মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়নের হাক্কানিপুরা এলাকার সুবিশাল বৌদ্ধ স্তূপ। নয় দশক আগে একবার খনন কার্য হয়েছিল এখানে। মৌর্য সম্রাট অশোকের যুগের ভারতেতিহাসের গৌরবময় অতীতকে উদ্ধার করতে তৎপর মধ্যপ্রদেশ সরকার। কীভাবে গড়ে উঠল ‘বৈশ্য টেকরি’? এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে? লিখছেন, দেবাশিস পাঠক।
৯০ বছর পর ফের খোঁড়া হবে মাটি। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য চালানো হবে। যে-জায়গায় এই খোঁড়াখুঁড়ি, তার নাম: ‘বৈশ্য টেকরি’ (বাংলায় এর অর্থ: ‘বৈশ্যের ঢিবি’)। মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়নের হাক্কানিপুরা এলাকার একটি সুবিশাল বৌদ্ধ স্তূপ এটি। মধ্যপ্রদেশ সরকার বৌদ্ধ সংস্কৃতির নিদর্শনগুলি পুনরুদ্ধারের জন্য বিশেষভাবে তৎপর। তারা ফিরে দেখতে চাইছে– মৌর্য সম্রাট অশোকের যুগের ভারতের ইতিহাসের গৌরবময় অতীত। সেজন্যই বৈশ্য টেকরিতে নতুন উদ্যমে শুরু খননকার্য, মাটির নিচ থেকে ইতিহাসকে তুলে আনার আশায়।
আগেও এখানে এরকম প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্য চলেছে। প্রায় নয় দশক আগে। ১৯৩৮-’৩৯ সালে। সে-সময় ‘মধ্যপ্রদেশ’ নামক রাজ্যের অস্তিত্ব ছিল না। ছিল, গোয়ালিয়র প্রদেশ। সেই গোয়ালিয়র প্রদেশের পুরাতাত্ত্বিক বিভাগ প্রথম খুঁড়েছিল এখানকার মাটি। আবিষ্কৃত হয়েছিল বড় বড় ইট আর প্রতীকলাঞ্ছিত ধাতব মুদ্রা। ইট আর ছাপাঙ্কিত মুদ্রার সূত্রে পুরাতত্ত্ববিদরা জানান, এসবই মৌর্য যুগের। বৈশ্য টেকরি নিয়ে আগ্রহের সেই শুরু।
কানাডীয় ইতিহাসবিদ পিটার স্কিলিংয়ের (জন্ম ১৯৪৯) নজর পড়েছিল এই স্তূপের উপর। তিনি ব্যাংককের চুলালংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্পেশাল লেকচারার। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ সংক্রান্ত অধ্যয়নের সাম্মানিক সহযোগী। অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তাইল্যান্ডের বাসিন্দা। সেখানকার নাগরিক রূপে তঁার নাম ‘ভদ্র রুজিরাথাত’। প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস, আর দক্ষিণ এশিয়ার বৌদ্ধ সাহিত্য নিয়ে নিরন্তর চর্চা করে চলা এই পণ্ডিত মানুষটি ২০১১ সালে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। শিরোনাম ছিল: ‘অশোক এবং বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনীগণ: উজ্জয়ন ও মালব্যতে বৌদ্ধ ধর্মের আদি যুগ’। সেই গবেষণাপত্রেই তিনি লেখেন বৈশ্য টেকরির বিবরণ। উল্লেখ করেন, সেটিকে ওই এলাকার বৃহত্তম বৌদ্ধ স্তূপ হিসাবে।
বৈশ্য টেকরিতে খননকার্য শুরু হলে কেবল একটি বৌদ্ধ মঠের ইতিহাস মাটির তলা থেকে বেরিয়ে আসবে, তা নাও হতে পারে। এই প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানে অর্থ লগ্নি মানে– কীভাবে ওই অঞ্চলে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, সে-কথা জানার জন্য অর্থসম্পদ বিনিয়োগ করা। এ হল ইতিহাসের পুঁজিনির্মাণ।
