shono
Advertisement
Iran War

সোশাল মিডিয়ায় রিলস বানিয়ে গণ-আবেগে শান, ইরানের অভিনব 'রণকৌশল'

যদি আচমকা বিদেশি শত্রুর হামলায় সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলি খামেনেই-এর মৃত্যু হয়, বা সেনাবাহিনীর শীর্ষকর্তারা মারা যান, তাহলেও কী করে যুদ্ধ চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে, সে নিয়ে ইরান আগে থেকেই ভেবে রেখেছিল। তাই চার সপ্তাহ পরেও রণে ভঙ্গ দেওয়ার লক্ষণ নেই। উপরন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় ছোট ছোট রিল্‌স বানিয়ে যেভাবে জনমত ও গণ-আবেগ তৈরি করেছে ইরান, তা এই যুদ্ধে আমেরিকা ও ইজরায়েলের জোটকে পিছনে ঠেলে দিয়েছে।
Published By: Kishore GhoshPosted: 07:17 PM Mar 29, 2026Updated: 07:17 PM Mar 29, 2026

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় দেখা গিয়েছিল যে, মস্কোর সঙ্গে টেক্কা দিচ্ছে কিয়েভ সোশ্যাল মিডিয়ার লড়াইয়ে। চমৎকার মিম, ছোট ছোট রিল্‌স– এসব তৈরি করে ভ্লাদিমির পুতিনের ‘রেড আর্মি’-কে পিছনে ঠেলে দিয়েছিলেন ইহুদি জেলেনস্কি প্রথম দফায়। আর, এবার কি একই ‘মডেল’ অনুসরণ করে ইহুদি ইজরায়েলকে ‘ব্যাকফুট’-এ ফেলে দিল পারস্য মনন? এ প্রশ্ন ওঠার কারণ, যুদ্ধের প্রায় চার সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পরে, ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ থেকে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’, যারা প্রত্যেকে, ইরানের পরাজয় এবং তেহরানের পতন দেখতে উন্মুখ ছিল, স্বীকার করে নিচ্ছে এখন যুদ্ধে ‘ফ্রন্ট ফুট’-এ ইরানই!

Advertisement

কেন এরকম ঘটল? সোশ্যাল মিডিয়ার যুদ্ধে, তথ্যের আদানপ্রদানে কেন ইরান টেক্কা দিয়ে দিল ওয়াশিংটন কিংবা তেল আভিভের ধুরন্ধর সব মস্তিষ্ককে? কেন সোশ্যাল মিডিয়ায় লারিজানি হয়ে উঠলেন এমন একজন তারকা, এমন একজন স্বামী, যিনি যুদ্ধের মধ্যেও স্ত্রীর জন্য এসে রান্না করে দিয়ে যান, আর সেই অশ্রুবিদারক গল্প গোগ্রাসে গিললাম আমরা প্রত্যেকে? তাহলে সোশ্যাল মিডিয়ায় কখন, কোন তথ্যকে সামনে আনতে হবে, কীভাবে আমেরিকা এবং ইজরায়েলের যাবতীয় ন্যারেটিভকে চূর্ণ করে দিতে হবে, তা শেখার আছে বইকি! এবং সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কি তেহরান ডজন গোল মেরে দিল আমেরিকা ও ইজরায়েলকে?

কেন এরকম ঘটল? সোশ্যাল মিডিয়ার যুদ্ধে, তথ্যের আদানপ্রদানে কেন ইরান টেক্কা দিয়ে দিল ওয়াশিংটন কিংবা তেল আভিভের ধুরন্ধর সব মস্তিষ্ককে?

এখনও অবধি পরিস্থিতি দেখে তেমনই মনে হচ্ছে। যে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানকে ধ্বংস করে দিয়ে তারপর যুদ্ধ শেষ করবেন, এখন তঁাকেই ১৫ দফা দাবি পেশ করতে হচ্ছে, আর ইরান সেসব দাবি উড়িয়ে দিচ্ছে। আমেরিকা ও ইজরায়েলের সামরিক শক্তি, বিমানবাহিনীর শক্তি ও ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তি পৃথিবীর যে কোনও দেশের চেয়ে বেশি। এবং ইরান সেটা গত বছরের জুন থেকে জানত। যখন একটা ছোটখাট যুদ্ধ হয়ে গিয়েছে, যেটা কেউ বুঝতে পারেনি, বা পশ্চিমের তাত্ত্বিক, সমরাস্ত্র বিশেষজ্ঞরা আন্দাজ করে উঠতে পারেননি যে, তেহরান সেই সময় থেকে এমন পরিস্থিতির জন্য তৈরি ছিল, অর্থাৎ, যদি আচমকা বিদেশি শত্রুর হামলায় সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যু হয়, বা সেনাবাহিনীর শীর্ষকর্তারা মারা যান, তাহলেও কী করে যুদ্ধ চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। সে কারণেই খামেনেই বা লারিজানির মতো ইরানের শীর্ষ মধ্যস্থতাকারীর মৃত্যুর পরেও তেহরান বিন্দুমাত্র হতোদ্যম হয়নি, বরং পালটা লড়াই এমনভাবে দিচ্ছে যে, বিশ্বের এখন একমাত্র প্রার্থনা– কখন এই যুদ্ধ শেষ হবে? কারণ, তেহরান শুধু মনস্তাত্ত্বিকভাবে জেতেনি, একইসঙ্গে বিশ্বে তেলের দামকে বাড়িয়ে দিতে সমর্থ হয়েছে। ইরান এমনই তেলের দাম বাড়িয়েছে যে, ভারতে পঁাচ রাজ্যে নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে স্বয়ং নরেন্দ্র মোদিকে ‘জনমোহিনী’ রাস্তায় হঁাটতে হয়েছে, এক্সাইজ শুল্ককে কমাতে হয়েছে।

