ভেনেজুয়েলায় রয়েছে ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেল। তদুপরি ২০১৮ সাল থেকে এই দেশটি ডলার প্রত্যাখ্যান করে তেলের বিক্রি চালিয়ে এসেছে চৈনিক মুদ্রা ‘ইউয়ান’-এর মাধ্যমে। চুম্বকে: বামপন্থী ভেনেজুয়েলা হোয়াইট হাউসের হম্বিতম্বি মেনে নেয়নি। তারই মাশুল গুনলেন নিকোলাস মাদুরো? লিখেছেন শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত।
‘American sweat, ingenuity and toil created the oil industry in Venezuala. It’s tyrannical
expropriation was the largest recorded theft of American wealth and property.’
Stephen Miller
(US Security Advisor)
খনিজ তেলের সম্ভারের দখল, তেল ঘিরে ব্যবসা, এবং সর্বোপরি, এই বাণিজে্যর সঙ্গে, অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত মহামূল্যবান পেট্রোডলারের নিশ্ছিদ্র স্বার্থরক্ষার জন্যই ভেনেজুয়েলার উপর নির্লজ্জ মার্কিন আক্রমণ, এবং সেখানকার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর অপহরণ ও গ্রেপ্তার করা! তঁার বিরুদ্ধে অভিযোগ– বিপুল পরিমাণে ‘নিষিদ্ধ’ পাদকদ্রব্য পাচারের! সমাজতন্ত্রর প্রতি অনুগত এই রাষ্ট্রপ্রধানকে ‘স্বৈরাচারী’ বলা এখনও সম্ভব হয়নি।
ভেনেজুয়েলার মাটির তলায় রয়েছে ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেল। সৌদি আরবের চেয়ে বেশি। উপরন্তু, মার্কিনি শাসকদের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে ২০১৮ সাল থেকে সে-দেশ ডলার প্রত্যাখ্যান করে তেলের বিক্রি চালিয়ে এসেছে ‘ইউয়ান’-এর মাধ্যমে। এই বিশেষ ক্ষেত্রে বামপন্থী ভেনেজুয়েলা হোয়াইট হাউসের হম্বিতম্বি মেনে নেয়নি। কিন্তু ডলার, বা আরও স্পষ্ট করে বললে, পেট্রোডলার-ই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আশা-ভরসা। যদি ‘ইউরো’-‘রুবেল’-‘ইউয়ান’ পেট্রলের বেচাকেনার ক্ষেত্রে ডলারকে পুরোপুরি হটিয়ে দেয়, তাহলে তো ভয়াবহ বিপদ ঘনিয়ে আসতে বাধ্য। তাই ওয়াশিংটনের নিদান– একমাত্র ডলারের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে তেলের কেনাবেচা চলবে। অর্থাৎ প্রতিটি ক্রেতা-দেশ ডলারের জন্য হঁাকুপঁাকু করবে এবং তাদের ক্ষুধা মেটানোর জন্য মার্কিনি-কর্তারা অগুনতি ডলার চাপিয়ে দেশের সমৃদ্ধি অটুট রাখবেন। এ এক নতুন ধরনের মুদ্রাসর্বস্ব অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যবাদ।
ভেনেজুয়েলা যখন মার্কিনি চাপ অবজ্ঞা করল, তখনই নেমে এল আঘাত। তারপরেই ওয়াশিংটন ঘোষণা করেছে যে, তাদের সাতটি তেল সংস্থা শুধু উত্তোলন ও উৎপাদন নয়, সে-দেশের তেলের বাণিজ্যও নিয়ন্ত্রণ করবে। স্বভাবতই চিন ক্ষিপ্ত, কারণ তার ইউয়ানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। রাশিয়াও
উদ্বিগ্ন যেহেতু তার তেলের ক্রেতারাও পেট্রোডলারের মুখাপেক্ষী নয়।
এই উন্মুক্ত জোরজবরদস্তি শুরু হয় সেই ১৯৪৭ সালে। দূরদর্শী ও ধুরন্ধর মার্কিন কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জার আগেই বুঝেছিলেন– পণ্য হিসাবে পেট্রলের অপরিসীম গুরুত্ব। সৌদি আরবের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পন্ন করেন, যার নির্যাস হল, ‘তোমাদের তেল এবং মধ্যপ্রাচে্যর অন্যান্য দেশের তেল কেনাবেচা হবে শুধুমাত্র ডলারের বিনিময়ে। ওই ডলারই পেট্রোডলার এবং প্রতিদানে আমরা তোমাদের পূর্ণ শতাংশ সামরিক নিরাপত্ত দেব।’ এই পোষণ-নীতি সৌদি আরবের বাদশাগণ হাসি মুখে স্বীকার করে নেন তখন, গত বছরেও তঁারা সর্বাধিক পরিমাণে তেল কিনেছেন মার্কিনিদের থেকে। অর্থাৎ, পারস্পরিক পিঠ-চুলকানি অটুট ও অম্লান। তবে বর্তমানে সৌদি আরবকেও কিঞ্চিৎ বেসুরো শোনাচ্ছে যেন!
মধ্যপ্রাচ্যে প্রথমে স্পর্ধা দেখান বদমেজাজি সাদ্দাম হুসেন। ২০০০ সালে ইরাকের সর্বময় নেতা ঘোষণা করেন যে, তিনি তেল বেচবেন ইউরোর মাধ্যমে, ডলারে নয়। যখন চোখরাঙানিতে কাজ হল না, তখন ওয়াশিংটন জানাল যে, দুরাচারী সাদ্দাম বিশ্বের ত্রাস, কারণ ইরাকের মাটির তলায় সাদ্দাম থরে-থরে গণধ্বংসী আয়ুধ বা ‘weapons for mass destruction’ লুকিয়ে রেখেছেন। ইরাককে শায়েস্তা করার জন্য ওয়াশিংটন ‘ন্যাটো’-র সঙ্গীসাথীদের অাবেদন জানায়।
কিন্তু জার্মানি বেঁকে বসল। আমি, বার্লিনে, সেই সাংবাদিক সম্মেলনে ছিলাম– যেখানে পশ্চিম জার্মানির ‘সবুজ দল’-এর নেতা জোশকা ফিশার সরাসরি তঁার মার্কিনি সহযোগীকে বলেন, ‘আপনি ইরাকের সমরাস্ত্র সম্ভারের প্রমাণ দেখান। আপনার একটি অভিযোগও সত্য বলে মানছি না।’ যাই হোক, হাল্লা নিজেই যুদ্ধে গেল। কিসিঞ্জার পরে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘চির মিত্র জার্মানিও সঙ্গ দিল না!’ যোগ্য জবাব দিয়েছিলেন গুন্টার গ্রাস। তিনি বলেছিলেন, ‘বুশ জুনিয়র ও তঁার সঙ্গী ডোনাল্ড রামসফেল্ডের জন্য নুরেমবার্গের বিচার প্রক্রিয়ার নতুন সংস্করণ চাই। এরা নাৎসি অপরাধীর সঙ্গে তুলনীয়।’
যাই হোক, স্বৈরাচারী ও অবাধ্য সাদ্দামকে মৃতু্যদণ্ড দেওয়া হল। কিন্তু আরও জঘন্য স্বৈরচারীরা বহাল তবিয়তে বেঁচে রইলেন! এই স্বৈরাচারীরা অপাপবিদ্ধ, যেহেতু এঁরা হোয়াইট হাউসের অনুগত ও মার্কিন ভূরাজনীতির পরম দোসর। অর্থাৎ তুমি স্বৈরাচারী হতে পারো, কিন্তু সেক্ষেত্রে অানুগত্য প্রদর্শন করতে হবে। বহুকথিত অাঙ্কল স্যামের গণতান্ত্রিক আদর্শের উপাসনা চুলোয় যাক!
