জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ও মৃত্যুহার হ্রাসের ফলে বিশ্বজুড়ে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অমূল্য উপহার উদ্যাপন যোগ্য। পাশাপাশি, তা সমাজের উপর একটি গুরুদায়িত্ব অর্পণ করে- জীবনের আগামী বছরগুলি যেন অর্থবহ ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে 'আন্তর্জাতিক যোগ দিবস ২০২৬'-এর বিষয়বস্তু- 'সুস্থ বার্ধক্যের জন্য যোগব্যায়াম' সময়োপযোগী বার্তা। যোগ দিবসে কলম ধরলেন উপরাষ্ট্রপতি সি পি রাধাকৃষ্ণণ।
ভারতের উপরাষ্ট্রপতি সি পি রাধাকৃষ্ণণ।
ভারতের আধ্যাত্মিক প্রজ্ঞার উপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠেছে যোগাসন- এক প্রাচীন সাধনা- যা শরীর, মন ও আত্মার মধ্যে সামঞ্জস্যের বিধান দেয়। যোগের মূল উপাদানগুলি হল- আসন, প্রাণায়ম এবং ধ্যান। যা সুস্থতা, স্বচ্ছতা, মানসিক ভারসাম্য বৃদ্ধি করতে সহায়ক।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রসংঘের সভায় একটি ভাষণে অধিকতর বাসযোগ্য ও সুস্থিতিশীল বিশ্ব গড়ে তোলার লক্ষ্যে মানুষের জীবনযাত্রার ধরন পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। বলেন, যোগ হল মন ও শরীর, চিন্তা ও কর্ম, সংযম ও পরিতৃপ্তি, মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে সামঞ্জস্য সাধনের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির মূর্ত প্রতীক। তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে, ২০১৪ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্র সংঘের সাধারণ পরিষদ ২১ জুন দিনটিকে 'আন্তর্জাতিক যোগ দিবস' হিসাবে ঘোষণা করার প্রস্তাব অনুমোদন করে। যে-প্রস্তাব রেকর্ড সংখ্যক ১৭৪টিরও বেশি দেশ সমর্থন করেছিল।
আজ ২১ জুন, যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কলকাতায় যোগ দিবসের কর্মসূচির নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তখন আমি একই উদযাপনের অংশ হিসাবে লাদাখ সফরে। আমিও বহু বছর ধরে যোগ ও পঞ্চকর্ম যা প্রায়শই 'সহোদর শাস্ত্র' হিসাবে অভিহিত- অনুশীলনের সুফল ভোগ করেছি।
কালজয়ী ঐতিহ্য 'যোগ'। শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিক সুস্থতার কালজয়ী সাধনা। বিশ্বাস করা হয় যে, ভারতীয় সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই এর যাত্রা শুরু। যোগশাস্ত্রের ঐতিহ্য অনুযায়ী, ভগবান শিবকে বলা হয় 'প্রথম যোগী' বা 'আদি যোগী' এবং তিনিই প্রথম গুরু বা 'আদি গুরু' হিসাবে পরিগণিত। অন্যদিকে, 'যোগসূত্র'-র মাধ্যমে যোগের নীতিগুলিকে সুশৃঙ্খল ও বিধিবদ্ধ করার জন্য মহর্ষি পতঞ্জলি 'ধ্রুপদী যোগের জনক' বলে অভিহিত। তামিলনাড়ুর সঙ্গে মহর্ষি পতঞ্জলির গম্ভীর আধ্যাত্মিক যোগসূত্র রয়েছে। বিশ্বাস করা হয় যে, তাঁর দৈহিক 'জীবসমাধি' তিরুপাত্তুরেই অবস্থিত। রামকৃষ্ণ পরমহংস যোগের তিনটি মহান পথের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন জনযোগ (প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের পথ), কর্মযোগ (নিঃস্বার্থ সেবা ও সৎকর্মের পথ) এবং ভক্তিযোগ (বিশুদ্ধ গ্রেম ও ভক্তির পথ)। তিনি শিক্ষা দিয়েছিলেন- এই তিনটি পথই শেষ পর্যন্ত পরম সত্য উপলব্ধির ক্ষেত্রে এক বিন্দুতে মিলিত হয়। বর্তমানে যোগ ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সীমানা ছাড়িয়ে এক অনন্য উচ্চতায় আসীন।
বার্ধক্যের যষ্টি
প্রতি বছর আমাদের দেশে একটি তাৎপর্যপূর্ণ 'থিম'-এর মাধ্যমে 'আন্তর্জাতিক যোগ দিবস' পালন করা হয়। এ বছরের বিষয়বস্তু-'সুস্থ বার্ধক্যের জন্য যোগব্যায়াম' যা বিশেষ গুরুত্ববাহী। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি এবং মৃত্যুহার হ্রাসের ফলে বিশ্বজুড়ে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতও এই গভীর পরিবর্তনের সাক্ষী হচ্ছে। 'রাষ্ট্রপুঞ্জের জনসংখ্যা তহবিল'-এর প্রকাশিত 'ইন্ডিয়া এজিং রিপোর্ট ২০২৩' অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতি ৫ জন ভারতীয়র মধ্যে প্রায় একজনের বয়স ৬০ বছরের বেশি হতে চলেছে।
