shono
Advertisement
Indian politics

‘ককরোচ জনতা পার্টি’, ভারতের যুব সমাজ ও ভারতীয় রাজনীতি

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ ওরফে ‘সিজেপি’ তার রাজনৈতিক লক্ষ্যের কথা জানিয়েছে। তারা চায় সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে। তরুণদের নেতৃত্বে স্বাধীন আন্দোলন গড়ে তুলতে। তাদের বক্তব্য, এই নজিরবিহীন উত্থান প্রমাণ করেছে ভারতীয় যুব সমাজ অবহেলিত, উপেক্ষিত ও অবমূল্যায়িত হলেও জীবনের আশা ছাড়েনি।
Published By: Kishore GhoshPosted: 06:41 PM May 27, 2026Updated: 06:41 PM May 27, 2026

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায়ের অংশীদার। সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ রদ ও পেগাসাস মামলায় সরকারি সিদ্ধান্তের অনুমোদনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। দেশদ্রোহ আইন স্থগিত রাখার ক্ষেত্রে উদ্যোগী হয়েছিলেন। এনসিইআরটি-র স্কুল পাঠ্যপুস্তকে ‘বিচার বিভাগের দুর্নীতি’ সম্পর্কিত অধ্যায় কেন রাখা হয়েছে, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিজেই সেই প্রশ্ন তুলেছিলেন। বই প্রত্যাহারের নির্দেশও দিয়েছেন। গুজরাতে পিপাভাও বন্দর সম্প্রসারণ মামলায় পরিবেশকর্মীদের আপত্তি প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘দেশে এমন কোনও উন্নয়ন প্রকল্প আছে কি যাকে তথাকথিত পরিবেশ আন্দোলনকর্মীরা স্বাগত জানিয়েছেন?’ ওই মন্তব্য প্রত্যাহার করতে তাঁকে চিঠি লিখেছিলেন অর্ধশতাধিক পরিবেশ সংগঠনের কর্তারা। তাঁরা বলেছিলেন, যে কোনও অবৈধ ও
সর্বনাশা প্রকল্পের বিরোধিতা করা তাঁদের সাংবিধানিক অধিকার। নির্বাচন কমিশনের এসআইআর সংক্রান্ত মামলাও চলছে তাঁর ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর এজলাসে। তাঁদের নির্দেশ সবসময় বিরোধীদের খুশি করতে পারেনি। কেন ২৭ লাখ মানুষ ভোট দিতে পারলেন না, সেই প্রশ্ন শুনতে হচ্ছে।

Advertisement

মামলার রায় ও মামলা চলাকালীন মন্তব্যের কারণে আরও অনেকের মতো প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তও বহু আলোচিত। যেমন, ৩৭০ অনুচ্ছেদ রদের সিদ্ধান্ত ‘বৈধ’ বলার সময় সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জম্মু-কাশ্মীরকে রাজ্যের মর্যাদা ফিরিয়ে দিয়ে বিধানসভার ভোট করাতে হবে। অথচ এখনও রাজ্যের মর্যাদা কেন্দ্রীয় সরকার দেয়নি! সুপ্রিম কোর্টও নীরব! পেগাসাস মামলায় বলা হয়েছিল, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে স্পাইওয়্যার ব্যবহার করা যেতেই পারে তবে অবাধ ছাড়পত্র দেওয়া যায় না। অথচ অভিযোগ, অপব্যবহার হয়েই চলেছে। স্কুল পাঠ্যপুস্তকে বিচার বিভাগের দুর্নীতি সম্পর্কিত অধ্যায় প্রত্যাহারের নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন ঠিক-ই কিন্তু তাতে বিচার বিভাগকে নিষ্কলুষ প্রমাণ করা গেল কি?

লোকসভায় পেশ করা সরকারি তথ্যই দেখাচ্ছে, ২০১৬ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত কর্মরত বিচারকদের বিরুদ্ধে ৮ হাজার ৬০০টি অভিযোগ জমা পড়েছে! দিল্লি হাই কোর্টের বিচারপতি যশবন্ত শর্মার বাড়ি থেকে আগুনে পোড়া ১৫ কোটি টাকা উদ্ধার হলেও অর্থের জোগান কীভাবে সেই রহস্য অনুদ্ঘাটিত থেকে গেল অভিশংসন এড়াতে পদত্যাগ করায়। শাক দিয়ে মাছ কখনও ঢাকা যায় না।