ইরাকে ‘কার্পেট বম্বিং’ শেষ হওয়ার কয়েক মাস পরে ঠেঁাটকাটা এবং কিঞ্চিৎ বামঘেঁষা জার্মানির চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রোয়েডার জিজ্ঞেস করেছিলেন প্রেসিডেন্ট বুশকে– ‘গণধ্বংসী রাসায়নিক মারণাস্ত্র তো পেলেন না! তাও ইরাক আক্রমণ করলেন কেন?’ উত্তরে ‘পেট্রোডলার’ শব্দ উচ্চারণ না-করে বুশ জুনিয়র তঁার মার্কিনি উচ্চারণে বলেছিলেন– “গ্যাডের (‘গড’ বা ‘God’-এর পরিবর্তে ‘গ্যাড’ বা ‘Gad’) সঙ্গে আমার কথা হয় মাঝেমধে্য, তিনিই নির্দেশ দিয়েছিলেন।” আর-একজন প্রাতঃস্মরণীয় রাজনীতিবিদের মতো বুশ জুনিয়রও থেকে-থেকে তঁার প্রভুর সঙ্গে সংলাপে প্রবৃত্ত হতেন!
সাদ্দামের পরিণতি থেকে অবশ্য মুয়াম্মার গাদ্দাফি শিক্ষাগ্রহণ করলেন না। ইসলামিক প্রতিবিশ্বের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং নিঃসন্দেহে স্বৈরাচারী একনায়ক লিবিয়ার এই রাষ্ট্রপ্রধান ২০০৯ সালে ঘোষণা করে বসলেন– এবার থেকে আফ্রিকায় তেল কেনাবেচা হবে সোনা-সমর্থিত মুদ্রা ‘গোল্ড দিনার’-এ। তখন কিন্তু ডেমোক্র্যাট বিল ক্লিনটন মার্কিনি মসনদে। কালবিলম্ব না করে, মিত্র ‘ন্যাটো’-র সহযোগিতায় অবাধ্য ও দাম্ভিক গদ্দাফিকে আক্রমণ করা হল। ভয়াবহ বিমানাঘাত। ২০১১ সালে তঁাকে হত্যা করা হয়, এবং সবকিছু ঘটে যাওয়ার পর বিজয়ী ক্লিনটন ক্যামেরার সামনে দঁাড়িয়ে হাসতে হাসতে বলেন– ‘আমরা এলাম, আমরা দেখলাম, সে মরল।’ অর্থাৎ পেট্রোডলারের পরিবর্তে গোল্ড দিনারের প্রবর্তনের সংকল্প এই পরিণতির জন্য দায়ী। ভাগ্যিস, মাদুরোকে এখনও হত্যা করা হয়নি!
তবে এই মারণযন্ত্রের পরেও কি শেষরক্ষা হবে? বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অমিত ভাদুড়ী বলেছেন, ‘Petrodollar is dying.’ পেট্রোডলার ধুঁকছে। রাশিয়া রুবেলের সাহাযে্য তেল বিক্রি করছে অবাধে। ইরান তার নিজস্ব মুদ্রায়। চিন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইউয়ানকে ব্যবহার করছে নির্দ্বিধায়। ‘ব্রিক্স’-এর অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোও বিকল্প-সন্ধানে তৎপর। একমাত্র নয়াদিল্লির মার্কিনি তোষণই ব্রিক্স গোষ্ঠীর ভিতরে অসংহতি সৃষ্টি করেছে।
অন্যভাবে বললে, ট্রাম্প এবং তঁার সঙ্গীসাথীরা যত বেপরোয়া হওয়ার চেষ্টা করবেন, বিশ্বজুড়ে ‘বিকল্প’ ব্যবস্থার সন্ধান এবং প্রতিরোধ তত বৃদ্ধি পাবে। মার্কিনি মরণকামড় আর বেশি দিন বিশ্বকে বিক্ষত করতে পারবে না। তার উপর যদি নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রত্যাশী ট্রাম্প সাহেব গ্রিনল্যান্ডের উপর অভিযান চালান– তাহলে একমাত্র দোসর পশ্চিম এবং পূর্ব ইউরোপও এই অভিযান মেনে নেবে না। প্রকাশে্য না হলেও আড়ালে ও আবডালে ব্রিটেন-ফ্রান্স-জার্মানি ট্রাম্পের নীতি ও কর্মকাণ্ডকে শাপশাপান্ত করতে ছাড়বে না। তারাও যে চায় পেট্রোডলারকে পর্যুদস্ত করতে!
(মতামত নিজস্ব)
