লোকসভায় বিজেপি-তরণীর বৈঠা আপাতত এমকে স্ট্যালিনের হাতে। দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনের অর্থ লোকসভার আসন বাড়িয়ে মহিলা সংরক্ষণ ও ‘এক দেশ এক ভোট’ বিল পাশ হওয়া। যে-বিরোধিতা স্ট্যালিন করে আসছেন, কংগ্রেসের উপর ঝাল মেটাতে বিজেপির সেই সাধ পূর্ণ করে কি রাজ্য রাজনীতিতে তিনি ভেসে থাকতে পারবেন?
‘কুইজ মাস্টার’ যদি জানতে চান, এই সময়ে ভারতের কোন রাজনৈতিক নেতার দিকে প্রত্যেকে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে রয়েছেন, কী উত্তর দেবেন? কোন নাম বা মুখ ভেসে উঠবে? নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ, না কি রাহুল গান্ধী, বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? উত্তরটা সহজ। শাসক দলের পরিকল্পনা খাটবে কি না তা নির্ভর করছে তামিলনাড়ুর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এম. কে. স্ট্যালিনের উপর। তিনিই বিজেপির ভাগ্যবিধাতা। সংসদের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা বিজেপি ও তার সহযোগীরা পাবে কি না, কাঙ্ক্ষিত সংবিধান সংশোধন বিলগুলি মসৃণভাবে পাস হবে কি না, স্ট্যালিনই তা ঠিক করে দেবেন। তঁার মর্জিই হবে শেষকথা।
তিনি নমনীয় হলে, প্রসন্ন হলে, বিজেপির কেল্লা ফতে। তিনি পঁাচিল হয়ে দঁাড়ালে বিজেপি বুঝবে কাপ ও ঠোঁটের ফঁাক দিয়ে ব্রহ্মাণ্ডও অনেক সময় গলে যায়।
বিজেপির ধ্যান-জ্ঞান তাই এখন ডিএমকে সুপ্রিমো এম. কে. স্ট্যালিন। অবশ্য এই তামিল নেতা ফাইনালের কঁাটা হলে, সেমিফাইনালের বাধা তাহলে অখিলেশ সিং যাদব। পাদপ্রদীপের আলো এখন তঁার মুখে। বিজেপির আগ্রাসন রুখে দল কতটা অটুট রাখতে পারবেন সেই অগ্নিপরীক্ষার মুখে দঁাড়িয়ে উত্তরপ্রদেশের এই সমাজবাদী নেতা। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল বধ কাব্যের পর বিজেপি আর কালক্ষেপে রাজি নয়।
সংসদের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা বিজেপি ও তার সহযোগীরা পাবে কি না, কাঙ্ক্ষিত সংবিধান সংশোধন বিলগুলি মসৃণভাবে পাস হবে কি না, স্ট্যালিনই তা ঠিক করে দেবেন। তঁার মর্জিই হবে শেষকথা।
কী করে কত দ্রুত লোকসভা ও রাজ্যসভায় দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতা অর্জন করা যায় তাদের ধ্যান-জ্ঞান এখন সেটাই। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য তারা গোপন করছে না। রীতিমতো ছক কষে এক পা, দু’ পা করে তারা লক্ষ্যপূরণের পথে এগিয়ে চলেছে। আমি বহুবার বলেছি, লিখেওছি, আর-পঁাচটা দলের মতো বিজেপি রাজনীতি করে না। তাদের রাজনীতি আগামী নির্বাচন জেতার জন্য নয়। রাজনীতিটা তারা করে নীতি ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। সেজন্য অনেক আগে থেকে তারা ছক কষে। ঘুঁটি সাজায়। সবসময় যে সফল হয়, তা নয়। কিন্তু চেষ্টায় ত্রুটি রাখে না। লোকসভার গত নির্বাচনে ‘চারশো পার’-এর লক্ষ্য অধরা থেকে গেলেও তারা হতোদ্যম হয়নি। কংগ্রেস-সহ অন্যরা যেখানে আত্মশ্লাঘায় ভুগেছে, বিজেপি সেখানে এক পা এক পা করে এগিয়েছে। একটার পর একটা ভোট গিয়েছে, তারাও লক্ষ্যপূরণের