কিন্তু সেসব নয়, সম্প্রতি প্রধান বিচারপতির মন্তব্য ঘিরে যা ঘটে চলেছে, তা কল্পনাতীত। মন্তব্যের অপব্যাখ্যা করা হয়েছে বলে প্রধান বিচারপতি জানিয়েছেন। কিন্তু বিতর্ক থামেনি। বরং সাবানের ফেনার মতো বেড়েই চলেছে। আগামী বছর ৯ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতি অবসর নেবেন। সেই দিন পর্যন্ত কিংবা হয়তো তার পরেও বহু দিন তিনি ভেবে যাবেন, মন্তব্য সত্যিই আলটপকা ছিল কি না।

মন্তব্যটা করেছিলেন এক মামলার শুনানির চলাকালীন। বিরক্ত সূর্যকান্ত মামলাকারীকে বলেছিলেন, কিছু তরুণ আছে আরশোলার মতো, যাদের চাকরি নেই। কোনও পেশাতেই জায়গা হয় না। তাদের কেউ সংবাদমাধ্যমে যায়, কেউ সামাজিক মাধ্যমে, কেউ বা আরটিআই কর্মী হয়ে যায়, কেউ আন্দোলনজীবী হয়ে ওঠে, এবং তারপর প্রত্যেককে আক্রমণ শুরু করে। এই পরজীবীরা সিস্টেমকে আঘাত করে। আরশোলার মতো ছড়িয়ে পড়ে। মামলাকারীর উদ্দেশে এরপর বলেছিলেন, আপনিও কি সেই দলে যোগ দিতে চান?

সেই শুরু। প্রধান বিচারপতির মন্তব্য তোলপাড় করে তোলে সামাজিক মাধ্যম। রাতারাতি জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা ‘সিজেপি’। সেই অর্থে এটা কোনও রাজনৈতিক দল নয়। স্যাটায়ারধর্মী এক আন্দোলনের মঞ্চ। মহারাষ্ট্রের যুবক অভিজিৎ দীপকে, যিনি বস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করছেন, ওই ‘আরশোলা ও পরজীবী’ মন্তব্যের জেরে সামাজিক মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন তুমুল ব্যঙ্গাত্মক এই প্ল্যাটফর্ম, যার সদস্য হওয়ার আবশ্যিক শর্ত: বেকার ও অলস হতে হবে, দিনভর অনলাইনে বুঁদ থাকতে হবে এবং পেশাদারভাবে রাগ ও ক্ষোভ প্রকাশে পারদর্শী হতে হবে। প্রধান বিচারপতির বলা ‘আরশোলা’ শব্দটিই হয়ে উঠেছে এই আন্দোলনের মুখ্য প্রতীক। কারণ, আরশোলারা অনন্তকাল বেঁচে থাকে। কোনও কিছুই তার বিলোপ ঘটাতে পারে না। আরশোলা সেই প্রাণী যা কারও পছন্দের নয়, যাকে সবাই ঘৃণা করে।
দুর্গন্ধ, স্যাঁতসেঁতে, নোংরা ও অন্ধকারে যার বসবাস।

রাতারাতি ঘটে গেল বিপ্লব। লাখ-লাখ অনুসারীতে ভরে গেল ‘সিজেপি’-র ওয়েবসাইট। ‘এক্স’ হ্যান্ডলে সদস্য সংখ্যা ২ লাখ ছাড়িয়ে গেল, ইনস্টাগ্রামে ২ কোটি অনুসারী! অগুনতি মিমে ছেয়ে গেল সামাজিক মাধ্যম। শাসক বিজেপি কিংবা বিরোধী কংগ্রেসের চেয়েও ফুলে-ফেঁপে উঠল তাদের সমর্থনের ভিত। ‘আমিও আরশোলা’– এই হ্যাশট্যাগে সমর্থন দিতে লাগলেন বিরোধী নেতানেত্রী, সদস্য, সমর্থকেরা। সামাজিক মাধ্যম থেকে বের হয়ে উৎসাহী তরুণ-তরুণীরা আরশোলার পোশাক পরে অংশ নিতে লাগলেন পরিচ্ছন্ন অভিযানে। একটা উন্মাদনা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল দেশে। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশে। যেদিকে তাকাও সেদিকে আরশোলা! আরশোলায় ছেয়ে যাচ্ছে দেশ! সরকার বিচলিত! দু’-হপ্তাও যার বয়স নয়, সামাজিক মাধ্যমে তাদের এই প্রবল উপস্থিতি কাঁপিয়ে দিয়েছে সরকারকে। কেন?

