সাম্রাজ্যের কেল্লা ভাঙে। ভাঙে প্রেম, ভালবাসা, সম্পর্ক। আনুগত্যের অভিনয়। দর্পের আয়না। রাজ্যের বিগত শাসক দলের সংসারেও ভাঙন-সুর।
'দ্য টাইম ইজ আউট অফ জয়েন্ট'। এই মহাভাঙন সময়কেও গ্রাস করল! কালের পারম্পর্য আলগা হয়ে গিয়েছে। তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান। কোন ঈর্ষা ও বিদ্বেষের অভিশাপ আমাকে পাঠাল এই বিপুল ভাঙনের বিপর্যয়ের মধ্যে! এই প্রসারিত ধস মেরামতির ক্ষমতা মানুষের নেই।
মৃত্যুহীন এই উক্তি উইলিয়াম শেক্সপিয়র বসিয়েছেন ডেনমার্কের এক রাজকুমার, জার্মানির উইটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের ছাত্র, হ্যামলেটের মুখে। এই রাজকুমারটি দেশে ফিরে এমন এক রাজনৈতিক জটিলতা, ক্ষমতার লড়াই, বদলের বিপর্যয় এবং বিশ্বাসঘাতকতার আবর্তে পড়লেন, তাঁর মনে হল- তাঁর সমস্ত আশা ও প্রত্যয় যেন ভেঙে পড়ছে তাসের ঘরের মতো। এমন অবিশ্বাস্য বিতত বিপর্যয় কীভাবে ঘটে রাজনীতি থেকে ব্যক্তিগত জীবনে, সমাজে-সংসারে-পরিবারে, কীভাবে অনিবার্য সুড়ঙ্গ পথে, ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধ আর অপস্রিয়মাণ সততার মধ্যে, আমাদের স্বার্থ, লোভ, ঈর্ষা, নিষ্ঠুরতা, ক্ষমতালিপ্সা ক্রমশ জড়িয়ে যায় চারধারে পাড়ভাঙা ধসের সঙ্গে, তা দেরিদা ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েছেন তাঁর নিগূঢ় বই 'স্পেক্টার্স অফ মার্কস'-এ। এবং এই প্রসঙ্গে বিস্তারে আলোচনাও করেছেন।
তালগোল পাকিয়ে গিয়েছে ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান। কোন ঈর্ষা ও বিদ্বেষের অভিশাপ আমাকে পাঠাল এই বিপুল ভাঙনের বিপর্যয়ের মধ্যে! এই প্রসারিত ধস মেরামতির ক্ষমতা মানুষের নেই।
এখনকার রাজনীতি, সমাজনীতি, পরিবারনীতির প্রেক্ষিতে, হ্যামলেটের আত্মিক আর্তনাদ: 'দ্য টাইম ইজ আউট অফ জয়েন্ট'। পড়তে গিয়ে মনে হয়- এই উক্তি এখনও হারায়নি তাৎপর্য। এখনও আমাদের ঈর্ষা, লিপ্সা, লোভ, চাতুরি, এবং মুখোশ-পরা অস্পষ্ট যাপন ডেকে আনে অনিবার্য এবং অমোঘ ধ্বংস। প্রসারিত দৌলত, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, অহং প্রকাশের জগজম্প আর ডিজে-র মধ্যে আমাদের নজর কীভাবে এড়িয়ে যায় সময়সেতুর আলগা নাটবল্টু। আকস্মিক ভেঙে পড়ে ভবিষ্যৎ। কিছুতেই কোনওভাবে কোনও কাউন্টার শক্তি দিয়ে আটকানো যায় না সেই হুড়মুড়, সেই পতন।
কে বলে ইতিহাস কখনও একই কথা ফিরে ফিরে বলে না! ইতিহাসই তো বারবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে আপাত-অ্যাবসলিউট ক্ষমতার হুংকার ও হৃতসর্বস্বতা। বারবার প্রমাণ করেছে, শাসকের আকাশস্পর্শী দম্ভের স্তম্ভ আসলে কত পলকা। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় পিবি শেলির 'ওজিম্যান্ডিয়াস' কবিতাটি: মরুভূমির মধ্যে একটি নিঃসঙ্গ ভগ্নপ্রাচীন মূর্তি। তলায় লেখা: পথিক, তাকিয়ে দেখো, যত দূর তোমার চোখ যাচ্ছে, ওই রাজত্ব, ওই ঐশ্বর্য-সব আমার। পথিক তাকিয়ে দেখে, শুধু আদিগন্ত নিরন্তর নিস্তরঙ্গ বালি!
আমাদের ঈর্ষা, লিপ্সা, লোভ, চাতুরি, এবং মুখোশ-পরা অস্পষ্ট যাপন ডেকে আনে অনিবার্য এবং অমোঘ ধ্বংস। প্রসারিত দৌলত, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, অহং প্রকাশের জগজম্প আর ডিজে-র মধ্যে আমাদের নজর কীভাবে এড়িয়ে যায় সময়সেতুর আলগা নাটবল্টু।
'ভাঙন' দর্শনের এই বিপুল সম্প্রসারণকে যদি একচুমুকের আওতায় এনে ফেলি, তাহলে বলার: সৃষ্টির মতো ভাঙনও চিরকালীন। সাম্রাজ্যের কেল্লা ভাঙে। দর্পের আয়না ভাঙে। ভাঙে প্রেম, ভালোবাসা, সম্পর্ক। ভাঙে দুর্নীতির নাগপাশ। ভাঙে আনুগত্যের অভিনয়। রাজ্যের বিগত শাসক দলের সংসারে ভাঙনের প্রতিধ্বনি ক্রমশ জোরালো হয়ে উঠেছে। কোন মন্ত্রবলে তা থামবে, দেখার।
