তৈরি হচ্ছে না। পরিকাঠামো খারাপ বলে শিল্প আসতে চাইবে না। বর্তমানে রাজ্যে শিল্পায়নের স্বার্থে এই অভিমুখ থেকে নতুন সরকার সরে আসতে তৎপর। এই অলাতচক্র ভেঙে লগ্নিকারীদের মন থেকে বাংলা সম্পর্কে ভয় ‘আউট’ করে ভরসা ‘ইন’ করা নতুন শিল্পমন্ত্রীর লক্ষ্য।
শিল্পে কি সুদিনের অপেক্ষায় বাংলা?
দেড় দশক পর রাজনৈতিক পালা বদল ঘটেছে। নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ায় তাপস রায় হয়েছেন শিল্পমন্ত্রী। নতুন শিল্পমন্ত্রী বার্তা দিয়েছেন, তঁার প্রথম কাজ হবে সিঙ্গুরে টাটাদের ফেরানো। দেড় দশক আগে বাম জমানার অবসান ঘটিয়ে যখন তৃণমূল ক্ষমতায় এসেছিল, তার সঙ্গে এবারে তৃণমূলকে সরিয়ে বিজেপির ক্ষমতায় আসার চিত্রটা অবশ্যই আলাদা। শিল্পের বিরোধিতা করে কৃষক আন্দোলনকে হাতিয়ার করে পালাবদল ঘটিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচনে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হয়ে মমতা প্রথমেই তঁার প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে সিঙ্গুরের কৃষকদের জমি ফিরিয়ে দিতে উদ্যোগী হন। শুধু তা-ই নয়, মমতার সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, শিল্পের জন্য জোর করে জমি অধিগ্রহণ করবে না। শিল্পমহল সরকারকে জমি অধিগ্রহণের জন্য বার বার আর্জি জানালেও সরকার কর্ণপাত করেনি।
তৃণমূল আমলে পশ্চিমবঙ্গে লগ্নি না-আসার অন্যতম প্রধান কারণ রাজ্যের জমিনীতি।একলপ্তে বড় জমি না পাওয়ার সমস্যার কথা বারবার তুলে ধরত শিল্পমহল। সেখানে এবার ভোটে জেতার কয়েক দিনের মধ্যে সেই ছবি বদলানোর ইঙ্গিত দেয় রাজ্যের নতুন শাসক দল। বণিকসভার মঞ্চ থেকে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বার্তা দেন, এখানে লগ্নি টানা/ আনয়ন তঁাদের লক্ষ্য। সেই মতো জমি নীতি চালু হবে। যে জমি নীতির মাধ্যমে পাঞ্জাব-হরিয়ানা-মহারাষ্ট্রর মতো রাজ্য শিল্পে পুঁজি টানতে সক্ষম হয়েছে, এখানেও সেইরকম নীতিই নতুন রাজ্য সরকারের ভাবনায় রয়েছে। এরাজ্যে যেহেতু সিংহভাগ জমিই ছোট ও প্রান্তিক চাষিদের হাতে, সেহেতু শিল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণে সরকারি হস্তক্ষেপ দরকার বলে তিনি অনুভব করেন।
তৃণমূল আমলে পশ্চিমবঙ্গে লগ্নি না-আসার অন্যতম প্রধান কারণ রাজ্যের জমিনীতি।একলপ্তে বড় জমি না পাওয়ার সমস্যার কথা বারবার তুলে ধরত শিল্পমহল। সেখানে এবার ভোটে জেতার কয়েক দিনের মধ্যে সেই ছবি বদলানোর ইঙ্গিত দেয় রাজ্যের নতুন শাসক দল।