পথে শম্বুক গতিতে এগিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সুনামির পর দ্রুত কিছু পদক্ষেপ তাদের উদ্দেশ্য হাট করে মেলে ধরেছে। এটা আর মোটেই গোপন নয়, বিজেপির ‘মাছের চোখ’ এখন সংসদের দুই কক্ষে সংবিধান সংশোধন বিল পাসের জন্য প্রয়োজনীয় ‘ম্যাজিক ফিগার’ মুঠোয় ভরা। অতি দ্রুত তা তারা করতে চায় যাতে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচন সংসদীয় ভারতের ইতিহাসে একটা নতুন মাইলফলক হিসাবে ঝলমল করতে পারে। দেশ শাসনের অধিকার অন্তত আরও কয়েক দশকের জন্য নিশ্চিত করা যায়।
লোকসভার তুলনায় রাজ্যসভায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র অবস্থান অনেক ভালো। তাদের প্ল্যানিং আম আদমি পার্টি (আপ) ধরতে পারেনি। দঁাড়িয়ে দঁাড়িয়ে গোল খেয়েছে। রাঘব চাড্ডাকে যে বিজেপি টোপ দিয়েছে, দশজনের মধ্যে সাতজনকে তিনি যে জোগাড় করে ফেলেছেন, অরবিন্দ কেজরিওয়ালেরা ঘুণাক্ষরেও তা টের পাননি! যখন বুঝলেন, তত দিনে সিঁদ কেটে চুরি করে চোরেরা পালিয়েছে। এপ্রিল মাসের সেই মসৃণ অপারেশন ও জুন মাসে রাজ্যসভার ভোটের পর উচ্চকক্ষে এনডিএর সদস্য এখন ১৫২। তৃণমূল কংগ্রেসের ৩ সদস্য ইস্তফা দিয়ে বসে রয়েছেন। বিজেপি চাইছে দ্রুত ওই আসনগুলোয় ভোট করাতে। তিনটিতেই তারা জিতবে।
বিজেপির ধ্যান-জ্ঞান তাই এখন ডিএমকে সুপ্রিমো এম. কে. স্ট্যালিন। অবশ্য এই তামিল নেতা ফাইনালের কঁাটা হলে, সেমিফাইনালের বাধা তাহলে অখিলেশ সিং যাদব। পাদপ্রদীপের আলো এখন তঁার মুখে।
আসন বেড়ে হবে ১৫৫। রাজ্যসভার মোট আসন ২৪৫। দুই-তৃতীয়াংশ ছুঁতে এনডিএ-র দরকার আর মাত্র ৯টি আসন। লোকসভার ছবি অবশ্য অতটাও উজ্জ্বল নয়। কিন্তু হালের বিজেপি সেই পরশপাথর, যার স্পর্শে যে কোনও ধাতু মুহূর্তে সোনা হয়ে যায়! তৃণমূলকে তছনছ করার পরে, বিজেপি নজর দেয় উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনার দিকে। অল্পায়াসে সেখানেও সাফল্য এসেছে। উদ্ধবের সব প্রচেষ্টা বিফল করে ৯ জনের মধ্যে ৬ জনকে তারা ভাঙিয়ে নিয়েছে। দলছুটরা যোগ দিয়েছেন শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শিবসেনায়। অমিত শাহ জোরের সঙ্গে জানিয়েছেন, খুব বেশি দেরি নেই যেদিন একটাই শিবসেনা টিকে থাকবে। তঁার পরের নজর সমাজবাদী পার্টি। অখিলেশের ঘরে ডাকাতি হয়তো স্রেফ সময়ের ব্যাপার। কারণ, এই মুহূর্তের রাজনীতিতে ‘আনহোনিকো হোনি’ করার অন্য নাম ‘অমিত শাহ’।
লোকসভায় অখিলেশের দলের সদস্য ৩৭। যেভাবে ও যে-ছকে তৃণমূলে ধস নামানো হয়েছে, সেইভাবেই ২৬ জনকে ভাঙাতে বিজেপি তৈরি। রাজ্যের উপমুখ্যমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্য সে-কথা জানিয়েও দিয়েছেন। দু’-দিন আগে তিনি বলেছেন, ২৫-২৬ জন এমপি ওই দল ভেঙে বের হতে প্রস্তুত। একই কথা শুনিয়েছেন রাজ্যে বিজেপির শরিক সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টির নেতা পঞ্চায়েতমন্ত্রী ওমপ্রকাশ রাজভরও। অখিলেশকে সতর্ক করে তিনি বলেছেন, পারলে দল সামলান। ভাঙন অনিবার্য। অখিলেশ নিজেও বিপদ সংকেত পেয়েছেন। চেষ্টা করছেন ভাঙন ঠেকাতে। কিন্তু বুঝতে পারছেন, লড়াই বড়ই কঠিন। নইলে বলতেন না, ‘যঁারা ভয় পাচ্ছেন তঁারা চলে যান। যঁারা সাহসী তঁারা থাকবেন। তঁাদের সম্মান দেব। সুখে-দুঃখে সঙ্গে থাকব।’ বলছেন বটে, কিন্তু বেশ বুঝছেন মাটির বঁাধ অটুট রাখা কঠিন। আগামী বছর মার্চে রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন। বিজেপির ‘সাম, দাম, দণ্ড, ভেদ’ নীতি প্রয়োগের সেরা সময় এটাই। তিনি ঢাল তরোয়ালহীন নিধিরাম সর্দার।
