পরম বৈষ্ণব রাধামোহন বসুর সন্তান বলরাম ছিলেন শ্রীজগন্নাথদেব অনুরক্ত। পরে, শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে পুরী যাওয়া কমিয়ে দেন। তঁার ‘বলরাম ভবন’-এ প্রতি বছর রথ টানা হত। টানতেন শ্রীরামকৃষ্ণ। কখনও পুরী যাননি তিনি। ভক্তবিশ্বাস: তাই মহাপ্রভু স্বয়ং ঠঁাই নিয়েছিলেন ‘বলরাম ভবন’-এ। লিখছেন মানস ভট্টাচার্য।
‘দারুব্রহ্ম’ জগন্নাথদেব শ্রীরামকৃষ্ণের পরমেশ্বর। জগন্নাথদেবকে তিনি ‘সাকার’ ও ‘নিরাকার’– উভয় ভাবের অপূর্ব সম্মিলন রূপে পুজো করতেন। তঁার ‘যত মত তত পথ’ জগন্নাথ সংস্কৃতির সঙ্গে বিশ্বজনীন সম্পর্কে বাঁধা। পরম বৈষ্ণব রাধামোহন বসুর সন্তান বলরাম স্বাস্থ্যরক্ষার জন্য অনেক বছর পুরীতে ছিলেন। সে সময়ে তঁার জগন্নাথদেবের প্রতি ভক্তিপ্রীতি তৈরি হয়। নিজের বড় মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে কলকাতায় আসেন, কিন্তু পুরীর জগন্নাথদেবকে ছেড়ে বেশি দিন থাকা তঁার পক্ষে সম্ভব ছিল না! তবে কলকাতায় শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গলাভের পর পুরীর প্রতি আকর্ষণ কিছুটা কমে, এবং এখানে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন। ক্রমে হয়ে ওঠেন শ্রীরামকৃষ্ণের অন্তরঙ্গ ভক্ত। শ্রীরামকৃষ্ণের কথায়, তঁার গৃহীভক্ত ‘বলরামের শুদ্ধ অন্ন’। এই বলরাম ভবনেই নিত্যপূজিত জগন্নাথদেবের রথযাত্রায় পরপর দু’-বছর উপস্থিত ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। কলকাতার বাগবাজারের বলরাম বসুর বাসভবনকে শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন ‘কেল্লা’! এই কেল্লা ‘রামকৃষ্ণ ভাবান্দোলন’ ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। রথযাত্রার দিন শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর থেকে বলরাম বসুর বাড়িতে আসেন, তঁার উপস্থিতিতে রথযাত্রা পালিত হয়েছিল।
আমার গৌর নাচে।
নাচে সংকীর্তনে, শ্রীবাস অঙ্গনে, ভক্তগণসঙ্গে॥
হরিবোল বলে বদনে গোরা, চায় গদাধর পানে,
গোরার অরুণ নয়নে, বহিছে সঘনে, প্রেমধারা
হেম অঙ্গে॥
‘বলরাম ভবন’-এ চারিদিকে কীর্তন গান চলছে। শ্রীরামকৃষ্ণ গান শুনে আনন্দে আত্মহারা, বাহ্যজ্ঞানশূন্য। কাঠের ছোট রথটিকে ফুল দিয়ে সাজিয়ে দোতলার বারান্দায় আনা হয়েছে। জগন্নাথ, সুভদ্রা ও বলরামকেও নতুন কাপড় এবং ফুলের মালায় সাজিয়ে তোলা হয়েছে। এই রথে ভক্তি আছে, আনন্দ আছে। নেই আড়ম্বর। বাইরের লোকেরা জানতে অবধি পারেন না, এই বাড়িতে রথ টানা হচ্ছে। আর, সে-রথ টানছেন স্বয়ং রামকৃষ্ণ। রথের দড়িতে টান দিয়ে তিনি গান ধরলেন, ‘নদে টলমল টলমল করে গৌরপ্রেমের হিল্লোলে