shono
Advertisement
Development

তৃতীয় নয়ন: উন্নয়ন, আশার বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর

গণতন্ত্রে বিরোধীহীন একটাই পক্ষের অস্তিত্ব কখনও কল্পনা করা যায় না। কিন্তু সেটা যদি ‘উন্নয়নের পক্ষ’ নামক একটি নতুন ‘ধারণা’ হয়– তাহলে স্থিতি অন্যরকম হতে বাধ্য। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দল-মত নির্বিশেষ সর্বাত্মক যে-উন্নয়নের ডাক দিয়েছেন, তা আশার সঞ্চার করে।
Published By: Kishore GhoshPosted: 07:10 PM Jun 16, 2026Updated: 07:10 PM Jun 16, 2026

মুখ‌্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, ‘বাংলায় এখন একটাই পক্ষ, তা হল– উন্নয়নের পক্ষ।’  তাঁর এহেন মন্তব‌্যটি দ্রুত চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। আশা করা যায়, মন্তব‌্যটি আগামীতে রাজনৈতিক মহলে আরও আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেবে। কারণ, এই মুহূর্তে এই মন্তব‌্যটিই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। কয়েকটি শব্দের মধ্যে দিয়ে এটি রাজ্যের বর্তমান চালচিত্রটিকে স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে। দলে-দলে তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিদের বিজেপির ছাতার তলায় চলে আসার প্রবণতাকেই শুধু নয়– এই মন্তব‌্য তুলে ধরেছে একটি প্রত‌্যাশাকে ঘিরে রাজ্যের মানুষের তুমুল আকাঙ্ক্ষার অভিব‌্যক্তিকেও।

Advertisement

বোলপুরের বিতর্কিত তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডল একবার বিরোধী দলের ভোটারদের ভয় দেখাতে ভোটের আগের দিন মন্তব‌্য করেছিলেন, ‘রাস্তায় উন্নয়ন দাঁড়িয়ে থাকবে।’ অনুব্রতর মন্তব‌্য তাঁর দলের সরকারের উন্নয়ন প্রচেষ্টাকে চরম বিদ্রুপের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। অভিযোগ উঠেছিল, ভোটে যারা অশান্তি করে সেরকম একদল গুন্ডাকে অনুব্রত ‘উন্নয়ন’ বলে চিত্রিত করেছিলেন। আসলে, একজন পোড়-খাওয়া রাজনীতিক রূপে অনুব্রত গুন্ডাদের মুখের ভাষাকেই রাজনীতির মোড়ক দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এরপরই রাজ‌্যজুড়ে পঞ্চায়েত ভোটের অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্যে কবি শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন অমর হয়ে থাকা সেই অমোঘ পঙ্‌ক্তি: ‘দেখ খুলে তোর তিন নয়ন,/ রাস্তা জুড়ে খড়্গ হাতে/ দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন।’

উন্নয়নের নামে শাসক দলের ভীতিপ্রদর্শনের রাজনীতিকে এবং সেই সময়ের রাজ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে তীব্র ঘৃণায় বিদ্ধ করেছিলেন কবি। ‘উন্নয়ন’ শব্দটি সেই থেকে রাজ্যে অন্তত শাপবিদ্ধ ছিল। রাজ‌্য রাজনীতির প্রবাহমান ধারায় অনুব্রত-কথিত সেই উন্নয়নের ধারণা তার যাবতীয় অনুষঙ্গ সমেত মানুষের দ্বারাই অবশেষে প্রত‌্যাখ‌্যাত হয়েছে বলে বলা যায়। সদ‌্য বিধানসভা ভোটে ‘প্রকৃত’ উন্নয়নের দাবি যে ক্ষমতার কাঠামোকে একেবারে ওলটপালট করে দিয়েছে, তা নিয়েও কোনও সংশয় নেই।

আচমকা যেন কেন্দ্রের সব বাধা দূর হতে চলেছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ‌্য নতুন করে শতাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার মুখে।

ভোটের ফলের পর উন্নয়ন সম্পর্কে এক ভিন্ন বিশ্বাস নিয়ে আমরা চলেছি। এটা ধরেই নেওয়া হয়েছে যে, রাজ্যে উন্নয়নের ‘ডাব্‌ল ইঞ্জিন’ এবার তীব্র গতিতে ছুটবে। বস্তুত, এও ঘটনা যে বাংলার উন্নয়নের দাবি দিল্লির দরবারে এত প্রবলভাবে কখনও স্বীকৃতি পায়নি। ভোটের প্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বারবার বাংলার উন্নয়নের প্রতি বিশেষ যত্নশীল হওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। তিনি যে তাঁর অঙ্গীকার রক্ষার বিষয়ে সচেষ্ট তা গত দেড় মাসে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে স্পষ্ট হয়েছে। কেন্দ্রের তরফে বিভিন্ন মন্ত্রক থেকে ইতিমধ্যে রাজ্যের জন‌্য বিশাল পরিমাণ অর্থের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ভারতের অর্থনীতি যে বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে চলেছে, তাতে উন্নয়নের ক্ষেত্রে মূ্ল চালিকাশক্তি হল পরিকাঠামোয় বিশাল সরকারি ব‌্যয়। উৎপাদন শিল্পের ক্ষেত্রে ভারত বিশ্বের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেনি। পরিকাঠামোয় এই বিশাল লগ্নির পাশাপাশি ভারত দ্রুত উন্নতি করছে পরিষেবা ক্ষেত্রে। রাজ‌্যও উন্নয়নের এই ‘ইকোসিস্টেম’-এর বাইরে থাকবে না।