এই পরিস্থিতিতে লোকসভার ক্যানভাসে একবার চোখ বোলান। ৫৪৩ আসনের মধ্যে ৩টি খালি। ৫৪০ আসনের দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার অর্থ ৩৬০ সদস্যের সমর্থন। এনডিএ-র মোট সদস্য এই মুহূর্তে ২৯৩। স্পিকার ওম বিড়লা তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ ও উদ্ধব শিবসেনার ৬ জনের ভাঙন মান্যতা দিলে (না দিয়ে উপায়ও নেই, তারপর যা হবে তা আদালতে) এনডিএ-র শক্তি বেড়ে হচ্ছে ৩১৯। অর্থাৎ প্রয়োজন আরও ৪১ জন। সমাজবাদী পার্টির ২৬ জন বেরিয়ে এলে দরকার ১৫ জনের সমর্থন। স্ট্যালিনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা ওখানেই। তঁার দলের সদস্য সংখ্যা ২২।
স্ট্যালিনের দিকে বিজেপি হাত বাড়িয়েছে ভোট বিপর্যয় ও কংগ্রেসের জোটত্যাগের পর। ত্রিশঙ্কু বিধানসভায় বিজেপি চাইছিল ডিএমকে ও এডিএমকে-কে কাছাকাছি এনে সরকার গড়তে। সেই উদ্যোগে জল ঢালে কংগ্রেস। দ্রুত সমর্থন দেয় টিভিকে-কে। সঙ্গে নেয় মুসলিম লীগ ও বামপন্থীদের। এতে ক্ষুব্ধ হন স্ট্যালিন। কিন্তু কিছু করার ছিল না তঁার। এডিএমকেও ভাঙে। বিদ্রোহীরা হাত মেলায় সরকারের সঙ্গে। বিজেপিতেও ভাঙন ধরেছে। এখন তারা চাইছে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্কের চিড় ফাটলে পরিণত করে স্ট্যালিনকে কাছে টানতে।
দুই-তৃতীয়াংশের ফিতে ছুঁতে তঁার ২২ অনুগামীর হাত ধরা জরুরি। প্রশ্ন হল, বিজেপির সাধ স্ট্যালিন কি পূরণ করবেন?
৫৪০ আসনের দুই-তৃতীয়াংশ গরিষ্ঠতার অর্থ ৩৬০ সদস্যের সমর্থন। এনডিএ-র মোট সদস্য এই মুহূর্তে ২৯৩। স্পিকার ওম বিড়লা তৃণমূল কংগ্রেসের ২০ ও উদ্ধব শিবসেনার ৬ জনের ভাঙন মান্যতা দিলে এনডিএ-র শক্তি বেড়ে হচ্ছে ৩১৯। অর্থাৎ প্রয়োজন আরও ৪১ জন।
দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনের অর্থ লোকসভার আসন বাড়িয়ে মহিলা সংরক্ষণ ও ‘এক দেশ এক ভোট’ বিল পাস হওয়া। যে-বিরোধিতা তিনি করে আসছেন, কংগ্রেসের উপর ঝাল মেটাতে বিজেপির সেই সাধ পূর্ণ করে রাজ্য রাজনীতিতে তিনি কি ভেসে থাকতে পারবেন? টিভিকের মোকাবিলা করতে পারবেন? গত বছরই যিনি লোকসভার আসন বৃদ্ধি আরও ৩০ বছরের জন্য স্থগিত রাখতে বলেছিলেন, গোটা দাক্ষিণাত্যের স্বার্থে, কী করে তিনি এখন সিদ্ধান্ত বদলের সাফাই গাইবেন? নিজের পায়ে কুড়ুল মারার মতো অবিবেচক হবেন কি? মমতার মতো অখিলেশও ব্যর্থ হলে দু’টি সংবিধান সংশোধন বিল পাস এবং জম্মু-কাশ্মীর ও অসমের ঢংয়ে সীমানা পুনর্নির্ধারণের মধ্য দিয়ে দেশ শাসনের স্থায়ী বন্দোবস্ত পাকাপাকি করার পথে বিজেপির সামনে পঁাচিল হয়ে থাকছেন একজনই। ৭৩ বছরের মুথুভেল করুণানিধি স্ট্যালিন।
(মতামত নিজস্ব)
