সম্প্রতি, এই দেশে এবং এই রাজ্যে, কোনও আপাত-অদৃশ্য এবং অনির্ণেয় উৎস থেকে উদ্গারিত হুমকি ক্রমাগত ত্রাস এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করেই চলেছে। কখনও আদালতের মধ্যে বিস্ফোরণের হুমকি। কখনও প্লেনের মধ্যে বোমা। এবং আকস্মিক ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল উড়িয়ে দেওয়ার হুমকি। কোনও হুমকিকে তাচ্ছিল্য করা যায় না। সুতরাং বিপদের গন্ধ পাওয়া কুকুর থেকে বম্ব স্কোয়াড, পুলিশ বাহিনীর তৎপরতা, তন্নতন্ন সন্ধান এবং শেষে ফক্কা! এবং ব্যর্থ শ্রমের বিস্বাদ। এবং হয়তো আড়ালে কোনও ফন্দিবাজ তঞ্চক শয়তানের হাসি। এবং সবশেষে, সাধারণ মানুষের মনে একটিই কম্পিত প্রশ্ন– যদি কোনও দিন হুমকি সত্যি হয়ে ওঠে, কী হবে?
অথচ, পিছন ফিরে তাকালে দেখতে পাওয়া যায় সেই কোন আবছা পৌরাণিক যুগ থেকে অতি আধুনিক সাইবার থ্রেট-এর যুগ পর্যন্ত মানুষের ইতিহাস ও সাহিত্যে, তার সমাজে ও সংসারে, পরতে পরতে জড়িয়ে আছে হুমকির কত বিচিত্র পথ ও রূপ! ভারতের ‘কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র’ কি শেখায় না হুমকির ভাষা, পথ, উপায় এবং যথার্থতা? কূটনীতি থেকে যুদ্ধ, সর্বত্র হুমকি কতভাবে প্রয়োজনীয়–চোখে আঙুল দিয়েই দেখিয়েছেন ভারতের কৌটিল্য, ইউরোপের মাকিয়াভেলি। এবং কীভাবে হুমকির ভাষণ দিয়ে পাবলিক খ্যাপানো যায়, তৈরি করা যায় দ্রোহ, তা কি শেখাননি গ্রিক বক্তা ডেমসথেনেস?
এই যুগের সাইবার হুমকি জীবনের ত্রাসে নিয়ে এসেছে নতুন মাত্রা! সোশ্যাল মিডিয়ার হুমকি, সেল ফোনের নানা ভয়, সাধারণ মানুষের জীবনে তৈরি করেছে হুমকির নরক।
জুলিয়াস সিজার খুন হওয়ার পরে শেক্সপিয়রের অ্যান্টনি কি দেশের লোককে খেপিয়ে তুলছে না ডেমসথেনেসের স্টাইলে এক চতুর হুমকির ভাষণ দিয়েই? মনে পড়ে, মধ্যযুগের দুই লেখক দান্তে এবং বোকাচিওকে– যঁারা হুমকিতে ভর্তি। দান্তের প্রতি যারা অবিচার করেছে, তাদের ক্রমাগত অভিশাপের হুমকি দিচ্ছেন এই মহাকবি। বোকাচিও তঁার ‘দ্য ডেকামেরন’-এ এমন এক মালিকে এনেছেন, যে বোবাকালার ভান করে নীরব হুমকিতে চার্চের পূজারিনিদের কুকর্মে রাজি করায়! তবে এসব হুমকি তুচ্ছ গ্রিক নাট্যকার এসকিলাস, সফোক্লেস, ইউরিপিডিসের নাটকে দৈব-হুমকির কাছে। মানুষের সভ্যতা ও নিয়তি মাথায় হুমকির বোঝা বহন করেই যুগযুগান্তরে পা ফেলে চলেছে! অ্যারিস্টোফেন্স কি তঁার ‘দ্য ক্লাউডস’-এ এই বার্তাই দিতে চাননি, মানুষের ভাগ্যে কোনও দিনই হুমকির মেঘ কাটবে না!
বরং এই যুগের সাইবার হুমকি জীবনের ত্রাসে নিয়ে এসেছে নতুন মাত্রা! সোশ্যাল মিডিয়ার হুমকি, সেল ফোনের নানা ভয়, সাধারণ মানুষের জীবনে তৈরি করেছে হুমকির নরক। এবং বেড়েছে আত্মহত্যা। এ প্রসঙ্গে বলার, প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করার জন্য, আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য নয়। তাই প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপ যেমন জরুরি, তেমনই নাগরিক সচেতনতারও বিকল্প নেই। নইলে এই হুমকির সংস্কৃতি একদিন আমাদের স্বাভাবিক জীবনকেই গ্রাস করবে।