নয়া প্রজন্ম বা ‘জেন জি’ তাদের হতাশা, অসন্তোষ, অপ্রাপ্তির আয়না শাসকের মুখের সামনে তুলে ধরেছে বলে? প্রচারের বিপুল ঢক্কানিনাদে মোহমুগ্ধ না হয়ে মুখের উপর ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়’ প্রশ্ন তুলেছে বলে? থরহরি কম্প শুরু না হলে রাতারাতি কেন তাদের ‘এক্স’ হ্যান্ডল বন্ধ হবে? অভিজিৎ দীপকে কিংবা তঁার পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকি পেতে হবে? কেন তাঁকে বলতে হবে, আশঙ্কা করছি, দেশে ফিরলে নির্ঘাত আমার স্থান হবে তিহার জেল?

অভিজিতের শঙ্কা নিছক অমূলক নয়। কারণ, ইতিমধ্যেই প্রচার শুরু হয়েছে, এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য দেশকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দেওয়া। দিকে দিকে অশান্তি শুরু করে সরকারের পতন ঘটানো, যে-সরকার ভারতকে তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করতে চলেছে। আরএসএসের মুখপত্র ‘অর্গানাইজার’ লিখেছে, যুব বিক্ষোভ নয়, এ এক গভীর চক্রান্ত। বিজেপি নেতারা বলছেন, পাকিস্তান ও জর্জ সোরসের মতো ভারতবিরোধীরা এর মদতদার। এরা শক্তিশালী ভারত চায় না। এরা ‘আরবান নকশাল’-দের উসকানি দিয়ে অশান্তি পাকাতে চায়। এক দশক ধরে এমন অনেক প্রচার দেশবাসী দেখছে। দেশদ্রোহী এরাই।

একটা ছোট্ট হিসাব দিই। এখন শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৩ কোটি। ১০ কোটি যুবা চাকরির চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছে। বেকারদের ৬৭ শতাংশ গ্র‍্যাজুয়েট। ২০০৪ সালে সংখ্যাটা ছিল ৩২ শতাংশ। শহরে রোজগার হারিয়ে এক দশকে ৮ কোটি যুবা গ্রামে ফিরেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের নাভিশ্বাস রোজগার হরণের প্রধান কারণ। পরীক্ষা বা চাকরির প্রশ্নপত্র ফঁাসের মতো অপরাধ নৈমিত্তিক ঘটনা। হতাশা যত বাড়ছে তত বেড়ে চলেছে ‘ভাতা’ বা ‘ডোল’-এর রাজনীতি। জেন জি-র হাহাকার না বুঝে সামাজিক অসন্তোষ সৃষ্টির দায় দেশদ্রোহী ও চক্রান্তকারীদের ঘাড়ে চাপিয়ে শাসককুল নিজেদের বিপন্মুক্ত ভাবতেই পারে। কিন্তু প্রলয় বন্ধ থাকবে কি?

‘সিজেপি’ তার রাজনৈতিক লক্ষ্যের কথা জানিয়েছে। তারা চায় সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে। কণ্ঠস্বর জোরালো করে তরুণদের নেতৃত্বে স্বাধীন আন্দোলন গড়ে তুলতে। ইনস্টাগ্রাম পেজে তারা লিখেছে, এই নজিরবিহীন উত্থান প্রমাণ করেছে ভারতীয় যুব সমাজ অবহেলিত, উপেক্ষিত ও অবমূল্যায়িত হলেও জীবনের আশা ছাড়েনি। আরশোলার মতো তারা অন্ধকার ফঁাকফোকরে দিব্যি বেঁচে থাকে। নিকেশ করার সব চেষ্টা তারা বানচাল করে দেয়। তারা কণ্ঠস্বর তুলে ধরার অপেক্ষায় ছিল।

অতঃকিম্‌? আগ্রহ দুই দিকেই। পরের ধাপে নয়া প্রজন্ম কীভাবে এগবে, কে বা কারা নেতৃত্ব দেবেন, তা ঘিরে যেমন এক বিপুল আগ্রহ, তেমনই জিজ্ঞাসা, রাষ্ট্র এই প্রত্যাশার ফানুশ কত দিন উড়তে দেবে। সরকার স্বস্তিতে, কেননা, আরশোলারা দ্বিতীয় জয়প্রকাশ নারায়ণের সন্ধান
এখনও পায়নি।

(মতামত নিজস্ব)
saumyabandyo@gmail.com

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement