পার্থপ্রতিম বিশ্বাস: জ্বালানির খরচ কমিয়ে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে পেট্রলের সঙ্গে দেশীয় ইথানল মিশিয়ে ‘বিকল্প’ জ্বালানি রূপে বাজারে ছাড়া হয়েছে ‘ই ২০ পেট্রল’। এতে যানদূষণ কম হয়। কিন্তু শুল্কের ধাক্কায় লিটারে ৭২ টাকার ২০% ইথানল, লিটারে ৭৫ টাকার ৮০% পেট্রলের সঙ্গে মিশিয়ে তা পেট্রল পাম্পে বিক্রি হয় ১১৩ টাকায়। ফলে সস্তা নয়। সেই সঙ্গে থাকছে আরও কিছু প্রশ্ন।
সুকুমার রায় লিখেছিলেন–
হঁাস ছিল সজারু, (ব্যাকরণ মানি না),
হয়ে গেল ‘হঁাসজারু’ কেমনে তা জানি না।
‘হঁাস’ এবং ‘সজারু’ ভিন্ন প্রজাতির প্রাণী। এমন ভিন্ন চরিত্রের দুই জীব, ব্যাকরণ ভেঙে মিশে গেলে যেমন ‘হঁাসজারু’ তৈরি হয়, এখন তেমনটাই শোনা যাচ্ছে এ-দেশের বাজারে মোটরগাড়ির ‘বিকল্প’ জৈব জ্বালানি নিয়ে!
সাধারণভাবে পেট্রল মহার্ঘ জ্বালানি হিসাবে স্বীকৃত। সেই জ্বালানির ভাণ্ডার এ-দেশে খুবই সীমিত বলেই মোটরগাড়ির জ্বালানির সিংহভাগ জোগান আসে আমদানি-নির্ভর পথে। তার উপর গোদের উপর বিষফোড়ার মতো ইরান-আমেরিকা যুদ্ধের আবহে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল আমদানির অন্যতম পথ হরমুজ প্রণালী যুদ্ধের ‘হটস্পট’ হয়ে ওঠায় এ-দেশের তেল আমদানির ক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে হামেশাই অনিশ্চয়তা। উপরন্তু আমদানি করা জ্বালানির দাম আন্তর্জাতিক বাজার দরের ওঠানামা মেনেই ঘটে। ফলে এ-দেশের অর্থনীতিতে পেট্রল-ডিজেল থেকে রান্নার গ্যাস– সবই ক্রমশ মহার্ঘ হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষিতে আমদানি-নির্ভর জ্বালানির খরচ কমিয়ে ও জ্বালানি-ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে পেট্রলের সঙ্গে দেশীয় ইথানল মিশিয়ে বিকল্প জ্বালানি বাজারে ছাড়া হয়েছে ‘ই ২০ পেট্রল’ নামে।
বলা বাহুল্য, ‘হঁাস’ এবং ‘সজারু’-র মতোই পেট্রল এবং ইথানল দুই ভিন্নধর্মী যৌগ। এমন ভিন্নধর্মী যৌগের সমন্বয়ে জৈব জ্বালানি তৈরি হলে সেটি আর্থিক মানদণ্ডে সাশ্রয়ী কিংবা দূষণরোধী কি না অন্যতম বিচার্য। আবার, জ্বালানি ও মোটরগাড়ির ইঞ্জিন একে-অন্যের পরিপূরক না-হলে যে পথেঘাটে সমূহ বিপদ সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই প্রেক্ষিতেই সম্প্রতি ‘ই ২০’ জৈব জ্বালানি ব্যবহারকে কেন্দ্র করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে।