এ তো না হয় গেল ভারতের কথা, কিন্তু বিশ্বে ইরান এই বার্তাও পৌঁছে দিতে পেরেছে যে, আমেরিকা এবং ইজরায়েল যতক্ষণ না এই যুদ্ধ শেষ করবে, ততক্ষণ তেলের দাম কমবে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প যত আলোচনার কথা বলেছেন, ততই ইরানের শীর্ষনেতারা আলোচনার প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছেন। ট্রাম্পের জন্য আলোচনা বা যুদ্ধবিরতি জরুরি, কারণ, তা না হলে মার্কিন অর্থনীতিতে যে সংকট দেখা দিয়েছে, তা হোয়াইট হাউসের বাসিন্দাকে আগামী নভেম্বরেই মধ্যবর্তী নির্বাচন অবধি তাড়া করবে। কিন্তু ইরান, যেখানে নির্বাচন বিষয়ই নয়, ভোট মাথাব্যথার কারণই নয়, সেখানে রাষ্ট্রব্যবস্থা লড়ে গিয়েছে আমেরিকাকে ‘হতাশ’ করে দেওয়ার জন্য। এই মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে ইরান চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছে বিভিন্ন তথ্যকে। অর্থাৎ, আমেরিকার ইরানের কোনও ক্ষেপণাস্ত্রকে নষ্ট করতে কত খরচ হচ্ছে থেকে শুরু করে আমেরিকার বোমারু বিমানের আঘাতে ইরানের কতজন মহিলা মারা গিয়েছেন, তাও সুচারুভাবে তেহরান বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে।

অর্থাৎ যুদ্ধের যে মনস্তাত্ত্বিক দিক, সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমেই হেরে গিয়েছেন। মনে রাখতে হবে, বিশ্বের সমস্ত তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার শীর্ষনেতা মার্কিন মুলুকে থাকেন, বা আরও সোজা করে বললে, এঁদের প্রত্যেকের দফতর আমেরিকায়। তাই সোশ্যাল মিডিয়ার লড়াইয়ে অথবা তথ্যের দ্বন্দ্বে আমেরিকা অন্যদের টেক্কা দেবে, এমনই ভাবা স্বাভাবিক। কিন্তু ইরান ও তার সহযোগী শক্তিরা ‘উলটপুরাণ’ লিখছে। ১৯৭৯-তে কট্টরপন্থীদের ক্ষমতা দখলের পর থেকে ইরানে শিক্ষাব্যবস্থার কী আমূল সংস্কার হয়েছে কিংবা মহিলাদের জন্য কতটা শিক্ষার দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে, সেই নিয়ে এমন সব চমৎকার ভিডিও সামনে এসেছে যে, বিশ্ব মুগ্ধ! শুধু তো শোনেনি, তাদের মগজে গেঁথেও গিয়েছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প বা বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু– এমনিতেই যঁাদের সম্পর্কে মানুষের অপছন্দের তালিকা দীর্ঘ– এই দুই যুদ্ধবাজ নেতা ‘পারস্য’ নামে একটি অতীব সমৃদ্ধ সম্পদশালী দেশকে কীভাবে ধ্বংস করে দিতে চাইছে! সোশ্যাল মিডিয়ার ‘ন্যারেটিভ’-এর লড়াইয়ে সবসময় গোলিয়াথরা জিতবে– এর মানে নেই, অধিকাংশ সময় ডেভিডরাই নিজেদের জয়ের আখ্যান রচনা করেন। পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন যখন কড়া নাড়ছে, তখন গেরুয়া শিবিরও এটা মনে রাখলে ভাল করবে।

