shono
Advertisement
War

যুদ্ধ থেকে জীবনযুদ্ধ, সর্বত্র ভয়ংকর আনুষঙ্গিক ক্ষয়

সর্বকালের, সব যুদ্ধের, সবথেকে বড় অমোঘ আনুষঙ্গিক ক্ষতি এটাই– যুদ্ধের শেষে কে ঠিক, কে ভুল– এই প্রশ্নের মীমাংসা নেই। কে থাকল, কতটুকু ও কীভাবে বেঁচে রইল, যুদ্ধ শেষ হয়েও কেন শেষ হল না তার কষ্ট-দুঃখ, প্রসারিত বিপর্যয়– যুদ্ধ থেকে জীবনযুদ্ধ, সর্বত্র ভয়ংকর হয়ে ওঠে পরিব্যাপ্ত আনুষঙ্গিক ক্ষয়, সমান্তরাল ক্ষতি। এটাই যুগে যুগে সমস্ত উত্তর-সমর সমাজ-সংসার-বাস্তবের ছবি ও প্রশ্ন!
Published By: Kishore GhoshPosted: 04:02 PM Mar 26, 2026Updated: 04:08 PM Mar 26, 2026

যুদ্ধ লেগেছে অনেক দূরের দেশে। সরাসরি বোমা-মিসাইলের আঘাত। গভীর রাত্রে সাইরেনের আতঙ্ক। আকাশ থেকে বিকট শব্দে নেমে আসা অব্যর্থ ধ্বংস, রক্তপাত, মৃত্যু। সকাল হলেই বিস্তারিত নাশ ও লুপ্তির দৃশ্য। চারিদিকে ছিন্নভিন্ন দেহ, কান্না ও আর্তনাদ। যুদ্ধের এই প্রত্যক্ষ নরক আমাদের দেখতে হচ্ছে না। কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে, দূর-যুদ্ধের ছায়া ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে আমাদের জীবনে। যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে, আনুষঙ্গিক ক্ষতি শুধু আর রান্নার গ্যাসের অভাব ও বিচিত্র কল্পিত আশঙ্কা, অনিশ্চয়তা, অস্থিরতার মধ্যে সীমিত থাকবে না। দূরের যুদ্ধের নানা দূষণ ডালপালা ছড়াবে আমাদের প্রাত্যহিক যাপনে, তৈরি করবে নতুন নতুন অসুখ, সমস্যা, জটিলতা, সংকট।

Advertisement

এই প্রসঙ্গে দু’টি ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধ দেখা বার্ট্রান্ড রাসেলের রুক্ষ সত্যকথাটি না স্মরণ করিয়ে দিয়ে পারছি না: ‘ইন ওয়ার্স দেয়ার আর নো উইনার্স, ওনলি ভিক্টিমস!’ সর্বকালের, সব যুদ্ধের, সবথেকে বড় অমোঘ আনুষঙ্গিক ক্ষতি এটাই। যুদ্ধের শেষে কে ঠিক, কে ভুল– এই প্রশ্নের যেন মীমাংসা নেই। কে থাকল, কতটুকু ও কীভাবে বেঁচে রইল? যুদ্ধ শেষ হয়েও কেন শেষ হল না তার কষ্ট-দুঃখ, প্রসারিত বিপর্যয়? যুদ্ধের বিচিত্র দূষণ, ক্রমিক অসহায়তা, কীভাবে স্তরে স্তরে বিছিয়ে থাকে তার ‘কোল্যাটারাল ড্যামেজ’? এটাই তো যুগে যুগে সমস্ত উত্তর-সমর সমাজ-সংসার-বাস্তবের ছবি ও প্রশ্ন!

মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পরে কারও সংসারে, কোনও সম্পর্কে ছিল কি এতটুকু আনন্দ? এককণা সুখ? ভার্জিলের ‘ইনিড’ মহাকাব্যে কার্থেজের মহাযুদ্ধের পরে মহারানি ডিডোর সেই অপূর্ব নগরীর ধ্বংসস্তূপ ছাড়া আর কিছু ছিল কি? রানি ডিডো হয়তো জয়ী হয়েছিল। কিন্তু সেই জয়ের মূল্য যে বিস্তারিত ক্ষয় ও ক্ষতি, মহাকাব্যে মানুষের সেই বিপর্যয়ই তো বড় হয়ে উঠছে। ভার্জিলের এই অসমাপ্ত মহাকাব্য, যা তিনি পুড়িয়ে লুপ্ত করতে বলেছিলেন, তার শেষ তো মানুষের কান্না ও প্রত্যয়হীনতায়। কোনও যুদ্ধের দগদগে ঘা, যুদ্ধশেষেও সেরে যায় কি? তাই যদি যেত, ভার্জিল লিখতেন না, কোনও দিন বিশ্বাস কোরো না গ্রিকদের। তাদের উপহারেও লুকিয়ে থাকে কালসাপ।

এই প্রসঙ্গে দু’টি ভয়াবহ বিশ্বযুদ্ধ দেখা বার্ট্রান্ড রাসেলের রুক্ষ সত্যকথাটি না স্মরণ করিয়ে দিয়ে পারছি না: ‘ইন ওয়ার্স দেয়ার আর নো উইনার্স, ওনলি ভিক্টিমস!’ সর্বকালের, সব যুদ্ধের, সবথেকে বড় অমোঘ আনুষঙ্গিক ক্ষতি এটাই।

যুদ্ধশেষের ছবি এঁকেছেন এরিক মারিয়া রেমার্ক তাঁর ক্লাসিক উপন্যাস ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’-এ। রাশিয়ান রেভোলিউশন এবং যুদ্ধের মধ্যে এক কবির ছিন্ন হয়ে যাওয়া প্রেমজীবন ফুটিয়ে তুলেছেন পাস্তেরনাক। খালেদ হোসেনির অসামান্য লেখার বিষয় আমাদের নিয়ে যায় আফগান যুদ্ধের নিরন্তর বেদনা এবং সাধারণ মানুষের সব হারানোর যন্ত্রণার কোরকে। যুদ্ধের উপরে এই তিনটি বইয়ে কোথাও নেই কিন্তু যুদ্ধের গৌরব। বীরত্বের স্তুতি। জয়ের আনন্দ। আছে মানসিক যন্ত্রণা। আতঙ্কের ট্রমা। আছে হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাদের অনিশ্চিত বেঁচে থাকা। আছে ভাঙা সংসার ও সম্পর্কের কান্না। আছে সন্ধান ও ব্যর্থতা। আছে একাকিত্ব আর দারিদ্র। আছে নারী ও শিশুর প্রতি অশেষ অনাচার। আর আছে অসংখ্য মানুষের অনিকেত স্রোতে ভেসে যাওয়া। যুদ্ধ মানেই হাজার ছোবলে জেগে ওঠা আনুষঙ্গিক ফণা!

যুদ্ধ থেকে জীবনযুদ্ধ: সর্বত্র ভয়ংকর হয়ে ওঠে পরিব্যাপ্ত আনুষঙ্গিক ক্ষয়, সমান্তরাল ক্ষতি। যত্নের উপবাসে থাকা যেসব ভাঙা সংসারে, বাপ-মায়ের ক্লান্তিহীন কলহ আর যুদ্ধের মধ্যে বাচ্চারা বড় হয়ে ওঠে, তারা অবশ্যই বঞ্চিত হয় তাদের শৈশবের ন্যায্য প্রাপ্তি থেকে। এবং তাদের মনে চিরদিনের জন্য দাগ কেটে যায় সাংসারিক কুরুক্ষেত্রে শৈশব কাটানোর যন্ত্রণা। বাপ-মায়ের সম্পর্কের দূষণ তাদের অবচেতন মনে রেখে যায় সূক্ষ্ম বুননের অবিশ্বাস ও অসুখ। আর যদি মা-বাবার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়, সেই ‘ইমোশনাল ইমপ্যাক্ট’ তাদের জীবনে নিয়ে আসে যে গভীর সমান্তরাল সংকট, তার জবাবদিহির ক্ষমতা কোনও বাবা-মায়ের থাকে বলে আমার মনে হয় না। অন্তত আমার তো ছিল না আমার ছেলে যখন সরাসরি আমাকে প্রশ্ন করেছিল– ‘তুমি কি কোনও দিন বুঝতে পেরেছ আমার কষ্ট?’ আমি নীরবে শুধু ভাবতে চেষ্টা করেছি, যদি বিয়েটা চালিয়ে যেতে পারতাম, যেমন চলছে চারপাশের বহু সংসারে, কলহ, মিথ্যেকথা, পারস্পরিক তঞ্চকতার মধ্যে, তাহলে কি এর চেয়ে ভাল কিছু হত?