জৈব জ্বালানি হিসাবে ব্যবহৃত ইথানল তৈরি হয় এ-দেশের কৃষিজাত পণ্য আখ, ধান কিংবা বাজরা থেকে। ফলে এমন দেশজ পণ্য, ‘বিকল্প’ জ্বালানি তৈরিতে কঁাচামাল হিসাবে ব্যবহৃত হলে দেশ আত্মনির্ভরতার পথে যে খানিক এগতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ নেই। উপরন্তু এও প্রমাণিত সত্য যে, ইথানল মেশানো পেট্রোলের মতো জৈব জ্বালানিতে দূষণ অনেকটাই কম।
ফলে দেশজুড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে চলা যানদূষণের নিরিখে ‘ই ২০’ জৈব জ্বালানি সাধারণ পেট্রলের তুলনায় নিরাপদ। কিন্তু ইথানলের মতো জৈব জ্বালানির এতো সুফল সত্ত্বেও বেশ কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে ওই ‘বিকল্প’ জ্বালানির ব্যবহার ঘিরে।
প্রথমত, মূল্যের নিরিখে এ-দেশের বাজারে তৈরি পেট্রলে মেশানো ইথানলের প্রতি লিটারে দাম পড়ে ৭২ টাকা। আর আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানি করা কঁাচামাল হিসাবে ব্যারেল পিছু পেট্রলের দাম পড়ে ৭০-১৩০ মার্কিন ডলার। এক ‘ব্যারেল’ মানে ১৫৯ লিটার তেল হলে, লিটার পিছু পেট্রলের দাম পড়ে ৪৩ থেকে ৭৯ টাকা পর্যন্ত। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সর্বোচ্চ মূল্যের সময় ইথানল পেট্রলের সঙ্গে বিভিন্ন অনুপাতে মেশালে আংশিক সাশ্রয় হতে পারে। কিন্তু এ-দেশের জ্বালানিতে শুল্কের ধাক্কায় লিটারে ৭২ টাকার ২০% ইথানল, লিটারে ৭৫ টাকার ৮০% পেট্রলের সঙ্গে মিশিয়ে রাজ্যের পেট্রল পাম্পে বিক্রি হয় ১১৩ টাকায়। অতএব এটা স্পষ্ট যে, জ্বালানির দামের নিরিখে ইথানল-মেশানো পেট্রোল বিরাট সাশ্রয়ী নয়। ফলে আগামী দিনে জ্বালানি তেলে ইথানলের অনুপাত ৩০% বাড়িয়ে ‘ই ৩০’ কিংবা ৭৫% বাড়িয়ে ‘ই ৭৫’ পেট্রল চালু করার যে সরকারি পরিকল্পনা রয়েছে তাতে দূষণ নিয়ন্ত্রণে এলেও জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে থাকার কোনও গ্যারান্টি মিলছে কি আদৌ?
দ্বিতীয় প্রশ্ন: জল সংকটের। পাশাপাশি ভুট্টা, ধান কিংবা আখের মতো কৃষিপণ্য থেকে ইথানল উৎপাদনে প্রচুর পরিমাণ জলের প্রয়োজন হয়। দ্বিতীয় প্রশ্নটি সেখানেই– দেশজোড়া জলবায়ু পরিবর্তনের নিরিখে ইথানল শিল্পের জন্য বিপুল পরিমাণ জলের ব্যবহার কি আখেরে দেশের অন্যান্য কৃষিপণ্যের চাষের সংকট ডেকে আনতে পারে? কারণ বর্তমানে ভিন্ন ভিন্ন শস্য থেকে তৈরি করা ইথানল কৃষকদের থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা কেনে লিটার পিছু ৫২ থেকে ৭২ টাকায়। অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে কৃষিভিত্তিক শিল্প ইথানল উৎপাদনে বাজারের প্রবল চাহিদা থাকলেও ভবিষ্যতে সেক্ষেত্রে সরকারি নিয়ন্ত্রণ জরুরি। অন্যথায় সেচের জলের অভাবে কৃষিনির্ভর দেশে কৃষিক্ষেত্রে ভিন্নমাত্রিক সংকট আসতে পারে!
