মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিয়ো কলকাতা সফরে এলেন। ৮ ঘণ্টা নয়, ২ ঘণ্টায় সফর শেষ করলেন। মাঝে গেলেন শুধুমাত্র ‘মিশনারিজ অফ চ্যারিটি’-তে। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠক করলেন না। এর মাধ্যমে কী ‘বার্তা’ দিতে চাইল ওয়াশিংটন? লিখলেন দীপঙ্কর দাশগুপ্ত।
কী আশ্চর্য সমাপতন! ঠিক ১৪ বছর আগে সেটাও ছিল মে মাস। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সেবারই প্রথম কলকাতা এলেন মার্কিন বিদেশ সচিব হিলারি ক্লিনটন। আর এবারেও সেই মে মাসেই আবার শহরে এলেন মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিয়ো। কিন্তু এই দুই ঘটনার মধ্যে তফাতও বিস্তর। তখন দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি ৩৪ বছরের কমিউনিস্ট জমানার অবসান ঘটিয়ে নতুন মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
সেই কৃতিত্ব এতটাই নজর কাড়ল আমেরিকার যে, খোদ মার্কিন বিদেশ সচিব চলে এলেন তঁাকে অভিনন্দন জানাতে। রাজ্যের সচিবালয় মহাকরণ থেকে তখনও স্থানান্তরিত হয়নি নবান্নে। হিলারি তাই মহাকরণে গিয়েই দেখা করলেন প্রবল শক্তিশালী ও জনপ্রিয় নেত্রী মমতার সঙ্গে। বৈঠক করলেন একঘণ্টারও বেশি সময় ধরে। সেবারই ‘টাইম’ ম্যাগাজিনে আবার বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের তালিকায় একসঙ্গে উঠে এসেছেন হিলারি এবং মমতা। একজন মহিলা নেত্রী একা একটি দল তৈরি করে এত দিনের কমিউনিস্ট সরকারকে ফেলে দিল– সে ব্যাপারটা স্বাভাবিকভাবেই দুনিয়ার মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল।
ট্রাম্পের শুভেচ্ছা জানানো যদি আন্তরিক হয়, তাহলে পরবর্তী পদক্ষেপ হিসাবে পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করার জন্য বিদেশ সচিব রুবিওর উচিত ছিল মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে অভিনন্দন জানানো।
সেই সঙ্গে মার্কিন-বিরোধী মনোভাবাপন্ন কমিউনিস্ট শাসনের অবসানে রাজ্যে মার্কিন বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে– এমন আশাই জোরালোভাবে উসকে দিয়েছিল মমতা-হিলারি সাক্ষাৎ। জনমানসে ধারণা হয়েছিল, দীর্ঘ দিনের অর্থনৈতিক খরা কাটিয়ে এবারে বুঝি সত্যিই আমেরিকার কাছে কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্ব বাড়তে চলেছে। কিন্তু কিছু দিন যেতেই কলকাতার আমেরিকান কনস্যুলেট, দিল্লির মার্কিন দূতাবাস এবং ওয়াশিংটন বুঝে গেল– মমতার নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের শিল্প ও উন্নয়ন-বিরোধী প্রকৃত চেহারা। মার্কিন কূটনীতিকরা দেখলেন কোনও শিল্পপতি, ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীকে মমতার সরকার প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ করতে দেবে না।
‘স্পেশাল ইকোনমিক জোন’ (‘এস. ই. জেড’) আইন বাতিল করে ইনফোসিস, উইপ্রোর মতো তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাকে মমতা জানিয়েও দিয়েছেন, তাদের জন্য সরকারি নীতির ব্যতিক্রম হবে না। তৃণমূল সরকারের অগ্রাধিকার হল ‘সোশ্যাল সেক্টর’ বা সামাজিক ক্ষেত্রের উন্নয়ন। মার্কিন কূটনীতিকদের পর্যবেক্ষণ হল, যে রাজনৈতিক নেত্রী দেশের সেরা শিল্পপতি টাটাকে রাজ্য থেকে তাড়িয়ে দিতে পারেন, সেই রাজ্যে মার্কিন বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়ে আমেরিকায় সদর্থক বার্তা পাঠানোর প্রশ্ন ওঠে না। মার্কিন কূটনীতিকদের আলোচনায় তাই একটি মন্তব্যই বারবার ঘুরপাক খেত– ‘মমতা ইজ মোর কমিউনিস্ট দ্যান দ্য কমিউনিস্টস’– বামপন্থীদেরও আরও এক কাঠি উপরে মমতা। ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’– এমন স্লোগান ও আমেরিকা-বিরোধী বিক্ষোভ না থাকলেও বহু ক্ষেত্রে মমতার তৃণমূল সরকার ছিল কার্যত বামপন্থী জমানারই সম্প্রসারণ। ফলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, নেপাল, ভুটান এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার হিসাবে কলকাতার অবস্থান মার্কিন বাণিজ্যিক লজিস্টিকসের জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক হলেও আমেরিকা সেভাবে পশ্চিমবঙ্গের ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখায়নি। কিন্তু দারিদ্র জিইয়ে রাখা মমতার তৃণমূল সরকারের পতন এবং রাজ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর পশ্চিমবঙ্গে যখন ‘ডাব্ল ইঞ্জিন সরকার’, তখন শিল্প ও বাণিজ্য মহলে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, দেশের বড় বড় শিল্পপতি এ রাজ্যে বিনিয়োগ করতে শুরু করলে যে-আস্থার জায়গা তৈরি হবে, তাতে মার্কিন লগ্নির পথও খুলে যাবে। এই প্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গে বিপুল নির্বাচনী সাফল্যের জন্য প্রধানমন্ত্রী মোদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুভেচ্ছা বার্তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
‘মিশনারিজ অফ চ্যারিটি’-র দৃষ্টান্ত দিয়ে রুবিও মনে করিয়ে দেন যে, ২০২১ সালের শেষ দিকে মোদি সরকার ‘বিরূপ তথ্য’-র অজুহাতে এই সংস্থার বিদেশি অনুদানের লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল, যা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে আবার ফেরানো হয়।
আবার শুধু শুভেচ্ছা বার্তা-ই তো নয়, এবারেও তো মার্কিন বিদেশ সচিব মার্কো রুবিও চলে এলেন কলকাতায়। কিন্তু তারপর? খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার যে, নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তঁার কোনও বৈঠক হল না। ট্রাম্পের শুভেচ্ছা জানানো যদি আন্তরিক হয়, তাহলে তো পরবর্তী পদক্ষেপ হিসাবে পারস্পরিক সম্পর্ককে আরও মজবুত করার জন্য বিদেশ সচিব রুবিওর উচিত ছিল মুখ্যমন্ত্রীর সময় চাওয়া, তঁার সঙ্গে দেখা করে অভিনন্দন জানানো। অথচ সেসব কিছুই ঘটল না। সংবাদপত্রের খবরে জানা গিয়েছিল, রুবিয়ো কলকাতায় কাটাবেন ৮ ঘণ্টা। কিন্তু শনিবার ভোর ৬টা ৪০ নাগাদ তিনি সুইডেন থেকে এসে পৌঁছলেন দমদম বিমানবন্দরে এবং ঘণ্টা দুয়েক শহরে কাটিয়ে তিনি বেলা সাড়ে দশটায় রওনা হয়ে গেলেন দিল্লিতে। মাঝে গেলেন ‘মিশনারিজ অফ চ্যারিটি’-র মাদার হাউসে এবং ওদের অনাথ আশ্রম ‘নির্মল হৃদয়’-এ। রুবিওর ভারত সফরের ঠিক আগেই মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি ক্রিস স্মিথ স্টেট ডিপার্টমেন্টকে এই বিষয়ে ভারতের উপর চাপ সৃষ্টির আর্জি জানিয়েছিলেন। ‘মিশনারিজ অফ চ্যারিটি’-র দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি মনে করিয়ে দেন যে, ২০২১ সালের শেষ দিকে মোদি সরকার ‘বিরূপ তথ্য’-র অজুহাতে এই সংস্থার বিদেশি অনুদানের লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল, যা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে আবার ফেরানো হয়। তাহলে শুধু ‘মিশনারিজ অফ চ্যারিটি’-তে যাওয়ার জন্য রুবিয়োর কলকাতা সফর!