দীর্ঘায়ুর এই অমূল্য উপহারটি আমরা উদযাপন করলেও একই সঙ্গে এটি সমাজের উপর একটি গুরুদায়িত্ব অর্পণ করে- তা হল, এটি নিশ্চিত করা যে, জীবনের বাড়তি বছরগুলিতে শুধু যেন আয়ুই না বাড়ে, বরং সেই বছরগুলি যেন অর্থবহ ও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে, 'সুস্থ বার্ধক্যের জন্য যোগব্যায়াম' একটি সময়োপযোগী বার্তা।
ভারতে 'সিলভার ইকোনমি' বা প্রবীণ-কেন্দ্রিক অর্থনীতির প্রসার ঘটছে, যা মূলত স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং প্রবীণ নাগরিকদের প্রয়োজনীয় পণ্য ও পরিষেবার উপর গুরুত্ব দেয়া। শিল্প বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে এই ক্ষেত্রের আকার প্রায় ৭৩,০০০ কোটি টাকা। আগামী বছরগুলিতে এই ক্ষেত্রের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বার্ধক্যজনিত বর্তমান বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে দেখা যাচ্ছে, প্রবীণ নাগরিকদের নানাবিধ দুর্বলতা ও ঝুঁকির এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে হয়। 'বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এই প্রেক্ষাপটে বিশ্বজুড়ে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসংক্রামক রোগ, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ক্রমবর্ধমান বোঝা বা সমস্যার কথা বারবার তুলে ধরেছে। বর্তমান সময়ের আরও জরুরি প্রয়োজন হল, অল্প বয়স থেকেই মানুষকে যোগব্যায়ামের সঙ্গে পরিচিত করে তোলা। যত কম বয়সে যোগাভ্যাসে শুরু করা যাবে, তার সুফল তত বেশি মিলবে ভবিষ্যতে।
'জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০'-তেও স্বাস্থ্য সুস্থতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে যোগব্যায়ামকে গুরুত্বপূর্ণ। স্থান দেওয়া হয়েছে। তরুণ প্রজন্মকে যোগব্যায়ামের পথে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এটি শিক্ষার্থীদের যোগ দিবসে প্রধানমন্ত্রী। রাঁচি, ২১ জুন, ২০১৯ মধ্যে শৃঙ্খলাবোৎ একাগ্রতা, মানসিক ভারসাম্য, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা গড়ে তোলার মাধ্যম হিসাবে কাজ করবে।
সমস্যার সমাধান। 'ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেল্স ও হার্ভার্ড মেডিক্যাল স্কুলের মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান, তৎসহ 'ল্যানসেট'-এর মতো স্বীকৃত পত্রিকার গবেষণায় প্রমাণিত- নিয়মিত যোগব্যায়াম প্রবীণ নাগরিকদের শারীরিক ভারসাম্য, নমনীয়তা ও চলাফেরার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। গবেষণায় আরও দেখা গিয়েছে যে হাড়ের ঋনত্ব বৃদ্ধি, আর্থারইটিস বা বারের বাদা উপশম, শ্বাস-প্রশ্বাসের কার্যকারিতা বাড়ানো, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে যোগব্যায়ামের সুনির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য সুফল রয়েছে। পাশাপাশি, ধ্যান ও শ্বাসপ্রশ্বাস সংক্রান্ত অনুশীলনের মাধ্যমে প্রবীণদের ঘুমের মান, মানসিক সূস্থায়িত্ব, বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্ষমতার উন্নতি ঘটে বলেও প্রমাণিত।
যোগব্যায়ামের প্রকৃত শক্তি নিহিত এর সর্বাঙ্গীণ প্রকৃতির মধ্যে। শারীরিক সুস্থতা বা পুনর্বাসনের বাইরেও যোগব্যায়াম মানসিক ভারসাম্য ও সামাজিক সংযোগ গড়ে তুলতে সহায়তা করে। দেখেছি, বার্ধক্যজনিত অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ প্রবীণদের মধ্যে একাকীত্ববোধ। যোগব্যায়াম এই একাকীত্বকে ধীরে ধীরে এক বৃহত্তর সমষ্টিগত একাত্মবোধে রূপান্তরিত করে। এটি মানুষকে 'আত্মকেন্দ্রিক' মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে সহানুভূতি, পারস্পরিক সংযোগ এবং অভ্যন্তরীণ শান্তির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা 'সার্বিক' চেতনায় দিকে ধাবিত হতে উৎসাহিত করে।
