পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতিজনিত সংকটে ভারতে ঘনিয়েছে জ্বালানি গ্যাসের তীব্র আকাল। ‘জ্বালানি’ যখন জীবনের সমতুল, তখনও সমস্যা!
বসন্তের সময়ে শালের জঙ্গলে শুকনো পাতা কুড়িয়ে যারা অন্নগুজরান করে, সেই পাতা কালেকশন অন্তত কাজে লেগে যায় উনুন ধরানোয়– দারিদ্রসীমার কণ্ঠলগ্ন সেসব মানুষের সঙ্গে নাগরিক জীবনের উচ্চবিত্তদের নাভিশ্বাস আপাতত এক-পঙ্ক্তিতে এসে দঁাড়িয়েছে যেন। পাতা কুড়িয়ে উনুন ধরানোর সাবেকিয়ানা নতুন নয়। কিন্তু পশ্চিম এশিয়ায় জ্বালানি সংকটের কারণে নাগরিক জীবনে জ্বালানি গ্যাসের এহেন ত্রাহি রব, স্মরণাতীত সময়ে এত ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি। জ্বালানি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি একটি ‘কনসার্ন’ বা উদ্বেগসূচক বটে।
গ্যাসের লাফিয়ে লাফিয়ে বর্ধিত দামের সঙ্গে মধ্যবিত্তের পকেট সবসময় সঙ্গত করতে পারে না। তখন কাগুজে প্রতিবাদ হয়, আইনসভায় কেন্দ্রাসীন রাজনৈতিক দলকে ভর্ৎসনা করা হয়, কখনও কখনও তাতে সুরাহা মেলে, কমে গ্যাসের দাম। কিন্তু ইরানের উপর ইজরায়েল-মার্কিন আগ্রাসনের নিরিখে তৈরি হওয়া সংকট ও এবং সেই সূত্রে জ্বালানি গ্যাসের ‘ক্রাইসিস’ ভারতকে অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সামনে দঁাড় করিয়েছে। বিরিয়ানি খেতে চাইলেও এখন হয়তো খাওয়া হবে না, কারণ বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডার প্রদান করার উপরে ‘কাটছঁাট’ চলছে।
‘জ্বালানি’ কথাটিকে অন্যবিধ অর্থে যদি ধরা হয়, তাহলে তা জীবনীশক্তির সমার্থক হয়ে ওঠে। অমিয় চক্রবর্তীর বিখ্যাত পঙ্ক্তি– ‘জ্বালানি কাঠ জ্বলো/ জ্বলতে জ্বলতে বলো/ আঙার হল আলো’।
গ্যাস-ঘোষণা শুনে বিভিন্ন সরকারি স্কুলের প্রধানশিক্ষকদের কপালে ভঁাজ পড়েছিল প্রথমে। মিড ডে মিল নিয়মিত রান্নার জন্য গ্যাস সিলিন্ডার পাওয়া যাবে তো! যদি সত্যিই গ্যাস সিলিন্ডার অপ্রতুল হয়ে পড়ে, তাহলে এত যে হাসপাতাল, সেখানে রান্নার কাজে ব্যাঘাত ঘটবে না তো? আশু সমাধান কী হবে, সে নিয়ে সুচারু চিন্তা নিশ্চয় থেমে নেই, কিন্তু একটি যুদ্ধ পরিস্থিতি যে অন্য একটি দেশের সাংসারিক রসায়নে এত তীব্র অথচ পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে, তা ভাবলে অবাক হতে হয় বইকি। কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক কারা কারা গ্যাস আগে পাবে, সে নিয়ে যে ‘প্রায়োরিটি’ তালিকা দিয়েছে, তাতে হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অগ্রাধিকার পেয়েছে! এ তথ্য স্বস্তির।
তবে ‘জ্বালানি’ কথাটিকে অন্যবিধ অর্থে যদি ধরা হয়, তাহলে তা জীবনীশক্তির সমার্থক হয়ে ওঠে। অমিয় চক্রবর্তীর বিখ্যাত পঙ্ক্তি– ‘জ্বালানি কাঠ জ্বলো/ জ্বলতে জ্বলতে বলো/ আঙার হল আলো’। কয়লা যখন অগ্নিস্পর্শে দ্যুতি ছড়ায়, তখন যে উত্তাপ ও জীবনের বাষ্প ছড়িয়ে পড়ে, তা প্রাণরহস্যের আদিমূলে আমাদের প্রণত করে। আবার প্রতীকী তাৎপর্য থেকে সরে এসে দেখলে, ‘জ্বালানি’ কথাটির মধ্যে নিষ্ঠুর বাস্তবের প্রাতিভাসিক চরিত্র পড়ে।
খাদ্য জ্বালানি, পানীয় জ্বালানি, ঔষুধ– তাও কি জ্বালানির সমতুল্য নয়? ইরান বা ইউক্রেন বা গাজার যে-শিশুটি অভুক্ত, অশক্ত, অনিবার্য অসুস্থতার দিকে ধাবমান, সে তো আসলে জ্বালানির অভাবেই পীড়িত। কিছুটা খাদ্য, কিছুটা স্নেহ, কিছুটা নিরাপত্তা, কিছুটা মৃত্যুর থেকে দূরবর্তী হতে পারা, সে-শিশুর নিত্যকার জ্বালানিসন্ধান। পশ্চিম এশিয়ার সংকট কেটে গেলে, গ্যাসের সংকটও কেটে যাবে। ভারতীয় জনমানসও হয়তো দ্রুত বিস্মৃত হবে এই অভিঘাত, কিন্তু যেখানে যুদ্ধ প্রতি মুহূর্তে জায়মান, সেখানের শিশুরা ‘জ্বালানি’-র অভাবে তড়পাবে, এই তো নিয়তি!