এর মাধ্যমে কী বার্তা দিতে চাইল ওয়াশিংটন? মাদার হাউসে রুবিওর এই যাওয়া নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কের সঞ্চার হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে– এর আসল কারণ হল, কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের উপর ‘ফরেন কন্ট্রিবিউশন রেগুলেশন অ্যাক্ট’ (FCRA) এবং ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ সংক্রান্ত চাপ সৃষ্টির এক সুপরিকল্পিত কূটনৈতিক প্রতীকী পদক্ষেপ। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, রুবিয়োর কলকাতা সফর নিয়ে চিন তির্যক মন্তব্য করেছে। চিনের মাইক্রোব্লগিং সাইট ‘ওয়েইবো’-র একটি পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, রুবিয়ো তঁার সফর নয়াদিল্লি থেকে শুরু তো করলেনই না, কোনও হিন্দু ধর্মস্থানে না গিয়ে তঁার সফরের সূচনা হল ‘মিশনারিজ অফ চ্যারিটি’-তে। অন্য একদল সমালোচক কলকাতার ভৌগোলিক-অর্থনৈতিক গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছেন। তঁাদের মতে, কলকাতা হল পূর্ব ভারতের বৃহত্তম শিল্প কেন্দ্র এবং চিনের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থিত বঙ্গোপসাগরের একটি অন্যতম প্রধান বন্দর। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, পশ্চিমবঙ্গে রুবিয়োর উপস্থিতিকে সরবরাহ শৃঙ্খলের পুনর্গঠন এবং ওয়াশিংটনের ‘চিন+১’ কৌশলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে, যেখানে পূর্ব ভারতকে একটি সম্ভাব্য উৎপাদন ঘঁাটি হিসাবে তুলে ধরা যেতে পারে।
এর মানে হল, বঙ্গোপসাগরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আমেরিকা আবার নতুন করে আগ্রহ দেখাচ্ছে। তাহলে কোনটা বড় সত্যি– ট্রাম্পের অভিনন্দন বার্তা, না কি ‘মিশনারিজ অফ চ্যারিটি’-তে যাওয়ার মাধ্যমে বিজেপি সরকারকে প্রচ্ছন্ন শাসানি? শুধু তাই নয়, কলকাতায় এসে নতুন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন বিদেশ সচিবের বৈঠক না-করা কি নবনির্বাচিত রাজ্য সরকারকে সরাসরি হেয় করা নয়? অথচ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে যদি রুবিয়ো দেখা করতেন, তাহলে রাজ্যে মার্কিন লগ্নির গতিপ্রকৃতি নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হতে পারত। সল্টলেকের সেক্টর ফাইভে সেমিকন্ডাক্টর প্রস্তুতকারক সংস্থা ‘গ্লোবাল ফাউন্ড্রিজ’ একটি ‘গ্লোবাল কেপেবিলিটিজ সেন্টার’ (জি. সি. সি) বা সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ও টেস্টিং কেন্দ্র স্থাপন করছে। এর ফলে সেমিকন্ডাক্টর মানচিত্রে রাজ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করতে চলেছে, যা স্থানীয় আইটি ইঞ্জিনিয়রদের জন্য উচ্চমানের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। মার্কিন সংস্থা ‘ব্ল্যাকস্টোন’ কলকাতার সাউথ সিটি মলটি প্রায় ৪০ কোটি ডলারে অধিগ্রহণ করার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। পূর্ব ভারতের এটি খুচরো বা রিটেল ব্যবসায় অন্যতম বৃহত্তম মার্কিন বিনিয়োগের নজির। এছাড়া মার্কিন আইটি জায়ান্ট ‘ওরাক্ল’, ‘কগনিজেন্ট’ এবং বিভিন্ন মার্কিন পরামর্শদাতা সংস্থা– যেমন, ‘পি. ডব্লিউ. সি. ইন্ডিয়া’ তাদের বড়সড় হাব পরিচালনা করে আসছে। সুতরাং সেইসব আলোচনার অবকাশ সম্পূর্ণ এড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা না করে রুবিওর দিল্লি রওনা হয়ে যাওয়া অত্যন্ত দৃষ্টিকটু ও কূটনৈতিক সৌজন্যের পরিপন্থী।
(মতামত নিজস্ব)
