অবিভক্ত ভারতকে যখন তিনটি ভাগে বিন্যস্ত করে, এবং ভারতবাসীদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে আগামী কয়েক দশকের জন্য অবিন্যস্ত করে দিয়ে ব্রিটিশ প্রভুরা বিদায় নিল- তখন 'ভারত' ও 'পাকিস্তান' (পূর্ব ও পশ্চিমে সম্প্রসারিত) নামে দু'টি স্বতন্ত্র ভূখণ্ড গড়ে ওঠার পাশাপাশি এই ভারতীয় উপমহাদেশের ব্যবহারিক অভিধানে পলি-জমা জমির মতো আরও একটি নতুন শব্দ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে- 'রিফিউজি'। কেউ পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে এসে ঘটি-বাটি, সম্মান-সম্ভ্রম হারাল। কেউ পাঞ্জাব থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হল, এবং 'বিন্দুবৎ' পরিচয় গ্রহণ করে সর্বস্ব হারিয়ে স্মৃতিকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত হল।
এপার থেকে ওপারে, বা ওপার থেকে এপারে, যা-ই বলি, যে বিপুল জনস্রোত 'দ্বিজাতি তত্ত্ব'-র অনপনেয় অভিশাপ বহন করে আসা-যাওয়া করেছিল, তাদের চরিত্রগতভাবে আবার দু'টি বর্গে ভাগ করা যায়। এক শ্রেণি উচ্চবর্ণ ও উচ্চবর্গের। তারা আর্থিক সম্পদে বলীয়ান। তৎসহ তাদের রয়েছে সাংস্কৃতিক সম্পদ। অন্য শ্রেণি নিম্নবর্গের, নিম্নবর্ণের প্রতিভূ। তাদের না রয়েছে আর্থিক সম্পদ, না রয়েছে তাদের সাংস্কৃতিক অভিধা। বিশেষত, পূর্ববঙ্গ থেকে আগত উদ্বাস্তু জনস্রোতের পর্যালোচনায় এমন বিভাজন-কথা বলার মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে বিচ্যুতি ঘটার আশঙ্কা নেই।
সদ্য মুক্তি পেয়েছে ইমতিয়াজ আলি পরিচালিত 'ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা'। দেশভাগের জটিলতা যার কেন্দ্রে। এ-উপাখ্যান বর্তমান থেকে অতীতে যাওয়ার কাহিনি শোনায়।
বর্ণে ও বর্গে যারা এগিয়ে, যারা উচ্চকোটির, যাদের রয়েছে 'ক্যাপিটাল' ধনসম্পত্তি হোক বা সাংস্কৃতিক অর্জন-তারা এই বঙ্গে এসে বসতি স্থাপনে উদ্যোগী হয় আইনানুগভাবে। তৎকালীন সরকারের সঙ্গে কথা বলে। এই উচ্চকোটির মানুষেরা যখন দেশভাগ নিয়ে কলম ধরেছে, তাতে বেশি করে ধরা পড়েছে স্মৃতির দোলাচল, ফেলে আসার বেদনা, নস্টালজিয়া। অন্যদিকে, নিম্নবর্ণের ও নিম্নবর্গের মানুষেরা এপারে এসে ছড়িয়েছিটিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। কেউ গেল ক্যাম্পে, কেউ দণ্ডকারণ্যে, কেউ পরে মরিচঝাঁপিতে। এদের লিখিত দেশভাগের সাহিত্যে বা ডকুমেন্টেশনে অত্যাচারিত হওয়ার হওয়ার উপাদান বেশি। সমাজের মূলস্রোতে মিশে যেতে না-পারার যন্ত্রণা বেশি। সহানুভূতি না-পাওয়ার কষ্ট বেশি। সবচেয়ে বড় কথা, এই প্রান্তিক শ্রেণির থেকে যতটা পরিমাণে দেশভাগ নিয়ে বিধিবদ্ধ ডকুমেন্টেশন পাওয়ার কথা ছিল, আমরা হয়তো ততখানি পাইনি।
সদ্য মুক্তি পেয়েছে ইমতিয়াজ আলি পরিচালিত 'ম্যায় ওয়াপস আউঙ্গা'। দেশভাগের জটিলতা যার কেন্দ্রে। এ-উপাখ্যান বর্তমান থেকে অতীতে যাওয়ার কাহিনি শোনায়। ভারত-ভাগের পরে যা পাকিস্তান হল, সেখান থেকে একটি সম্ভ্রান্ত শিখ পরিবার চলে আসে ভারতে। উপায়হীন হয়ে। তারা সব হারায়। সমৃদ্ধি, সামাজিক সম্মান ও প্রতিপত্তি। মৃত্যু হয় অনেকের। আর, এই চিত্র তুলে ধরার সময় পরিচালক অবলম্বন করলেন সেই জনবর্গকে, যারা উচ্চকোটির, উচ্চবর্গের। আর্থিকভাবে পুষ্ট। সাংস্কৃতিক উপাদানে ভরপুর। প্রান্তিক মানুষের দেশভাগ- ইমতিয়াজের সিনেমাতেও রেলগাড়ির মাথায় চড়ে বসা অজস্র মাথার ভিড়ে সীমিত রইল বা হারিয়ে গেল। হায়!
