চিনে কুকুর চুরি ফৌজদারি অপরাধ। কুকুরের মাংস বিক্রি নিষিদ্ধ। এরপরেও সাতটি কুকুর চুরি যায়। কিন্তু তারা ফিরে এসেছে আপন আস্তানায়। সে গ্রামেই সাক্ষাৎ স্বর্গের বিরাজ!
যক্ষ থেকে নেউল। মহাভারতের আখ্যানে এমন অনেক না-মানুষী প্রাণী খ্যাতি অর্জন করেছে। তবে মহাপ্রস্থানের পথে একটি কুকুর যে-চমৎকারিত্ব দেখিয়েছিল, তার তুলনা বুঝি নেই। সে কুকুর স্বর্গারোহণের প্রতিটি পদে পাণ্ডবজ্যেষ্ঠ যুধিষ্ঠিরকে সঙ্গ দিয়েছিল।
একে একে মহাবীর ভাইদের পতন হয়েছে। যুধিষ্ঠির অবিচল পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়েছে। নীরস ও নির্মম কণ্ঠে বলেছে, কার পতন কেন ঘটল। কোনও পাণ্ডব নিজেকে সবচেয়ে সুন্দর মনে করত। কোনও পাণ্ডব নিজেকে সর্বজ্ঞানী ভাবত। কোনও পাণ্ডব যুদ্ধের নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সংখ্যক শত্রুধ্বংসের প্রতিজ্ঞা করেও তা রক্ষা করতে পারেনি। কোনও পাণ্ডব সবচেয়ে খেতে ভালোবাসত, স্বার্থপরের মতো। এমনকী, চলতে চলতে এক সময় পতন হল দ্রৌপদীর। সুন্দরী, ব্যক্তিত্বময়ী, তেজস্বী এই নারীর আবার কী অপরাধ? যুধিষ্ঠির নিঃশঙ্ক কণ্ঠে বলেছে, তুমি পঞ্চস্বামীর মধ্যে অর্জুনের প্রতি সবচেয়ে নিবেদিতপ্রাণ ছিলে, সেজন্য তুমি সত্যভ্রষ্ট, নিরপেক্ষ নও। আর এই পতনগ্রাফ যখন ঊর্ধ্বমুখী, কুকুরটি কিন্তু অবিচল। তারপর এক সময় স্বর্গের সিংহদরজায় পৌঁছে গেল যুধিষ্ঠির। তাকে সোৎসাহে বরণ করে নিতে স্বয়ং দেবরাজ এসে হাজির। কিন্তু যুধিষ্ঠির বলে বসল– যেতে পারি স্বর্গে, শর্ত এই যে, কুকুরটিও সঙ্গে যাবে আমার। শত বিপদেও সে আমাকে ছেড়ে যায়নি। অতএব আমিও তাকে ছাড়তে পারব না। এ যেন প্রভুভক্তির বিপরীতে পোষ্যস্নেহের অনন্ত ক্ষরণ।
দেবরাজ ইন্দ্র তখন জানান, এ কুকুর ‘সাধারণ’ নয়, স্বয়ং ধর্ম। মহাপ্রস্থানের পথে তিনি যুধিষ্ঠিরকে নিরাপত্তা দিয়েছেন, আবার পরীক্ষার আবর্তেও ফেলেছেন। এ না হয় অলৌকিকের প্রলেপ-মাখা গল্প। কুকুর-রূপ আসলে ঐশী মাহাত্ম্যের ছদ্মবেশ। কিন্তু একটি চরম খুনখারাপির গল্পে, উধোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপার টালমাটাল চিত্রনাট্যে একটি অতি ‘সাধারণ’ কুকুর কী করে পরিত্রাতা হয়ে ওঠে, তা দেখিয়েছিলেন ‘পাতাললোক’ ওটিটি সিরিজের ‘সিজন ওয়ান’ পর্বে পরিচালক সুদীপ শর্মা। এক বিখ্যাত সাংবাদিকের উপর প্রাণঘাতী হামলা হলে তিনি তার জন্য দায়ী করেন সরকারের গোপন আক্রোশকে। তঁার মতে, সরকার নাকি চায় সাংবাদিকের মুখ বন্ধ করে দিতে।
এটিই হয়ে ওঠে তাঁর খ্যাতিপ্রাপ্তির ‘ন্যারেটিভ’, প্রচারের অভিমুখ। কিন্তু কেন সাংবাদিককে ‘টার্গেট’ করা হয়েছিল, কেন-ই বা তিনি বেঁচে গেলেন, তার সঙ্গে মূল রাজনৈতিক নাশকতা বা বৃহত্তর নীল নকশার কোনও যোগই নেই। একজনকে মরতে হবে, তাহলে অন্য ধরনের কার্যসিদ্ধি হয়, সেজন্য বাছা হয়েছিল এই সাংবাদিককে। এ নেহাত কাকতাল। আর, ভদ্রলোক বেঁচে যান কুকুরের প্রতি মানুষের ভাব-ভালবাসায় বিশ্বাস রাখা ভাড়াটে খুনির অন্ধ সংস্কারের জন্য। সম্প্রতি, চিনের একটি গ্রাম থেকে সাতটি কুকুর ‘চুরি’ হয়েছিল। মেরে, তাদের মাংস বিক্রি করা হত। কিন্তু চোরের খপ্পর কেটে শুধু তারা বেঁচে যায়নি, খুঁজে খুঁজে ফিরে এসেছে আপন গ্রামের আপন আস্তানায়। সে গ্রামেই তো সাক্ষাৎ স্বর্গের বিরাজ!