'সুস্থ বার্ধক্যের জন্য যোগব্যায়াম' এর ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর শারীরিক কসরতের প্রয়োজন হয় না। প্রথাগত যোগানুশীলন অত্যান্ত সতর্কতার সঙ্গে এমন সব সহজ ও 'ল্যানসেট'-এর মতো বিভিন্ন স্বীকৃত পত্রিকার গবেষণায় প্রমাণিত, নিয়মিত যোগব্যায়াম প্রবীণ নাগরিকদের শারীরিক ভারসাম্য, নমনীয়তা ও চলাফেরার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। হাড়ের ঘনত্ব বৃদ্ধি, আর্থারাইটিস বা বাতের ব্যথা উপশম, শ্বাস-প্রশ্বাসের কার্যকারিতা বাড়ানো, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং মানসিক সুস্থতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে যোগব্যায়ামের সুনির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য সুফল রয়েছে।
সাবলীল পদ্ধরিতে রূপান্তর করা হয়েছে, যা প্রবীণ নাগরিকদের জন্য উপযুক্ত। এর মধ্যে রয়েছে 'যোগিক সুক্ষ্ম ব্যায়াম', চেনারের সহায়তায় বিভিন্ন আসন, নির্দেশিত আস-প্রশ্বাসের কৌশল এবং ধ্যান- যা বয়স্ক শরীরের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করেই স্নায়ু-অন্তক্ষেরা তন্ত্র (Neuroendocrine gystem) ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে। শক্তিশালী করে তোলে।
এই বিপুল সুফলগুলির কথা বিকেনা করে। 'আয়ুষ মন্ত্রক' 'অসংক্রামক রোগ ও নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য ১০টি যোগ-প্রোটোকল' শীর্ষক এক যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে প্রবীণদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ ও প্রমাণ-ভিত্তিক যোগব্যায়াম মডিউল। এছাড়া, 'যোগ ৩৬৫' নামক দেশব্যাপী প্রচার অভিযানের আওতায় ১০০ দিনের একটি বিনামূল্যে নির্দেশিত অনলাইন যোগব্যায়াম কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। যার 'লক্ষ্য' সব বয়সের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যোগব্যায়ামকে একটি সহজলভ্য ও দীর্ঘায়ী সঙ্গী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত কর।
২ হাজার বছরেরও আগে তামিল সাবক ও পণ্ডিত থিরুভাইভার তাঁর 'কুরল'-এর (৯৪৯) মাধ্যমে স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য এক ব্যক্তিগত ও সুচিন্তিত পদ্ধতির কথা বলেছিলেন 'চিকিৎসা শুরুর আগে রোগীর শারীরিক অবস্থা, রোগের প্রকৃতি এবং উপযুক্ত সময়- এই বিষয়গুলো বিচেনা কর উচিত।' তাঁর এই কালজয়ী প্রজ্ঞা 'সুস্থ বার্ধক্যের জন্য যোগব্যায়াম'-এর আধুনিক নীতিগুলির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। যেখানে প্রতিটি ব্যক্তির ব্যাস, স্বাস্থ্য ও প্রয়োজন অনুযায়ী যোগ অনুশীলনগুলিকে বিশেষভাবে সাজানো হয়। এর ফলে মানুষ তাদের জীবনের শেষ পর্যায়েও আরও সুস্থ, কর্মচঞ্চল ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে সক্ষম হন।
২০২৮ সালের 'আন্তর্জাতিক যোগ দিবস' উদ্দ্বাপনের এই মূহুর্তে, দেশের প্রতিটি নাগরিক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সুশীল সমাজের সংগঠন, স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবী এবং কমিউনিট লিডারদের প্রতি আহবান জানাচ্ছি যোগব্যায়ামকে আজীবন পালনীয় এক সাংস্কৃতিক ও সুস্থতা-কেন্দ্রিক অভ্যাস হিসাবে গ্রহণ করার জন্য। আসুন, আমরা এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করি, যেখানে আমাদের প্রবীণ নাগরিকরা ভয়, পরনির্ভরশীলতা বা একাকীত্বের মধ্যে নয়-বরং মর্যাদা, প্রাণশক্তি, সার্থকতা ও শান্তির সঙ্গে জীবনযাপন করবেন।