ভূমি থেকে উচ্চতা প্রায় ১০০ ফুট। প্রস্থ ৩৫০ ফুট। চুম্বকে, স্তূপটিকে একটি ত্রিভুজ রূপে কল্পনা করলে, ভূমি থেকে তার শীর্ষবিন্দুর উচ্চতা প্রায় ৩৫০ ফুট, আর ভূমির দৈর্ঘ্য ১০০ ফুট। কাছেই অবস্থিত একটি ক্ষুদ্রাকৃতি বৌদ্ধস্তূপ। নাম ‘কুম্ভর টেকরি’। বাংলায় এর অর্থ হতে পারে ‘কুমোরদের ঢিবি’। দু’টি স্তূপই মোটামুটি অক্ষত অবস্থায় আছে– জানান পিটার। তবে বিদ্যুৎ সংবহনের জন্য মোটা তার যে কুম্ভর টেকরিকে পেঁচিয়ে ধরেছে, জানাতে ভোলেননি।
এই বৈশ্য টেকরি, কুম্ভর টেকরি নিয়ে মুখ খুলেছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ হিমাংশুপ্রভ রায়। একটি সাক্ষাৎকারে তাঁর কণ্ঠে ফুটে উঠেছিল উদ্বেগ, শুনিয়েছিলেন সতর্কবার্তা। তাঁর মনে হয়েছিল, এখনই ওই অঞ্চলে খননকার্য চালানো বেশি তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে। যুক্তি: ১৯৩৮-’৩৯ সালের খননকার্যের যে-রিপোর্ট আমরা পেয়েছি, সেটা প্রায় শতাব্দীপ্রাচীন। সুতরাং, বর্তমানে তার গ্রহণযোগ্যতা সংশয়াতীত নয়। তাছাড়া, এসব বৌদ্ধ স্তূপের বিষয়ে আমাদের তাবৎ ধ্যানধারণার ভিত্তি একটাই। আলেকজান্ডার কানিংহামের লেখালিখি– অশোকের বিষয়ে। এর বেশি আমরা খুব একটা কিছু জানি না। বৈশ্য টেকরি আকারে সুবিশাল– সাঁচির বিখ্যাত স্তূপের সঙ্গে তুলনীয় হওয়ার যোগ্য। কিন্তু সেটির বিষয়ে কোনও সুনির্দিষ্ট ধারণা গড়ে তোলার আগে ওই ১৯৩৮-’৩৯ সালের খননকার্য সংক্রান্ত রিপোর্টের বাইরেও কিছু জানা দরকার।
এখনকার উজ্জয়ন অশোকের যুগের উজ্জয়িনী নগর। চম্বলের উপনদী শিপ্রা। শিপ্রা নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল এই প্রাচীন নগর। এর বিষয়ে ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার ‘অশোকা অ্যান্ড দ্য ডিক্লাইন অফ দ্য মৌওরয়াস’ (১৯৬১) বইয়ে লিখেছেন, পশ্চিমের সমুদ্র উপকূলে গড়ে ওঠা ব্রোচ (অধুনা গুজরাতের ভারুচ) ও সোপারের (এখন মহারাষ্ট্রের নালা সোপারা) মতো বাণিজ্যকেন্দ্রের সঙ্গে উজ্জয়িনীর যেমন যোগাযোগ ছিল– তেমনই পাটলিপুত্রের সঙ্গেও সংযোগ ছিল। এই নগরীকে বেষ্টন করে সুরক্ষা প্রাচীর গড়ে তোলা হয় খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ অব্দে। তখন অবন্তীর মতো শক্তিশালী রাজ্যের রাজধানী ছিল উজ্জয়িনী। অশোকের বাবা সম্রাট বিন্দুসার নিজের প্রতিনিধি হিসাবে অশোককে প্রথম উজ্জয়িনীতে পাঠান। এমনকী, তক্ষশীলাতেও প্রেরিত হয়েছিলেন অশোক। তবে খুব কম সময়ের জন্য। অবন্তীর ক্ষেত্রে তেমনটা হয়নি।
তখন অবন্তীর মতো শক্তিশালী রাজ্যের রাজধানী ছিল উজ্জয়িনী। অশোকের বাবা সম্রাট বিন্দুসার নিজের প্রতিনিধি হিসাবে অশোককে প্রথম উজ্জয়িনীতে পাঠান। এমনকী, তক্ষশীলাতেও প্রেরিত হয়েছিলেন অশোক।
