রূপান্তরকামী বিষয়ক কেন্দ্রের সাম্প্রতিক বিল শুধু জাতীয় নয়, মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃত নিয়ম-নীতিকেও খণ্ডন করছে।
‘রূপান্তরকামী ব্যক্তি (অধিকার সুরক্ষা) সংশোধনী বিল, ২০২৬’ প্রত্যাহার করতে কেন্দ্রকে অনুরোধ করল সুপ্রিম কোর্টের নিযুক্ত কমিটিও। বিরোধীদের আপত্তি সত্ত্বেও কেন্দ্র বিলটি জোর করে সংসদে পাস করালেও দেশজুড়ে প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। বিলটিতে রূপান্তরকামীদের স্বতঃপ্রণোদিতভাবে আপন ‘লিঙ্গ পরিচয়’ ঘোষণার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এটি আইনে পরিণত হলে রূপান্তরকামীদের মেডিক্যাল সার্টিফিকেট বা জেলশাসকের সার্টিফিকেট জমা দিয়ে নিজের ‘লিঙ্গ পরিচয়’ দিতে হবে। তাতে ব্যক্তিপরিচয়ের গোপনীয়তা রক্ষার মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হবে বলে বিরোধীদের অভিযোগ। এতে সায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের নিযুক্ত কমিটিও, যার মাথায় রয়েছেন দিল্লি হাই কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি আশা মেনন।
২০১৪ সালে ‘নালসা বনাম ভারত সরকার’ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল, কেউ নিজেকে কোন লিঙ্গের মানুষ মনে করে সেটা ঘোষণা করা তার ব্যক্তিগত বিষয়। অর্থাৎ, ব্যক্তি নিজের লিঙ্গ পরিচয় নিজেই নির্ধারণ করবে। এর জন্য কোনও ডাক্তারি পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। কিন্তু সংশোধনী বিল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, একজন নাগরিকের লিঙ্গ পরিচয় কি তাহলে রাষ্ট্রের দয়া বা সম্মতির উপর নির্ভরশীল হবে? ‘নালসা’ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ ছিল, লিঙ্গ পরিচয় নিজস্ব চেতনার বিষয়। এর জন্য ডাক্তারি পরীক্ষা বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয় না। লিঙ্গ পরিচয় আইনত পরিবর্তনের জন্য বিলে অস্ত্রোপচার ও হরমোন থেরাপির প্রমাণ জমা দেওয়া ‘বাধ্যতামূলক’ করার কথা বলা হয়েছে। বিরোধীদের অভিমত, লিঙ্গ পরিবর্তনের অস্ত্রোপচার বা হরমোন থেরাপি ব্যয়সাপেক্ষ। তাছাড়া এই জটিল অস্ত্রোপচার ও হরমোন চিকিৎসার ধকল শারীরিকভাবে সকলের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে মেডিক্যাল সার্টিফিকেট চাওয়া একজন ব্যক্তির আত্মপরিচয় দেওয়ার মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ।
বিলটিতে আইনে পরিণত হলে রূপান্তরকামীদের মেডিক্যাল সার্টিফিকেট বা জেলশাসকের সার্টিফিকেট জমা দিয়ে নিজের ‘লিঙ্গ পরিচয়’ দিতে হবে। তাতে ব্যক্তিপরিচয়ের গোপনীয়তা রক্ষার মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হবে বলে বিরোধীদের অভিযোগ।
২০০৬ সালে ইন্দোনেশিয়ার যোগকার্তায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলি লিঙ্গ পরিচয়ের অধিকার নিয়ে যে-দলিল প্রস্তুত করেছিল সেখানে স্পষ্ট করে বলা, কোনও ব্যক্তিকে তার লিঙ্গ পরিচয় আইনত পরিবর্তনের জন্য কোনও চিকিৎসা পদ্ধতি বা অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে কোনওভাবে জোর করা যাবে না।
কিন্তু বর্তমান বিলে আইনত লিঙ্গ পরিচয় পরিবর্তনের জন্য অস্ত্রোপচার ও হরমোন থেরাপির প্রমাণপত্র দাখিল করার কথা, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলির গৃহীত সিদ্ধান্তের পরিপন্থী। ফলে একদিকে বিলটি যেমন ব্যক্তির গোপনীয়তা রক্ষার অধিকারে হস্তক্ষেপ করে সংবিধানপ্রদত্ত নাগরিকের মৌলিক অধিকার উল্লঙ্ঘন করছে, অন্যদিকে মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃত নিয়ম-নীতিকেও খণ্ডন করছে। উপরন্তু মানুষের মর্যাদা ও আত্মপরিচয় দেওয়ার অধিকারকে আমলাতান্ত্রিকতার ফাঁসে আটকে ফেলা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধেরও বিরোধী। কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত ছিল– এই ধরনের একটি বিল করার আগে আইনজ্ঞ ও রূপান্তরকামী সম্প্রদায়ের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করা ও সহমতে আসা।