তৃতীয় এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, পেট্রোল ও ‘ই ২০’ গোত্রের মিলিত জ্বালানিতে গাড়ির সুরক্ষা-সংক্রান্ত। জ্বালানির সঙ্গে মোটরগাড়ির ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। পেট্রল ইঞ্জিনের গাড়ি যেমন ডিজেল বা কেরোসিন দিয়ে চালানো যায় না, ঠিক তেমনই ‘ই ২০’ গোত্রের জ্বালানি দিয়ে বিশুদ্ধ পেট্রল ইঞ্জিনের গাড়ি চালানোর ঝুঁকি প্রবল।
বুঝিয়ে বলি। ইথানল জলাকর্ষী পদার্থ হওয়ায় স্বাভাবিক সময়ে বাতাস থেকে জল টানার প্রবণতা প্রবল। ফলে ‘ই ২০’ জ্বালানিতে জল ও ইথানলের ‘ফেজ সেপারেশন’-এ গাড়ির ইঞ্জিনের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হয়– যা মোটর গাড়ির কার্বুরেটর, ইঞ্জিন, জ্বালানি ট্যাঙ্ক ও অন্যান্য যন্ত্রাংশে ক্ষয় ধরাতে থাকে দ্রুত। এছাড়াও জ্বালানি হিসাবে ইথানলের শক্তি পেট্রলের তুলনায় ৩০% শতাংশ কম। তাই পেট্রোলের সঙ্গে ইথানল মেশানো হলে সেই জ্বালানির সার্বিক ক্ষমতা কমে। ফলে যাত্রাপথে জ্বালানি খরচ বাড়বে, কিন্তু কমবে গাড়ির মাইলেজ। ইতিমধ্যে ‘এআরএআই’ ল্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ‘ই ২০’ জৈব জ্বালানির ব্যবহারে ৫-৬% অবধি মাইলেজ কমার কথা স্বীকৃত হলেও বাস্তবে মাইলেজ আরও কমছে।
বিশেষত যে-সমস্ত গাড়ি ২০২৩ সালের আগে তৈরি হয়েছে সেগুলিতে এখন ‘ই ২০’ জ্বালানি ব্যবহার করলে তাদের যন্ত্রাংশের ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা প্রবল থেকে প্রবলতর। আর জ্বালানির কারণে তৈরি হওয়া এমন ক্ষতি গাড়িবিমার আওতার বাইরে চলে যাচ্ছে– সেই ‘ড্যামেজ’ দুর্ঘটনাজনিত নয়– এমন কারণ দর্শিয়েই।
দেশের চালু ৭৫% যানবাহন ২০২৩ সালের আগে উৎপাদিত। ফলে ‘বিকল্প’ জ্বালানির জন্য ‘বিকল্প’ যন্ত্রাংশ না লাগিয়েই রাজপথে গাড়ি চলতে থাকলে যানবাহনের ক্ষয়ক্ষতি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে। সেক্ষেত্রে কমবে গাড়ির আয়ু, বাড়বে গাড়ি চালানো এবং রক্ষণাবেক্ষণের খরচ। ফলে যে জ্বালানি কেবল বিএস-৬ গাড়িতে ব্যবহারযোগ্য, তা-ই যদি সব গাড়িতে ব্যবহার বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে তখন দেশের পরিবহণ ব্যবস্থায় বড় সংকট নেমে আসা কষ্টকল্প থাকবে না। সব মিলিয়ে দেশজুড়ে সংশ্লিষ্ট ‘বিকল্প’ জ্বালানি ব্যবহারে শঙ্কা বাড়ছে।
ইতিমধ্যে সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, ২০৩০ থেকে ‘ই ৩০’ পেট্রল ব্যবহার বাধ্যতামূলক হবে। সেখানেও পুরনো গাড়ির যন্ত্রাংশের উপযুক্ত পরিবর্তন না ঘটিয়ে ‘ই ২০’ থেকে ‘ই ৩০’ জ্বালানিতে উত্তরণ ঘটলে মোটরগাড়ির আয়ুক্ষয় বাড়বে। মনে রাখতে হবে, এখন এ-দেশে মোটরসাইকেল, অটো-রিকশা, চার চাকার গাড়ির সিংহভাগ চলে পেট্রোলে। ফলে জৈব জ্বালানির ধাক্কায় যানবাহনের মাইলেজ এবং দ্রুত আয়ু ক্ষয় হতে থাকলে এদেশের পরিবহণ ব্যবস্থাতেই বড় ধাক্কা লাগবে।
সেই প্রেক্ষিতে, নতুন-নতুন জ্বালানি প্রয়োগের আগে স্বল্প খরচে পুরনো ইঞ্জিনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটাতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ প্রয়োজন, এবং অবশ্যই তা কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে। আর, দেশের সামগ্রিক স্বার্থে কেন্দ্রীয় সরকারের উচিত গাড়ি নির্মাণকারী সংস্থাগুলিকে পুরনো গাড়িগুলির সুলভে নতুন জৈব জ্বালানি ব্যবহারযোগ্য করে তোলার নির্দেশ দেওয়া। অন্যথায় অচিরেই দেশের অটোমোবাইল শিল্পেও নেমে আসতে পারে সংকটের মেঘ।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক অধ্যাপক