বিজেপি বঙ্গজয়ের আগে ডবল ইঞ্জিন সরকারের সুফলের কথা প্রচার করেছে বারংবার। সে-কথা মনে রেখেই সম্ভবত কেন্দ্র রাজ্যকে সঙ্গে নিয়ে এগতে চাইছে। ইতিমধ্যে কেন্দ্রের তরফে শিল্প এবং অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে নীতি আয়োগকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার একটি ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করতে বলা হয়। নীতি আয়োগের উপাধ্যক্ষ (ভাইস চেয়ারম্যান) অশোককুমার লাহিড়ীর নেতৃত্বে সেই কাজ শুরুও হয়েছে। এর ফলে নীতি আয়োগ পশ্চিমবঙ্গের জন্য উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা, পরিকাঠামো, নদীভিত্তিক বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে একটি দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের রূপরেখা তৈরি করছে। সেক্ষেত্রে কলকাতাকে ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতিতে প্রবেশদ্বার হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার কথা ভাবা হচ্ছে। রাজ্যের এমন অবস্থানকেই ‘অর্থনৈতিক সম্পদ’ হিসাবে দেখা হচ্ছে। দেখা হচ্ছে, সরবরাহ ও যোগাযোগের কাজে যাতে এ রাজ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটানের মতো দেশের সঙ্গে ভারতকে যুক্ত করা যায়।
জানা গিয়েছে, কেন্দ্রীয় তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব টেক জায়ান্ট গুগ্লের কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করার সময় প্রস্তাব দেন পশ্চিমবঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি ‘হাব’ করার জন্য। যদিও বিষয়টি নিয়ে তারপর সরকার বা গুগ্লের তরফে কিছু জানানো হয়নি। প্রস্তাব দিলেই যে তা বাস্তাবায়িত হবে এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু যদি এভাবে পশ্চিমবঙ্গের দিকে লগ্নিকারীদের নজর ঘোরাতে খোদ কেন্দ্র সক্রিয় ভূমিকা নেয় সেটা অবশ্যই রাজ্যে শিল্পায়নের জন্য ইতিবাচক বার্তা তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তাছাড়া রেলমন্ত্রী হিসাবে অশ্বিনী বৈষ্ণব যেন হাত খুলে রাজ্যেকে দিয়েছেন– বাংলায় রেলের আধুনিকীকরণ সম্প্রসারণ ইত্যাদিতে এক লক্ষ কোটি টাকার লগ্নি হতে চলেছে।
কেন্দ্রের তরফে শিল্প এবং অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে নীতি আয়োগকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার একটি ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করতে বলা হয়। নীতি আয়োগের উপাধ্যক্ষ (ভাইস চেয়ারম্যান) অশোককুমার লাহিড়ীর নেতৃত্বে সেই কাজ শুরুও হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের শিল্পক্ষেত্রে বর্তমান দুরবস্থা কারও অজানা নয়। তবে এই অবক্ষয় শতাব্দীপ্রাচীন বলা চলে। ‘বঙ্গভঙ্গ’ রদের পাশাপাশি ১৯১১ সালের ১২ ডিসেম্বর ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানাস্থরিত করার কথা ঘোষণা করেছিলেন সম্রাট পঞ্চম জর্জ। সেদিন রাজধানী স্থানান্তরের মাধ্যমে শুধু রাজনৈতিক দিক দিয়ে নয়, শিল্প-বাণিজ্যের দিক দিয়েও কলকাতা তথা বাংলার উপর আঘাত