রে’! শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু যেমন পুরীর রথযাত্রায় জগন্নাথের সামনে ভাবোন্মত্ত হয়ে নাচতেন, রথ টানার সময় শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যেও অনুরূপ দিব্যভাবের প্রকাশ ঘটত। তঁার সঙ্গে ভক্তরাও গান করছেন, নাচছেন। নাচে, গানে মানুষে মানুষে বলরাম ভবনের দোতলার বারান্দাটি আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে উঠত।
শ্রীরামকৃষ্ণের কথায়, তঁার গৃহীভক্ত ‘বলরামের শুদ্ধ অন্ন’। এই বলরাম ভবনেই নিত্যপূজিত জগন্নাথদেবের রথযাত্রায় পরপর দু’-বছর উপস্থিত ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ।
রথযাত্রায় বলরামের বাড়ি যেন শ্রীক্ষেত্র পুরী, প্রত্যেকের অন্তর তখন বৃন্দাবন। ‘শ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃত’ অনুযায়ী, ১৮৮৪ সালের ৩ জুলাই উল্টোরথে এবং ১৮৮৫ সালের ১৪ জুলাই রথযাত্রার দিন বলরাম ভবনে শ্রীরামকৃষ্ণ রথ টেনেছিলেন। ভক্তিরাগ, সংকীর্তনে মুখরিত ‘বলরাম ভবন’-এর আনন্দের পরিবেশ দেখে ‘কথামৃত’কার মহেন্দ্রনাথ গুপ্তর মনে হয়েছিল: ‘যেন শ্রীবাস মন্দিরে শ্রীগৌরাঙ্গ ভক্তসঙ্গে হরিপ্রেমে মাতোয়ারা হইয়া নৃত্য করিতেছে।’
জগন্নাথের মহাপ্রসাদ খেয়ে শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলতেন, ‘এতে দেহ-মন শুদ্ধ হয়’। পরিচিত কেউ পুরী থেকে শ্রীজগন্নাথদেবকে দর্শন করে এসেছেন শুনলেই ভাবে আত্মহারা হয়ে তঁাকে জড়িয়ে ধরতেন, অথচ নিজে জীবদ্দশায় কখনও শ্রীক্ষেত্র পুরীতে যাননি। ভক্তরা তাই বলতেন: যেতে পারেননি বলেই তো প্রভু জগন্নাথদেব স্বয়ং বাগবাজারে বলরাম বসুর বাড়িতে ভক্তের কাছে হাজির হন! শ্রীরামকৃষ্ণ এ বাড়িতে শতাধিকবার এসেছিলেন।
প্রভু জগন্নাথদেবের টানেই।
২
মিথ আর ইতিহাসের মেলবন্ধনে রথযাত্রায় সনাতন ধর্মের সঙ্গে বৌদ্ধ, জৈন, শৈব, বৈষ্ণব ধর্মের এক মহাসমন্বয় দেখা যায়। ‘রথ’ শব্দের ব্যবহার বেদ, উপনিষদ ও পুরাণে পরিলক্ষিত। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বিভিন্ন রকম রথের বহুল ব্যবহার রয়েছে। বৈশাখ মাসের প্রথম ও দ্বিতীয় দিনে নেপালে ভৈরব-ভৈরবীর রথযাত্রা প্রচলিত, জৈনরা তীর্থঙ্করকে রথে বসিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করতেন। বুদ্ধদেবের জন্ম ও নির্বাণের দিনটি হল বৈশাখী পূর্ণিমা, প্রাচীন বৌদ্ধক্ষেত্রে ওই দিন বুদ্ধের দেহাবশেষ রথে রেখে বৌদ্ধদের রথযাত্রার বর্ণনা পাওয়া যায়। মনে করা হয়, ‘জগন্নাথ’ নামের মূলে আছেন ভগবান বুদ্ধ। বৌদ্ধরা ধর্মকে ‘নারীমূর্তি’ রূপে কল্পনা করতেন এবং বলভদ্র হলেন ‘সংঘ’। ‘বুদ্ধ’, ‘সংঘ’ ও ‘ধর্ম’ কালান্তরে ‘জগন্নাথ’, ‘বলভদ্র’ ও ‘সুভদ্রা’-য় রূপান্তরিত হয়েছেন বলে মনে করা হয়।