আছে নারী ও শিশুর প্রতি অশেষ অনাচার। আর আছে অসংখ্য মানুষের অনিকেত স্রোতে ভেসে যাওয়া। যুদ্ধ মানেই হাজার ছোবলে জেগে ওঠা আনুষঙ্গিক ফণা!

বিয়ে আমার ভাঙতই। কোনও নারীর জন্য না হলেও, আমার জীবনদর্শন আমাকে উপড়ে ফেলত সংসার থেকে। আমাকে ক্রমশ পেয়ে বসল লেখা এবং পড়া। তেমন কোনও লেখক হতে পারিনি। এবং স্কলার হতেও পারিনি। কিন্তু বাউন্ডুলে সোশ‌্যাল আইসোলেশনকে, সামাজিক নির্বাসন ও নিঃসঙ্গতাকে ভালবেসে ফেলেছি। ভালবেসেছি ভাষা ও নারীকে। ভালবেসেছি বিষণ্ণ বিপন্ন একলা সন্ধ্যার সুরা ও ভাবনার মগ্নতাকে। এই ভালবাসা এবং দুর্বলতাকে কোনও সংসার কি তেমনভাবে স্থান দেয়? তেমন লেখক হয়তো হতে পারিনি, কিন্তু আমার লেখকজীবন আর কাজের জীবন আমার সমস্ত ভালবাসা শুষে নিয়েছে। ক্রমশ ধূসর হয়ে গিয়েছে সাংসারিক জীবনের চাওয়াপাওয়া। বুঝতে পেরেছি, ‘ভাল’ বাবা আমি কোনও দিনই হতে পারতাম না। কিন্তু ‘ভাল’ বন্ধু? কোথাও আমার মনের মধ্যে এই প্রশ্নের উত্তরে একটা আবছা ‘হ্যাঁ’ জেগে আছে।

কিন্তু সমস্যাটি হল, সব সম্পর্কের মধ্যেই একটি যুদ্ধ, একটি গরমিল থেকেই থাকে। আর সেখান থেকেই তৈরি হয় দূষণ, ক্রমশ ফণা তুলতে থাকে বিষাক্ত ছোবল। সম্পর্ক দানা বাঁধলে তাতে কোনও না কোনও দিন চিড় ধরবেই। বিশেষ করে নিজের সঙ্গে এত বছর কাটিয়ে তারই কোল্যাটারাল ড্যামেজটাকে আমি এত দিনে চিনতে পেরেছি। সেই ক্ষতিটি হল– আমার সামাজিক নিঃসঙ্গতা, সোশ্যাল আইসোলেশন। এটাই আমার লেখালিখি আর বইপড়ার লং-টার্ম মেন্টাল এফেক্ট্‌স। এবং আমার জীবনযুদ্ধের সিভিলিয়ান ক্যাজুয়ালটি আমার সংসার। আমি সাইকোলজিক্যাল ট্রমায় ভুগি। এটাই আমার কাজের জীবন ও লেখকজীবনের ক্লান্তিহীন অনিশ্চয়তার আনুষঙ্গিক ক্ষতি। মেনে না নিয়ে উপায় নেই। সান্ধ্য নিঃসঙ্গতায় নিজের মুখোমুখি হই রোজ। মেনে নিই, আমার অপারগতা নতজানু শোচনায়।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement