রাজ্যসভার ভোটে ৩৭ আসনে ভোট ছিল। ২৬ আসনের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতায় ভোট হয় ১১ আসনে। সেগুলির মধ্যে ৯টি জিতেছে এনডিএ, ২টি বিরোধীরা। বিরোধী শিবির বিজেপি তছনছ করে দিয়েছে। ভোটে যেই জিতুক, সরকার গড়বে বিজেপি– এই ধারণার বিপক্ষে প্রবল প্রতাপে পশ্চিমবঙ্গে লড়ে যাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস। বাঘা তেঁতুলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) অপরাজেয়, ইতিহাস সাক্ষী।
কয়েক বছর ধরে বিদ্রুপমিশ্রিত এক মশকরা চালু হয়েছে– যার মোদ্দা কথা– ভোটে যেই জিতুক, সরকার গড়বে বিজেপি। দিন যত এগচ্ছে, মশকরা ততই রূঢ় বাস্তব হয়ে খ্যাপার মতো ভারতীয় রাজনীতিকে পরিহাস করছে। নির্বাচন কমিশন সেই রাজনৈতিক পরিহাসের দোসর। মোদি সরকারের ‘সুগ্রীব’ ‘জ্ঞানেশ কুমার অ্যান্ড কোং’-এর প্রলয়নাচন শেষমেশ পশ্চিমবঙ্গে মুখ থুবড়ে পড়ে কি না, তা এই মুহূর্তের সেরা সাসপেন্স। আগামী দু’-মাস ভারতীয় রাজনীতি ও গণতন্ত্রের এক অভিনব সন্ধিক্ষণও বটে।
রাজনীতির আঙিনায় এখন যা-যা ঘটে চলেছে তা ওই মশকরার নানাবিধ ‘এক্সটেনশন’। এই যেমন রাজ্যসভার ভোট। এবার মোট ৩৭ আসনে ভোট ছিল। ২৬ আসনের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতায় ভোট হয় ১১ আসনে। সেগুলির মধ্যে ৯টি জিতেছে এনডিএ, ২টি বিরোধীরা। বিরোধী শিবির বিজেপি আরও একবার তছনছ করে দিয়েছে। বিহারে কংগ্রেসের ৩ ও আরজেডি-র ১ জন ভোট দিতে না-যাওয়ায় এনডিএ জিতেছে বাড়তি ১টি আসন। ওড়িশায় কংগ্রেস-বিজেডি জোট বেঁধেছিল। কিন্তু ৩ জন কংগ্রেসি ও ৬ জন বিজেডি বিধায়ক জোট প্রার্থীকে ভোট না-দেওয়ায় বিজেপি-সমর্থিত নির্দল প্রার্থী জিতে গিয়েছেন। হরিয়ানায় শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস একটি আসনে জিতেছে ঠিকই– কিন্তু দলের ৫ বিধায়ক বিজেপি প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন।
মোদি সরকারের ‘সুগ্রীব’ ‘জ্ঞানেশ কুমার অ্যান্ড কোং’-এর প্রলয়নাচন শেষমেশ পশ্চিমবঙ্গে মুখ থুবড়ে পড়ে কি না, তা এই মুহূর্তের সেরা সাসপেন্স। আগামী দু’-মাস ভারতীয় রাজনীতি ও গণতন্ত্রের এক অভিনব সন্ধিক্ষণও বটে।
বিরোধীদের অভিযোগ, বিজেপি নাকি ভোটপিছু ৫ কোটি টাকা খরচ করেছে। সত্যি-মিথ্যে ঈশ্বর জানেন, অন্যদের জানতে বাকি নেই, টাকার প্রলোভন উপেক্ষা করা ও ইডি-সিবিআইয়ের হয়রানির হাত থেকে বঁাচার সামর্থ খুব কমজনের আছে। এই কারণেই ওই মশকরা ইদানীংকালের রূঢ় রাজনৈতিক বাস্তবতা। এ থেকে পরিত্রাণ কিংবা প্রতিরোধের ক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে।
অবশ্য প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকবেই-বা কী করে? ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মস’ (এডিআর) ও নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য দেখাচ্ছে, ২০২৪’-২৫ অর্থবর্ষে বাজার থেকে বিজেপি চঁাদা তুলেছে ৬ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা। তুলনায় কংগ্রেসের সংগ্রহ মাত্র ৫২২ কোটি! এটি মোটেই ইদানীংয়ের প্রবণতা নয়, ১০ বছর ধরেই চঁাদা সংগ্রহের এই অসাম্য ভারতীয় রাজনীতির জ্বলন্ত দলিল। সুপ্রিম কোর্ট ‘ইলেক্টোরাল বন্ড’ বেআইনি জানিয়ে বাতিল করেছে, অথচ বেআইনিভাবে তোলা সেই টাকা দাতাদের ফেরতের নির্দেশ দেয়নি। বাজেয়াপ্তও করেনি। নির্বাচন কমিশন তার তৈরি ভোটার তালিকা ‘ভুলে ভরা’ বলে বাতিল করে ‘এসআইআর’ আমদানি করলেও ভুয়ো ভোটারদের ভোটে নির্বাচিত সরকার বাতিলের রাস্তায় হঁাটল না। ইলেক্টোরাল বন্ডের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনই হয়েছে। ফলে নতুন ভারতের রাজনীতি হয়ে দঁাড়িয়েছে ঠগ ও মগের মুলুক।
বিরোধীদের অভিযোগ, বিজেপি নাকি ভোটপিছু ৫ কোটি টাকা খরচ করেছে। সত্যি-মিথ্যে ঈশ্বর জানেন, অন্যদের জানতে বাকি নেই, টাকার প্রলোভন উপেক্ষা করা ও ইডি-সিবিআইয়ের হয়রানির হাত থেকে বঁাচার সামর্থ খুব কমজনের আছে।
সেই মুলুকে সবচেয়ে অসহায় ও করুণ হাল কংগ্রেসের, সবচেয়ে সাহসী ভূমিকা নিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। এই দল দু’টির পাশাপাশি বাকি বিরোধীরা যে-যার খাস তালুকে যেটুকু প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চাইছে, সর্বভারতীয় পর্যায়ে তা গালিভার ও লিলিপুটদের অসম ক্ষমতার সঙ্গে তুলনীয়। সমকালীন ভারতীয় রাজনীতির বৈশিষ্টই এই অসম লড়াই।
সেই লড়াই সবচেয়ে প্রাণবন্ত পশ্চিমবঙ্গে, কিছুটা তামিলনাড়ুতে। এই দ্বৈরথে কংগ্রেস পুরোভাগে নেই। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির টুঁটি টিপে লড়ে যাচ্ছে একা তৃণমুল কংগ্রেস, তামিলনাড়ুতে ডিএমকে ও তার সহযোগীরা। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী স্ট্যালিনের সঙ্গী কংগ্রেস। কেরলমে বিজেপি নিমিত্তমাত্র। সেখানে কংগ্রেসের প্রতিপক্ষ যারা, সর্বভারতীয় আঙিনায় সেই বামপন্থীরা বিজেপি-বিরোধী মোর্চায় আসীন। বিজেপির সঙ্গে কংগ্রেসের সরাসরি টক্কর অসমে। যদিও যুদ্ধের আগেই সেখানে কংগ্রেসের মুখ পুড়েছে। বিজেপিতে চলে গিয়েছেন প্রাক্তন প্রদেশ সভাপতি ভূপেন বরা ও সাংসদ প্রদ্যোৎ বরদলুই। ভূপেন একা যাননি, সঙ্গে নিয়েছেন তরুণ নেতা সঞ্জু বরুয়া ও সর্বনারায়ণ দেউরিকে। সোমবার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর ভূপেনের নির্লজ্জ উক্তি, ‘কংগ্রেসে আমিই ছিলাম বিজেপির লোক।’ এই কথাই এত বছর ধরে হিমন্ত বলতেন, ‘কংগ্রেসে আমার অনেক লোক আছে।’
পশ্চিমবঙ্গকেও কব্জা করতে বিজেপির চেষ্টার অন্ত নেই। কিন্তু তাদের সাধ ও সামর্থের মধ্যে ঢাল হয়ে দঁাড়িয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাষ্ট্রশক্তি ও ইচ্ছাশক্তির এই দ্বৈরথের পরিণতি দেখতে উৎসুক সারা দেশ।
এবার অসমে বিজেপির ভোট-চালচিত্র এই কারণেই অভিনব। ৮৯ জন প্রার্থীর মধ্যে ৩০ জনই দলবদলু। এঁদের মধ্যে ১৯ জন কংগ্রেসি, যে-দল থেকে বিজেপিতে গিয়ে হিমন্ত বিশ্বশর্মা মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন এবং সারা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ছড়ি ঘোরাচ্ছেন। এই মুহূর্তে ওই রাজ্যের জমাটি লড়াই আদি ও নব্য বিজেপির মধ্যে। হিমন্তকে যিনি দলে ভিড়িয়েছিলেন বিজেপির সেই প্রাক্তন সভাপতি সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য, প্রবীণ বিধায়ক অতুল বরা, জয়ন্ত কুমার দাস, ডেপুটি স্পিকার নুমার মোমেইনরা টিকিট না-পেয়ে ফুঁসছেন। বলছেন, ‘কংগ্রেসমুক্ত দেশ’ গড়তে গিয়ে বিজেপি কংগ্রেসিদের হাতেই অসমকে তুলে দিয়েছে! অভিযোগটি অসাড় নয়। অন্য রাজ্যগুলির দিকে তাকালেও তা বোঝা যায়। হয়তো এই কারণেই মোদি-শাহ জুটির কণ্ঠে এখন আর কংগ্রেসমুক্ত ভারত গঠনের অঙ্গীকার শোনা যায় না। অসমের আদি বিজেপি নেতাদের অসন্তোষ কংগ্রেসকে লাভবান করবে সেই সম্ভাবনা ক্ষীণ। বিপুল অর্থ, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক মারপ্যঁাচ, এবং নির্বাচন কমিশনের কলকাঠি মোকাবিলার ক্ষমতা কংগ্রেস বা অন্যদের নেই। টেনিসের পরিভাষায় অনায়াসেই তাই বলা যায় ব্রহ্মপুত্রের বিস্তীর্ণ দু’-পারে ‘অ্যাডভান্টেজ বিজেপি’।
পশ্চিমবঙ্গকেও ওই অঙ্কে কব্জা করতে বিজেপির চেষ্টার অন্ত নেই। কিন্তু তাদের সাধ ও সামর্থের মধ্যে ঢাল হয়ে দঁাড়িয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাষ্ট্রশক্তি ও ইচ্ছাশক্তির এই দ্বৈরথের পরিণতি দেখতে উৎসুক সারা দেশ। ছল ও চাতুরির মিশ্রণে ‘জ্ঞানেশ কুমার অ্যান্ড কোং’ নির্বাচনী পটচিত্র কীভাবে অঁাকছেন, কীভাবে খর্ব হচ্ছে নাগরিক অধিকার, তা বুঝেও প্রতিকারে উদ্যোগী হতে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ‘এসআইআর’ নামক খামখেয়ালিপনার কারণে রাজ্যে রাজ্যে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের তুলনায় ভোটার তালিকায় নাম ওঠা লোকের হার কমে গিয়েছে অন্তত ১০ শতাংশ! আগামী দিনে এই ‘ডি-ভোটার’ জনতাকেই প্রাণপাত করতে হবে নাগরিকত্ব প্রমাণে। নির্বাচন কমিশনের কাজ যথাসম্ভব প্রাপ্তবয়স্কদের ‘ভোটার’ করা, অথচ ‘জ্ঞানের ঈশ্বর’ করছেন তার বিপরীত! এত সাহসী তিনি হতে পেরেছেন মোদি সরকারের আইনে তঁার কেশাগ্র স্পর্শের অধিকার কারও নেই বলে।
ইতোমধ্যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় অর্ধশত আইএএস ও আইপিএস অফিসার বদলি হয়েছেন। কে নেই সেই তালিকায়? মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্র সচিবের পাশে রয়েছেন রাজ্য পুলিশের একাধিক ডিজি, কলকাতা পুলিশের শীর্ষকর্তাবৃন্দ, বিভিন্ন জেলাশাসক– রাজ্য উজাড় করে কর্তাদের পাঠানো হচ্ছে ভিন রাজ্যে। রাতারাতি বদলি হয়েছেন ৭৩ জন রিটার্নিং অফিসার। এই তুঘলকি কাণ্ডে রাজ্য প্রশাসনের হাল কী হবে কেউ জানে না। যেমন জানা নেই ৬০ লাখ বিবেচনাধীন ভোটারের কতজন শেষ পর্যন্ত ছাড়পত্র পাবেন। যঁারা পাবেন না, ট্রাইব্যুনালে যাবেন, ভোট গ্রহণের আগে অধিকার চূড়ান্ত না হলে তঁারা যদি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন, কী করবে মহামান্য আদালত? কী ভূমিকাই বা নেবে তৃণমূল নেতৃত্ব? কী ধরনের সুপারিশ করতে পারে নির্বাচন কমিশন? অনেক ‘যদি’ ও ‘কিন্তু’ ঝুলে রয়েছে এই ন্যায্য ভোটারদের অধিকার ঘিরে। আর এখানেই জন্ম ঘোরতর এক সংশয়ের।
২৩ এপ্রিলের আগে ট্রাইবুনালের কাজ শেষ না হলে কি পিছিয়ে দেওয়া হতে পারে রাজ্যের ভোট? স্বল্প সময়ের জন্য? রবীন্দ্রনারায়ণ রবিকে রাজ্যপাল করে পশ্চিমবঙ্গে আনার নেপথ্য কারণ কি সেটাই? রাষ্ট্রপতির ‘শাসন’ জারি করে ভোটগ্রহণের ছক? সেটাই কি তবে সিলেবাসের বাইরের সেই অঙ্ক যা তৃণমূল নেতৃত্ব আগে কষেনি কিন্তু এই শেষবেলায় অঁাচ করতে পারছে? শঙ্কা সত্যি হলে কী করবেন মমতা? বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের যুগলবন্দি, আস্তিনে লুকনো তুরুপের তাস এবং মমতার মাভৈঃ হুঙ্কারে ভোট-যুদ্ধ টানটান। একপক্ষ বুনো ওল হলে প্রতিপক্ষ বাঘা তেঁতুল। ইতিহাস সাক্ষী, এমন লড়াইয়ে মমতা কখনও হারেননি।
(মতামত নিজস্ব)