অনুমিত, এখানে থেকেছিলেন অশোক কমপক্ষে এক দশক। ইতিহাসবিদ নয়নজ্যোত লাহিড়ী লিখছেন, অশোক সেখানে আসার আগেই নদীর তীরে ৩০০ বছর ধরে গড়ে উঠেছিল একটি নগর সভ্যতা। সেই সভ্যতার প্রাণকেন্দ্রটিকেই মগধের যুবরাজ তাঁর প্রধান কর্মস্থল হিসাবে গড়ে তোলেন। রোমিলা থাপারের মনে হয়েছে, বিশেষ উদ্দেশ্যপূরণের লক্ষ্যে অশোককে তক্ষশীলায় পাঠান বিন্দুসার। আর, কাজ সম্পন্ন হলে অশোককে সফল কৃতকর্মের পুরস্কারস্বরূপ উজ্জয়িনীতে পাঠানো হয়, সেখানকার শাসনকার্য দেখাশোনার জন্য। উজ্জয়িনী যাওয়ার পথে অশোক বিশ্রাম নেন বিদিশায়।
সেখানেই যুবরাজ অশোকের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ স্থানীয় বণিককন্যা বিদিশাদেবীর। পরে, অশোকের ঔরসে এই বিদিশাদেবীর গর্ভে জন্ম নেন পুত্র মহেন্দ্র বা মহিন্দা, ও কন্যা সংঘমিত্রা। মৌর্য সাম্রাজ্যের কুমার অশোক যে রাজকার্য সামলাতে উজ্জয়িনীতে গিয়েছিলেন, সে-কথা পরবর্তীকালের শিলালিপি ইত্যাদিতে উল্লিখিত হয়েছে। অর্থাৎ, এটি কষ্টকল্পনা নয়, ইতিহাসসিদ্ধ ঘটনা। অশোকের সঙ্গে বিদিশায় যে বিদিশাদেবীর দেখা হয়েছিল প্রথম, তার সমর্থনে ঐতিহাসিক নয়নজ্যোত লাহিড়ী ভূগোলের যুক্তি দিয়েছেন। পাটলিপুত্র থেকে উজ্জয়িনীতে যাওয়ার পথেই পড়ে বিদিশা।
বৈশ্য টেকরি-র কাছেই অবস্থিত ‘কুম্ভর টেকরি’। সুতরাং, বৈশ্য টেকরিতে খননকার্য শুরু হলে কেবল একটি বৌদ্ধ মঠের ইতিহাস মাটির তলা থেকে বেরিয়ে আসবে, তা নাও হতে পারে।
এখন প্রশ্ন: বৈশ্য টেকরিতে খননকার্য চালিয়ে কী উঠে আসতে পারে? কেন ইতিহাসবিদরা এই খননকার্যের উদ্যোগকে স্বাগত জানাচ্ছেন? হিমাংশুপ্রভ রায় এ প্রসঙ্গে সাঁচি স্তূপের ধ্বংসাবশেষে বৌদ্ধ শ্রমণদের দেহাবশেষ উদ্ধারের কথা উল্লেখ করেছেন। ওই বৌদ্ধ ধর্মগুরুগণ সাঁচি বৌদ্ধ স্তূপে হয় শিক্ষকতা করতেন, নয় ধ্বংস হওয়ার সময়ে ওই স্তূপের আবাসিক ছিলেন। এসব স্তূপের কোনওটিকেই বিচ্ছিন্ন করে দেখলে চলবে না, অভিমত তাঁর।
একটি স্তূপের ইতিহাস জানা মানে স্রেফ প্রাচীন স্থাপত্যের বিষয়ে অবগত হওয়া নয়। বড় স্তূপের কাছাকাছি ছোট স্তূপ থাকবেই। যেমন, বৈশ্য টেকরি-র কাছেই অবস্থিত ‘কুম্ভর টেকরি’। সুতরাং, বৈশ্য টেকরিতে খননকার্য শুরু হলে কেবল একটি বৌদ্ধ মঠের ইতিহাস মাটির তলা থেকে বেরিয়ে আসবে, তা নাও হতে পারে। এই প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযানে অর্থ লগ্নি মানে– কীভাবে ওই অঞ্চলে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, সে-কথা জানার জন্য অর্থসম্পদ বিনিয়োগ করা। এ হল ইতিহাসের পুঁজিনির্মাণ।
কীভাবে গড়ে উঠল বৈশ্য টেকরি? কারা পড়াতেন বৌদ্ধ শাস্ত্র সেখানে? কোন শ্রমণরা ছিলেন ওই মঠের আবাসিক? মৌর্য সভ্যতার ডানাবিস্তারে কোন অবদান এখনও মাটির নীচে লুকিয়ে রেখেছে শিপ্রা নদীর তটভূমি? তা গোচরীভূত হবে। এই আশায় আমরা অপেক্ষমাণ ৯০ বছর ধরে।