এসেছিল। সেদিনের ‘capital shift’-এর অর্থ শুধুমাত্র রাজধানী স্থানান্তরেই সীমাবদ্ধ ছিল না, মূলধনও সরে যেতে থাকে। যদিও তার সাড়ে তিন দশক বাদে বাঙালির ঐক্য আর বজায় থাকল না– বাংলা ভাগই হল, বিনিময়ে স্বাধীনতা এল। কিন্তু দেশভাগের জেরে উদ্বাস্তু সমস্যা আছড়ে পড়ল এপার বাংলার অর্থনীতিতে। লাভজনক পাট শিল্পের উপর মারাত্মক আঘাত আনল। পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের শিল্পক্ষেত্রে অন্তরায় হল কেন্দ্রের মাসুল সমীকরণ নীতি এবং লাইসেন্স প্রথা। প্রতিকূলতা স্বত্ত্বেও স্বাধীনতার শুরুতে কেন্দ্রে নেহরু এবং রাজ্যে বিধান রায়ের সরকারের আমলে রীতিমতো শিল্পায়ন হয়েছিল। গড়ে ওঠে দুর্গাপুর, কল্যানির মতো শিল্পনগরী। ছয়ের দশকের শেষের দিক থেকে রাজনৈতিক অস্থিরতা শ্রমিকের জঙ্গি আন্দোলন ক্রমশ শিল্পের পরিবেশ নষ্ট করছিল। নিছক ধর্মঘট করাই নয়, শ্রমিকদের মধ্যে যেন এক প্রতিশোধ স্পৃহা জন্ম নিয়েছিল। ফলে তাদের আচরণ কখনও কখনও এতটাই বাড়াবাড়ি করে ফেলে যে রাজ্যের শিল্প ভাবমূর্তি নষ্ট হতে থাকে। ওই সময় নিরাপত্তার অভাবে কিংবা অশান্তি এড়াতে শিল্পপতিদের একাংশ কলকাতা ছাড়তে থাকেন।
পরে বামফ্রন্ট ক্ষমতা এলে প্রথম দিকে জঙ্গি ট্রেড ইউনিয়নকে সমর্থন করলেও পরে শিল্পবিরোধ কমানোর ব্যাপারে উদ্যোগী হয়। শিল্পের প্রতি বামেদের অবস্থানও বদলাতে থাকে– উদার অর্থনীতির প্রেক্ষিতে ১৯৯৪ সালে নতুন শিল্পনীতি আসে। এক সময় কম্পিউটারের বিরোধিতা করায় এ রাজ্যের বদলে বেঙ্গালুরু-হায়দরাবাদে-পুনেতে তথ্য প্রযুক্তির প্রসার লাভ করে। তবে দেরিতে হলেও ভুল বুঝতে পেরে বামফ্রন্ট নীতি বদলায়। বিশেষত নতুন শতকের শুরুতে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর আমলে বাংলায় শিল্পের পুনরুত্থান শুরু হয়েছিল, লগ্নি আসছিল। ফলে গড়ে ওঠে সেক্টর ফাইভ ও রাজারহাটকে কেন্দ্র করে ‘আইটি হাব’। এই প্রজন্ম এরাজ্যে যেটুকু কাজ করতে পারছে সেটা ওই অঞ্চলটাকেই কেন্দ্র করে। বড় ভারী শিল্প নিয়ে এসে রাজ্যের শিল্পবান্ধব ভাবমূর্তি গড়তে চেয়েছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। এজন্য সিঙ্গুরে টাটাদের গাড়ি কারখানা এবং নন্দীগ্রামে পেট্রো রসায়ন হাব গড়ে তুলতে উদ্যোগী হন। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের সময় অনিচ্ছুক জমিদাতারা প্রকল্পের বিরোধিতা করে আন্দোলন শুরু করেন। তখন আন্দোলনকে রাজনৈতিক ভাবে ইন্ধন জোগান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই আত্মঘাতী জমি আন্দোলনের জেরে প্রকল্পগুলি ধাক্কা খায়। ক্ষুব্ধ হয়ে সিঙ্গুর থেকে গাড়ি প্রকল্প সরিয়ে নেন রতন টাটা। রাজ্যে শিল্পের সর্বনাশ হলেও বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লাভ হয়– ভোটে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হন।
বামফ্রন্ট ক্ষমতা এলে প্রথম দিকে জঙ্গি ট্রেড ইউনিয়নকে সমর্থন করলেও পরে শিল্পবিরোধ কমানোর ব্যাপারে উদ্যোগী হয়। শিল্পের প্রতি বামেদের অবস্থানও বদলাতে থাকে।
ইতিমধ্যে চাকা ঘুরেছে, দিন বদলেছে– মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন ক্ষমতাচ্যুত। কিন্তু এখন আর রতন টাটাও আর আমাদের মধ্যে নেই। সিঙ্গুরের জমিতে তো চাষ হল না, ফলে সেদিন যঁারা মমতার সুরে তাল মিলিয়ে শিল্পের বিরোধিতা করতে জমি আন্দোলেন তথা কৃষির প্রতি মোহাচ্ছন্ন হয়েছিলেন, তঁারা এখন অনেকেই ভুল বুঝতে পেরেছেন। বদলে এখন তাঁরা-ই চাইছেন ওখানে শিল্প হোক। দায়িত্ব পেয়ে বর্তমান শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় টাটাদের ফেরাতে তঁাদের সঙ্গে গিয়ে কথা বলবেন বলে জানিয়েছেন।
১ এপ্রিল, ২০১১ থেকে ৩১ মার্চ, ২০২৫ সালের মধ্যে মোট ৬,৬৮৮টি কোম্পানি তাদের রেজিস্টার্ড অফিস পশ্চিমবঙ্গ থেকে ভারতের অন্যান্য রাজ্যে স্থানান্তরিত করেছে। এহেন রিপোর্টে বিচলিত নতুন শিল্পমন্ত্রী খতিয়ে দেখতে চান কেন এসব সংস্থা রাজ্য ছেড়ে চলে গেল। শিল্পে অবনতি ও ত্রুটিবিচ্যুতি থাকলেও বাম জমানাতেই হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যাল, বক্রেশ্বর বিদ্যুৎ কেন্দ্র-সহ বেশ কিছু শিল্প গড়ে উঠলেও তৃণমূল আমলে তেমন উদাহরণ নেই বললেই চলে। তাছাড়া বাম জমানায় নিয়মিত সরকারি কাজে এবং স্কুল-কলেজে শিক্ষক নিয়োগ হত।
কিন্তু গত দেড় দশকে তৃণমূল জমানায় সেসব নিয়োগ ঘিরে টাকার খেলা তথা বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। কাজের জায়গা সংকুচিত হওয়ায় তৃণমূল জমানায় পশ্চিমবঙ্গ যেভাবে চলছিল তাতে একদল মানুষের আয়ের উৎস হয়ে উঠেছিল মূলত তোলাবাজি। যেটা সরকার বদলের পর ধরপাকড়ের জেরে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রাজ্য যত অনগ্রসর, যেখানে সৎ পথে উপার্জনের সুযোগ যত কম, সেখানে তোলাবাজির প্রাবল্য তত বেশি। যার ফলে তৈরি হচ্ছিল এক দুষ্ট চক্র– শিল্প নেই বলে বেকার যুবকদের তোলাবাজির প্রবণতা, আর তোলাবাজির রমরমা বলে শিল্প আসছে না।
অন্যদিকে আর এক দুষ্টচক্র হল– এই রাজ্যে শিল্প কমায় রাজস্ব কমছে, রাজস্ব কমায় পরিকাঠামো তৈরি হচ্ছে না আবার পরিকাঠামো খারাপ হলে শিল্প আসতে চাইবে না। বর্তমানে রাজ্যে শিল্পায়নের স্বার্থে এই অভিমুখ থেকে নতুন সরকারকে সরে আসতে হবে। ‘শিল্পবান্ধব’ পশ্চিমবঙ্গ গড়ে তুলতে বিজেপি চাইছে লগ্নিকারীদের মন থেকে বাংলা সম্পর্কে ভয় ‘আউট’ করে ভরসা ‘ইন’ করাতে। তাই তো বণিকসভার অনুষ্ঠানে শমীক ভট্টাচার্য বার্তা দেন, ভবিষ্যতে কোনও শিল্পপতি বাংলায় কারখানা গড়তে এলে কোনও রাজনৈতিক দল তঁার কাছে টাকা চাইতে যাবে না। তাঁর এই দৃঢ় বার্তা যথেষ্ট ইতিবাচক বলে মনে হয়েছে শিল্পমহলের।
(মতামত নিজস্ব)