মিথ আর ইতিহাসের মেলবন্ধনে রথযাত্রায় সনাতন ধর্মের সঙ্গে বৌদ্ধ, জৈন, শৈব, বৈষ্ণব ধর্মের এক মহাসমন্বয় দেখা যায়। ‘রথ’ শব্দের ব্যবহার বেদ, উপনিষদ ও পুরাণে পরিলক্ষিত। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বিভিন্ন রকম রথের বহুল ব্যবহার রয়েছে।
হিন্দুধর্মে শিব, কার্তিক, গণেশেরও রথযাত্রা দেখা যায়। তবে আমরা ‘রথযাত্রা’ বলতে আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়ায় শ্রীজগন্নাথদেবের রথযাত্রাকেই বুঝি। নগর পরিক্রমায় প্রতিটি ভক্ত হৃদয়ে পৌঁছে যাওয়ার প্রবণতা থেকে ‘যাত্রা’ কথাটি যুক্ত হয়।
ধৈর্যচ্যুতির ফলে তৈরি অসম্পূর্ণ, অথচ তীব্র বিস্ময়কর তিন বিগ্রহ জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা– আদিতে শবরদের উপাস্য ছিলেন বলে মনে করা হয়। তবে ভগবান তো শেষত বিগ্রহে বাস করেন না, তিনি থাকেন দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্কবর্জিত ভক্তহৃদয়ে। বারতের সব উপাস্য দেবতাই সহজ, সরল, অখণ্ড। এই অখণ্ড ভাবের প্রভার রথযাত্রা দর্শিত।
চৈতন্যদেব থেকে রামকৃষ্ণ– প্রত্যেকেই নিজ চিন্তনে যাপন করেছেন এই ‘মহাভাব’। শিবজ্ঞানে সমস্ত জীবকুলকে সেবার যে দর্শন শিখিয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ, রথের রশি টেনে সেই সত্যের অন্যতর প্রকাশও ঘটিয়েছিলেন। জগতের প্রতিটি জীবের সেবা-ই তো জগন্নাথের সেবা। ‘শরীর’ নামক রথে ‘চৈতন্য’ ও ‘বুদ্ধি’-কে সারথি করেই রথের রশিতে টান দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। জাতপাতের গণ্ডি পেরিয়ে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই তো দেবতার রথযাত্রা।
ধৈর্যচ্যুতির ফলে তৈরি অসম্পূর্ণ, অথচ তীব্র বিস্ময়কর তিন বিগ্রহ জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রা– আদিতে শবরদের উপাস্য ছিলেন বলে মনে করা হয়। তবে ভগবান তো শেষত বিগ্রহে বাস করেন না, তিনি থাকেন দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্কবর্জিত ভক্তহৃদয়ে।
শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন– মানুষের দেহ-ই প্রকৃত ‘রথ’। আর, এই রথে যিনি উপবিষ্ট– সেই অন্তর্যামী আত্মা আমাদের আরাধ্য ‘জগন্নাথ’, তিনিই ‘রথী’। মনের দড়ি দিয়ে যদি আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়কে ভগবানের দিকে পরিচালিত করতে পারি– তবেই সফল হয় ‘রথযাত্রা’। রথের দড়িতে টান দেওয়ার অর্থ: ঈশ্বরের প্রতি নিজের ভক্তির টানকে তীব্র করা।
(মতামত নিজস্ব)
Advertisement