একটি প্রাথমিক অনুমানে বলা হচ্ছে– কেন্দ্র রাজ্যে আগামী কয়েক বছরে পরিকাঠামোয় আড়াই লক্ষ কোটি টাকার লগ্নি পরিকল্পনা করে ফেলেছে। এর সঙ্গে রয়েছে বেসরকারি উদ্যোগ। তথ‌্যপ্রযুক্তি-সহ পরিষেবা ক্ষেত্রের বৃদ্ধি যে এই বিপুল লগ্নির হাত ধরেই আসবে, তা আশা করছেন অর্থনীতিবিদরাও।

মোদি মন্ত্রিসভার বৈঠকে নাকি ঘোষণা করেছেন, বাংলাকে এবার তুলে ধরতে হবে। স্বাধীনতার পর ‘দ্বিতীয়’ আর কোনও প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে বাংলার প্রতি এতটা সদয় হয়েছেন বলে শোনা যায়নি।

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলার উন্নয়নের বিষয়ে কেন্দ্রের আন্তরিকতা প্রশ্নের মধ্যে থেকেছে। এর ঐতিহাসিক সত‌্যতা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। দেশভাগের ক্ষত উপশমে পশ্চিম ভারত যতটা কেন্দ্রের দাক্ষিণ‌্য পেয়েছিল, তার খুব সামান‌্য অংশই জুটেছিল বাংলার ভাগ্যে। ডা. বিধান রায়ের লড়াইও সবসময় সুফল দিতে পারেনি। তার পরে কংগ্রেসের ‘ডাব্‌ল ইঞ্জিন’-ও বাংলার ক্ষেত্রে কার্যকর ছিল না। সাতের দশকের গোড়ায় কংগ্রেসের ডাব্‌ল ইঞ্জিন সরকারের আমলেই কেন্দ্রের বঞ্চনা নিয়ে রণজিৎ রায়ের কালজয়ী বই ‘দ‌্য অ‌্যাগনি অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল’ যে রচিত হয়েছিল, তা মাথায় রাখা দরকার। সেই সময়ে কুখ‌্যাত ছিল কেন্দ্রের মাশুল সমীকরণ নীতি। কয়লা ও লৌহ আকরিক-সহ অন‌্যান‌্য খনিজ পদার্থ শিল্প বিকাশের জন‌্য সুলভে পাওয়ার সুযোগ রাজ‌্যকে এই নীতির মাধ‌্যমে নিতে দেওয়া হয়নি। এই মাশুল সমীকরণের নীতি স্বাধীনতার পর থেকে মনমোহন সিংয়ের আর্থিক উদারীকরণ নীতি কার্যকর হওয়া পর্যন্ত বহাল ছিল। এছাড়া বঞ্চনা ছিল নানাভাবে। কখনওই কেন্দ্রীয় প্রকল্পের টাকা রাজ্যে অবাধে প্রবাহিত হতে দেওয়া হয়নি।

আচমকা যেন কেন্দ্রের সব বাধা দূর হতে চলেছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ‌্য নতুন করে শতাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার মুখে। মানে, এই প্রকল্পগুলি এত দিন থাকলেও তার সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল বাংলা। মোদি মন্ত্রিসভার বৈঠকে নাকি ঘোষণা করেছেন, বাংলাকে এবার তুলে ধরতে হবে। স্বাধীনতার পর ‘দ্বিতীয়’ আর কোনও প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে বাংলার প্রতি এতটা সদয় হয়েছেন বলে শোনা যায়নি। ফলে এটা যে বাংলার সামনে এক নতুন ধরনের একটি সুযোগ তৈরি করেছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এটা এখন উপলব্ধি করছে তামাম রাজ‌্যবাসীও। তাদের এই উপলব্ধি বিরোধী দলগুলির উপর নিঃসন্দেহে চাপের।

তৃণমূলের সাংসদ, বিধায়ক, পুরপিতা, পঞ্চায়েত সদস‌্য-সহ যাবতীয় জনপ্রতিনিধিদের বিজেপির দিকে ঢলে পড়ার পিছনে অজস্র কারণ ও রাজনৈতিক ব‌্যাখ‌্যা থাকলেও, জনগণের তীব্র উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা থেকে সৃষ্ট এই নয়া বাতাবরণটাকে কোনওভাবেই অস্বীকার করা যায় না। মুখ‌্যমন্ত্রী এটিকে নিশ্চিতভাবে ‘উন্নয়নের পক্ষ’ বলে বোঝাতে চেয়েছেন।
গণতন্ত্রে বিরোধীহীন একটাই পক্ষের অস্তিত্ব কখনও কল্পনা করা যায় না। যখন অন‌্য কোনও পক্ষের অস্তিত্ব থাকে না তখন গণতন্ত্রও থাকে না। কিন্তু সেটা যদি ‘উন্নয়নের পক্ষ’ নামক এইরকম রাজ্যের রাজনীতিতে উদয় হওয়া একটি নতুন ‘ধারণা’ হয়– তাহলে অন‌্যরকম। এখন সমাজবিদরা এই নতুন পরিস্থিতির নিশ্চিত করেই গভীরভাবে ব‌্যাখ‌্যা করবেন।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement