শালকোনা, আন্দুলিয়া, ঝাউডাঙা, রঘুরামপুর, তুবড়িয়া। এই পাঁচটি গ্রামে যেতে হবে সাইকেল চালিয়ে। একশোটি খবরের কাগজ ফেরি করতে হবে। ফলে একশোরর ওঠা ও একশোবার নামা। মোট রাস্তা ২৮ মাইল রাস্তা। তার আগে নারান এক কাশ চা ও এক আনার একটি মুক্তি বিস্কুট খেয়ে নিচ্ছিল। খুব চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছিল বিন্তুউটি। যতক্ষন না মুখের মধ্যে তা গলে যায়। তারপর কোদাল দিয়ে কাদা ছানার মতো করে জিভ দিয়ে নাড়তে থাকল বিস্কুটের দলা। একটির বেশি বিস্কুট খাওয়ার সঙ্গতি নেই নারানের। তাই জিভের সঙ্গে স্নায়ু ও মনের পরিতৃপ্তির সংযোগ ঘটাতে চাইছিল সে। গত রাতে নারান খেয়েছিল চারটে মোটা রুটি, আর আলুর ছেঁচকি। সে কখন হজম হয়ে গিয়েছে। খবরের কাগজের দফতরে নাইট ডিউটি করে সকালে নারান বাড়ি ফেরে না। দু'-পয়সা কামানোর জন্য সাইকেলে কাগজ ফিরি করে।
২৮ মাইল পথ ঠেঙিয়ে বাড়ি ফেরার সময় তার পেটের মধ্যে রাক্ষস নেচে বেড়ায়। মতি নন্দী এইভাবে প্রথম বাঙালি পাঠকের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিয়েছিলেন নারানের। অফিসের মাইনে ৬০ টাকা। দুধ সেচে ক'-পয়সা আংসে। এরপরে খিদে ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করার জন্য যে বাড়তি টাকা দরকার, তার কিছুটা নারান জোগাড় করে রোজ ২৮ মাইল সাইকেলে ঘুরে ঘুরে কাগজ ফিরি করে। একটি সাধারণ সাইকেল, একটি সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে, আস্তে আস্তে পাঠককে টেনে নিয়ে যায় অসাধারণ এক আখ্যানের দিকে।
৩ জুন ছিল 'বিশ্ব বাইসাইকেল দিবস'। নীরবেই কেটে গেল। ঘটাপটা কে করবে। এই হল সমস্যা।
সাইকেল সেই 'ভারত'-এর সঙ্গে একায়, যা 'ইন্ডিয়া' নয়। গ্রাম থেকে শহরে আসার এমন বাহন, যা একটি প্রামীণ কিশোর বা কিশোরীকে দিতে পারে আগুনপাণি হতে পারার গর্ব। সাইকেল করে কাগজ ফিরি করার দৃশ্য এখনও মুছে যায়নি। ছাত্রছাত্রীর সাইকেল করে স্কুলে যায়, টিউশনে যায়, বয়সের নিয়মে সাইকেল হয়ে ওঠে তাদের প্রেমের ময়ুরশরক্ষী- এও কি যুব পরিচিত নয়।
বাইকের সঙ্গে সাইকেল কখনও তুলনীয় হতে পারে না। দামে, দছে, কেতায় বাইক অনেক লোভনীয়। সাইকেলকে বরং বেশি মানায় মধ্যবিত্তের টিমটিমে অস্তিত্বের পাশে। কিন্তু কোভিডের দিনগুলি যেন হঠাৎ করে সাইকেলের ছাইচাপা আগুনকে উসকে দিয়েছিল। খানিক ব্যায়াম হলে, খানিক ঘোরাঘুরি, অথচ আম আদমির ছোঁয়াচ লাগবে না, সাইকেল ফিরে পায় গুরুত্ব। কিন্তু এ তো শহরে বৃষ্টিকোণ। ভাবনা-বিলাস। দেশের অগণিত গ্রামে, ছোট শহরে, মফস্সলে সাইকেল এখনও বহাল তবিয়তে। চালানোর আগে দু'-হাতে টিপে দেখে নিতে হয় হাওয়া কম নেই তো। 'গিগ'-তশ্রমিকদের একাংশ এখনও সাইকেলের উপরই নির্ভরশীল। নারাদের মতো অনেকেই শহরের এ-মুড়ো থেকে গু-মুড়ো চষে বেড়াচ্ছে।
৩ জুন ছিল 'বিশ্ব বাইসাইকেল দিবস'। নীরবেই কেটে গেল। ঘটাপটা কে করবে। এই হল সমস্যা। আমরা স্বপ্ন দেখব- সাইকেল লেনে ভরে যাচ্ছে শহর ও দেশ, কিন্তু পরিকাঠামোর জন্য সরব হব না, এমনকী, যে-দিনটি সাইকেলের জন্য, তাকেও উপেক্ষা করব।