ইরানের মিসাইল হানায় ইজরায়েলের যথেষ্ট ক্ষতি হচ্ছে, পারস্য উপসাগরের অন্য দেশগুলিতেও তৈল শোধনাগার থেকে শুরু করে গ্যাস প্রস্তুতকারক কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত, এমনতর ভিডিও ছড়িয়ে পড়া আমেরিকা বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য মোটেই সুখকর বিষয় ছিল না। কারণ, সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব ভাবতে শুরু করেছে, তাহলে তো আমার তেলের ভঁাড়ারেও টান পড়বে, যদি ইরান বিপন্ন হয়। ইরান, বা খামেনেইকে যতই ‘আন্ডারএস্টিমেট’ করি বা ‘কট্টরপন্থী’ বলেই দেগে দিতে চাই, তিনি এবং তঁার তৈরি করা নেতৃত্ব এই সমস্ত ধারণাকে চমৎকারভাবে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন। এখন সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে অনেকেই জানে যে, আরাগচি অর্থাৎ ইরানের বিদেশমন্ত্রী ঠিক বই লিখেছেন ইমানুয়েল কান্টের উপর। বা, লারিজানি কেমনভাবে সহকর্মীদের সঙ্গে মিশতেন। অর্থাৎ সোশ্যাল মিডিয়ায় রিল ইত্যাদির মাধ্যমে যেভাবে জনমত তৈরি করা যায়, সেখানে আমেরিকাকে পর্যুদস্ত করেছে তেহরান। ফলে ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ থেকে ‘ব্লুমবার্গ’, যাদের নেপথ্যে ইজরায়েলের প্রচ্ছন্ন ছায়া রয়েছে– স্বীকার করে নিচ্ছেন চার সপ্তাহ যুদ্ধের পরেও মনস্তত্ত্বের লড়াইয়ে ইরান পিছিয়ে নেই, বরং এগিয়েই আছে বলতে হবে।

যুদ্ধের যে মনস্তাত্ত্বিক দিক, সেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমেই হেরে গিয়েছেন। মনে রাখতে হবে, বিশ্বের সমস্ত তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার শীর্ষনেতা মার্কিন মুলুকে থাকেন, বা আরও সোজা করে বললে, এঁদের প্রত্যেকের দফতর আমেরিকায়।

এখানেই ইরানের সবচেয়ে বড় সাফল্য। এখানেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। তিনি নিজের দেশে তো জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেনই, এমনকী বিশ্বেও তঁার মতের সমর্থনে খুব কম রাষ্ট্রনেতাকেই খুঁজে পাওয়া যায়। স্পেনের বামপন্থী প্রধানমন্ত্রীকে ছেড়ে দিন। তিনি তো ‘আদর্শগত’ দিক থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বেআবরু করেই দিয়েছেন, কিন্তু ইউরোপের কোন দেশই-বা তেমন সোচ্চারে ওয়াশিংটনের পাশে এসে দঁাড়াল? বুঝে নেওয়া ভাল, ঠিক কোথায় বোমা পড়বে, ঠিক কতজনকে আমেরিকা ও ইজরায়েলের বাহিনী খতম করবে, এবং কোন কোন বাঙ্কার তারা ধ্বংস করে দিতে চাইবে– এসব আগেভাগে ভেবে নিয়েই ইরান তার সব পরিকল্পনা সাজিয়েছিল। সেজন্যই তাদের ‘প্রোপাগান্ডা ভিডিও’ যখন দেখায়– এখনও তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের ভঁাড়ার অক্ষত, তখন পশ্চিম এশিয়ার অন্য দেশগুলি অর্থাৎ, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি থেকে বাহারিন-কাতারের শিরদঁাড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। কেননা, ইরান প্রতিবেশী দেশদের বুঝিয়ে দিয়েছে যে, যদি তার কাচের দেওয়ালে আমেরিকা এবং ইজরায়েল– এই উপসাগরীয় বন্ধুদের মদত নিয়ে ঢিল মারে– তাহলে ইরানও তাদের কাচের ঘরে বাস করা ঘুচিয়ে দেবে। কাতার, বাহারিন, ওমান বা সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে যত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়েছে, ততই মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে তেহরান এগিয়েছে।

তেহরানের এই আড়াই চালের জের থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বঁাচতে হচ্ছে, ইতিমধ্যেই তঁার মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ ঝঁাকুনি লেগে গিয়েছে। একজন পদত্যাগ করেছেন, আর টেলিভিশন অ্যাঙ্কর থেকে প্রতিরক্ষা সচিব হয়ে যাওয়া, যা হয়তো আমাদের দেশেও অনেক ‘গোদি মিডিয়া’-র অ্যাঙ্করকে অনুপ্রাণিত করতে পারে, পিটার হেগসেথ এমন ধমক খেয়েছেন ‘প্রভু’ ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে যে, প্রত্যেকে বুঝছে, স্নায়ুর যুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রমশই কাবু হয়ে পড়ছে। ডেভিড আর গোলিয়াথের যুদ্ধের কথা কি সাধে বলেছিলাম?

(মতামত নিজস্ব)
লেখক সাংবাদিক
suman09bhattacharyya@gmail.com

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement