বাংলা ভাষা অভিপ্রকাশের যে-ভঙ্গি, তার সঙ্গে পায়ের তলার জমির চরিত্র মিলছে না, শ্যামলিমার বদলে তাতে যেন বা ফুঁসে উঠছে আরবের বালুকারাশি। মনে হয়েছিল সনজীদা খাতুনের। তাই বলে বাংলায় অন্য ভাষার শব্দের আগমন তাঁর কাছে আদৌ অনভিপ্রেত ছিল না, এর জন্য, এমনকী, রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যের বিপক্ষে গিয়ে দাঁড়াতেও কুণ্ঠিত হননি। লিখছেন আশিস পাঠক।

বাংলা ভাষার জন্য আমৃত্যু লড়াই করেছেন সনজীদা খাতুন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের ঠিক আগের দিন মৃত্যু হল তাঁর। এরপরে তাঁকে নিয়ে এখানে-ওখানে যত প্রয়াণলেখ, তাতে এ কথাটা বারবারই শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কোন বাংলা ভাষা, কতটা ‘বাংলা’ সেই বাংলা ভাষা?
এই যে প্রশ্নচিহ্ন, তার নেপথ্যে একটা পরিমাপের প্রশ্ন আছে। আর সে পরিমাপ ব্যক্তিভেদে, তার সামাজিক ও ধর্মীয় পরিবেশ-প্রতিবেশ ভেদে আলাদা হতে বাধ্য। বাংলা ভাষায় জোর করে আরবি-ফারসি শব্দের এবং চলনের প্রবেশের বরাবরই বিরুদ্ধে ছিলেন সনজীদা। এবং এইখানে, শুধু রবীন্দ্রসংগীতে নয়, সনজীদা আরও একভাবে বহন করে নিয়ে চলেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে।
নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় ‘রক্ত’ অর্থে ‘খুন’ শব্দটি ব্যবহার করায় রবীন্দ্রনাথ নাকি আপত্তি জানিয়েছিলেন। প্রায় শতবর্ষ আগে, ১৩৩৪ সালের ১৪ পৌষ সাপ্তাহিক ‘আত্মশক্তি’-তে ‘বড়র পিরীতি বালির বাঁধ’ নামে একটি লেখায় সোজাসুজি লিখলেন নজরুল– ‘যে কবিগুরু অভিধান ছাড়া নূতন নূতন শব্দ সৃষ্টি করে ভাবীকালের জন্য আরো তিনটে অভিধানের সঞ্চয় রেখে গেলেন, তঁার এই নতুন-শব্দ-ভীতি দেখে বিস্মিত হই। মনে হয়, তঁার এই আক্রোশের পেছনে অনেক কেহ এবং অনেক কিছু আছে। আরো মনে হয়, আমার শত্রু-সাহিত্যিকগণের অনেক দিনের অনেক মিথ্যা অভিযোগ জমে জমে ওঁর মনকে বিষিয়ে তুলেছে। নৈলে আরবী-ফার্সি শব্দের মোহ তো আমার আজকের নয় এবং কবিগুরুর সাথে আমার বা আমার কবিতার পরিচয়ও আজকের নয়। কই, এতো দিন তো কোনো কথা উঠল না এ নিয়ে!’
সেই সময় বাংলা ভাষা কতটা ‘হিন্দু বাংলা ভাষা’ আর কতটা ‘মুসলমান বাংলা ভাষা’ হবে সে নিয়ে বেশ একটা বিতর্কই তৈরি হয়েছিল। নজরুল আরও বলেছিলেন, ‘কবিগুরু কেন, আজকালকার অনেক সাহিত্যিক ভুলে যান যে, বাংলার কাব্যলক্ষ্মীর ভক্ত অর্ধেক মুসলমান। তারা তঁাদের কাছ থেকে টুপি আর চাপকান চায় না, চায় মাঝে মাঝে বেহালার সাথে সারেঙ্গীর সুর শুনতে...’। আর এই ভুলে যাওয়া যে তাঁর সময়ের বহু আগে থেকেই চলেছে সেটাও উল্লেখ করেছিলেন নজরুল, ‘কবির চরণে ভক্তের সশ্রদ্ধ নিবেদন, কবি তো নিজেও টুপী-পায়জামা পরেন, অথচ, আমরা পরলেই তাঁর এতো আক্রোশের কারণ হয়ে উঠি কেন বুঝতে পারিনে।... এই আরবী-ফার্সি শব্দ প্রয়োগ কবিতায় শুধু আমিই করিনি। আমার বহু
আগে ভারতচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ প্রভৃতি করে গেছেন।’
নানা সময়ে নিজের নানা প্রবন্ধে এই প্রসঙ্গের আলোচনা করেছেন সনজীদা। আর সেসবে বারবারই দেখি কোনও পূর্ব সংস্কার তাঁর মধ্যে নেই। ভাষার চলনের স্বাভাবিকতাই তঁার একমাত্র অন্বিষ্ট। খুব খোলাখুলি লিখছেন, “সময়টাই হয়ে উঠেছিল বিশেষ তপ্ত। এর বছর দুই আগে কলকাতাতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও হয়ে গেছে। ভাষা নিয়ে যে-সব তর্ক উঠেছিল তার সবগুলিতে আসলেই রবীন্দ্রনাথ যথোপযুক্ত ধীরতার পরিচয় দিতে পারেননি। ‘শত্রু-সাহিত্যিক’ সম্পর্কে নজরুলের অভিযোগ অমূলক নাও হতে পারে। রবীন্দ্রনাথের মতো মহৎব্যক্তির অন্তরে ধৈর্যের অভাব মুসলমানদের মনে কতদূর ক্ষোভ সঞ্চার করেছিল তার প্রমাণ নজরুলের ওই প্রবন্ধ।
অন্যপক্ষে, কেবল সাহিত্য ক্ষেত্রে নয়, সাধারণভাবে বাংলা ভাষার উপরেই সমসাময়িক মুসলমানদের একটি ধর্মসম্প্রদায়গত বিজয় অভিযান পরিচালিত হয়েছিল– তার প্রমাণ তৎকালীন পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে আছে। ‘বেহালার সাথে সারেঙ্গীর সুর’ নয়, ‘টুপি আর চাপকান’-ই চাই কেবল, এমন এক জেদ পেয়ে বসেছিল অনেককে।”
সে জেদ কতটা তার প্রমাণ আমরা পাই মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ প্রণীত মক্তব-মাদ্রাসা শিক্ষা ২য় ভাগে (১৯৩০ সালে এএফ মোহাম্মদ কর্তৃক ইসলামিয়া লাইব্রেরী, পাটুয়াটুলী, ঢাকা থেকে প্রকাশিত ১০ম সংস্করণ)। এ বইয়ের সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩২ সালে, ‘প্রবাসী’-তে। প্রচলিত বাংলা শব্দের যে-অর্থসন্ধান সেই বইয়ে দেওয়া হয়েছিল তাতে স্বাভাবিক বোধের চেয়ে জেদের মূর্তিই বেশি প্রকট। ‘প্রদীপ’ মানে সেখানে ‘চেরাগ’, ‘ধার্মিক’ সেখানে ‘দীনদার’, ‘বিদ্যা’ হল ‘এলেম’, ‘ধনী’ সেখানে ‘মালদার’। প্রতিশব্দগুলির প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই অর্থের অনর্থ ঘটিয়ে ছেড়েছে, বোঝাই যায়।
কিন্তু সনজীদা এখানে মোহমুক্ত দৃষ্টিতে বিষয়টিকে দেখছেন। রবীন্দ্রনাথের ধৈর্যের অভাব যেমন লক্ষ করছেন– তেমনই বাঙালি মুসলমানের চিন্তাধারাকেও আন্ডারলাইন করছেন। লিখছেন– “এই যে ভাষার ধর্মসঙ্গত প্রয়োগ নিয়ে বিবাদ– এ থেকে বাঙালি মুসলমানের চিন্তাধারাটি দেখতে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আলাপে নিরত কয়েকজন সাহিত্যে পরিবেশের অনুকূল ভাষাযোজনার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। কিন্তু, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এবং কাজী ইমদাদুল হক হাতে-কলমে তাঁদের বিচারমতে মুসলমানের উপযুক্ত ভাষা রচনা এবং সেই ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করে তুলতে ব্রতী হয়েছিলেন। চিন্তার এই দ্বিতীয় ধারাই প্রাক ভাষা-আন্দোলন পর্বের বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক বিভ্রান্তির উৎস।
‘আমরা ডিমকে আন্ডা বলিব বলিয়া পাকিস্তান হাসেল করিয়াছি’ আবুল মনসুর আহমদের এই মনোভাবের পিছনে সঙ্কীর্ণ সাম্প্রদায়িক চিন্তাপ্রসূত হীনমন্যতাবোেধ কার্যকর। ভাষাজ্ঞানেরও বলিহারি। আন্ডা কি অণ্ড থেকেই জন্মানো শব্দ নয়? বাঙালি মুসলমানের একটি শ্রেণীর ভিতরে এই বোধ যথার্থই লালিত হয়েছিল। ফলে, ধর্মই যেন সাহিত্য সংস্কৃতি ও জাতীয়তা বোধের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল ওই সময়ে। উচ্ছ্বাসের বশে, আমরা মুসলমান আর মুসলমান আর মুসলমান– এই হয়ে উঠেছিল ধ্যান জ্ঞান।... পঞ্চাশ/একান্ন সালের দিকে সরকারি ‘মাহে-নও’ পত্রিকার একটি গল্পে এমন একটি লাইন পাওয়া গিয়েছিল– ‘লেবাসের অন্দরে তার তামাম তনু পোসিনায় তবর্ত’।”
ভাষার এই ভঙ্গির সঙ্গে পায়ের তলার যে শ্যামল মাটি তার স্নিগ্ধতার আকর্ষণ নেই, মনে হয়েছিল সনজীদা খাতুনের। এ আসলে ধর্মভিত্তি– আরবের বালুকা, ইরানের বুলবুলির দিকে প্রাণের টান। ভাষা-সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে এই স্পষ্ট, আবেগহীন দৃষ্টিও তঁাকে সমসময়ের অন্যদের চেয়ে আলাদা করেছে।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক আধিকারিক, গ্রন্থন বিভাগ,
বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়
gulgule.ashis@gmail.com