‘এল নিনো’-র প্রভাবে হতে পারে খরা। কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে কৃষি অর্থনীতি হবে বিপর্যস্ত। পরিকল্পিত কৃষিনীতিই পারে প্রতিরোধ গড়তে।
দুই বছরের টানা অতিবৃষ্টির পর এবার প্রাকৃতিক নিয়ম মেনে উল্টো স্রোতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মৌসম ভবনের এপ্রিলের পূর্বাভাস স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে, আসন্ন জুন-সেপ্টেম্বর বর্ষা মরশুমে দেশে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ কম হতে পারে। সংস্থার ভাষায় একে ‘বিলো নর্মাল’ বলা হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, এই সতর্কবার্তা অনেক সময়ই আরও গভীর সংকটের পূর্বাভাস হয়ে দঁাড়ায়।
অতীতে বহুবার দেখা গিয়েছে, যখন সংস্থা স্বাভাবিক বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে, তখন খরা নেমে এসেছে। আবার যখন ঘাটতির ইঙ্গিত মিলেছে, তখন পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। ফলে এই পূর্বাভাসকে হালকাভাবে নেওয়ার অবকাশ নেই। এই সম্ভাব্য ঘাটতির নেপথ্যে বড় কারণ হিসাবে উঠে আসছে ‘এল নিনো’। প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে তাপমাত্রা অস্বাভাবিক হারে বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি ভারতীয় মৌসুমি বায়ুর উপর পড়ে, ইতিহাস অন্তত তাই বলছে। তবে এই প্রভাবের মাত্রা নির্ভর করে সময়ের উপরও। ২০১৯ সালের মতো কয়েকটি বছরে ‘এল নিনো’-র পূর্বাভাস থাকলেও তার তীব্রতা কম হওয়ায় উলটে বেশি বৃষ্টিও হয়েছে। এবারও আশার জায়গা একটাই: ‘ইন্ডিয়ান ওশান ডিপোল’ হয়তো ‘এল নিনো’-র শুষ্ক প্রভাব কিছুটা প্রশমিত করতে পারে। কিন্তু আবহাওয়ার এই অনিশ্চয়তার উপর ভরসা করে বসে থাকা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
আসন্ন জুন-সেপ্টেম্বর বর্ষা মরশুমে দেশে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ কম হতে পারে। সংস্থার ভাষায় একে ‘বিলো নর্মাল’ বলা হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, এই সতর্কবার্তা অনেক সময়ই আরও গভীর সংকটের পূর্বাভাস হয়ে দঁাড়ায়।
বর্ষা ভারতের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। স্বাভাবিকের নিচে বৃষ্টি হলে খাদ্য উৎপাদন, গ্রামীণ আয়, এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়তে পারে। পশ্চিমবঙ্গেও কৃষকদের মধ্যে ইতিমধ্যেই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কম বৃষ্টির পূর্বাভাসের সঙ্গে উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহে গ্যাস ও সার সরবরাহে টান পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা কৃষকদের জন্য দ্বিগুণ চাপ তৈরি করবে। একদিকে কম বৃষ্টি, অন্যদিকে উৎপাদন খরচের বৃদ্ধি– এই দুইয়ের মাঝে পড়ে কৃষি অর্থনীতি বিপর্যস্ত হবে। তাই এখনই সরকারের সক্রিয় ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি।
সার মজুত নিশ্চিত করা, জলাধারগুলিতে সুষ্ঠু ও সমতাভিত্তিক জলবণ্টনের পরিকল্পনা করা এবং কৃষকদের জন্য সময়োপযোগী বপন সংক্রান্ত পরামর্শ দেওয়া– এসব পদক্ষেপে আর বিলম্ব করা চলবে না। প্রকৃতি তার নিজস্ব চক্রে চলে, কিন্তু প্রস্তুতির অভাব যেন মানবসৃষ্ট সংকট ডেকে না আনে, এটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সম্ভাব্য খরার পূর্বাভাসকে সতর্কবার্তা হিসাবে নিয়ে যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তবে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অন্যথায়, এই ‘বিলো নর্মাল’ বৃষ্টিপাত সহজেই গভীর কৃষি ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হতে পারে। এর পাশাপাশি জল সংরক্ষণে স্থানীয় স্তরে উদ্যোগ, খরা-সহনশীল ফসলের প্রসার, কৃষিতে প্রযুক্তিনির্ভর পূর্বাভাস ব্যবস্থার উন্নয়ন– সবই ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। পরিকল্পিত ও টেকসই কৃষিনীতি গ্রহণই কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
