'এআই'-সৃষ্ট প্রয়াত বামপন্থী নেতার ভোট-ভাষণে প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। আখেরে এটি ভুয়ো, অসত্য। যদি কেউ তা না বোঝে?
মহানায়কের বিভিন্ন পুরনো চলচ্চিত্রের ক্লিপ ও সংলাপকে নোঙর করে, 'এআই' ও 'ভিএফএক্স'-এর প্রয়োগ নৈপুণ্যে, উত্তমকুমারকে পুনরায় সিনেমার পর্দায় ফিরিয়ে এনেছিলেন পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়। সেই 'অতি উত্তম' (২০২৪) সিনেমাটি কার কেমন লেগেছে, সে-প্রশ্ন সরিয়ে রেখেও বলা যায়, এই চেষ্টায় অভিনবত্ব ছিল। আর, পুরো বিষয়টি যেহেতু চালিত হয়েছিল বিনোদনের খাতে, তাই অহিতকর ফলাফলের সম্ভাবনা প্রায় ছিল না বললেই চলে।
কিন্তু খবরে প্রকাশ, দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক সময়ের দাপুটে সিপিএম নেতা শান্তিময় ভট্টাচার্য 'ফিরে' এসেছেন 'এআই 'পুষ্ট প্রয়োগকৌশলে ভর করে, এবং ভোট-বাজারে বক্তব্য রেখেছেন দলের স্বার্থে, বিষয়টি অতএব আর শুকনো বিনোদনের গণ্ডিতে আটকে নেই, হয়ে উঠেছে অশিষ্ট জনসংযোগের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি রিলে বলতে শোনা যায় শান্তিময় ভট্টাচার্যকে, ''ওরা প্যাটন কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে। শালিমার কারখানা ঝুঁকছে। ডাবর কারখানায় আজ প্রায় সবাই ঠিকা শ্রমিক। ওরা শ্রমিকের অধিকার কেড়ে নিতে চাইছে। এর বিরুদ্ধে লড়তে হবে। আর এই লড়াইয়ের সাথী পারমিতা। ওঁকে কিন্তু জেতাতেই হবে।'' এখানে বলার, 'পারমিতা' অর্থে পারমিতা দাশগুপ্ত, যিনি সোনারপুর দক্ষিণে সিপিএমের এ-বছরের প্রার্থী।
সিপিএম নেতা শান্তিময় ভট্টাচার্য 'ফিরে' এসেছেন 'এআই 'পুষ্ট প্রয়োগকৌশলে ভর করে, এবং ভোট-বাজারে বক্তব্য রেখেছেন দলের স্বার্থে, বিষয়টি অতএব আর শুকনো বিনোদনের গণ্ডিতে আটকে নেই, হয়ে উঠেছে অশিষ্ট জনসংযোগের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
আর 'ওরা' অর্থে যে রিলে-আবির্ভূত ওই 'শান্তিময় ভট্টাচার্য' তথাকথিত সাম্রাজ্যবাদী, শ্রমিকস্বার্থ-বিরোধী দক্ষিণপন্থী শক্তির দিকে আঙুল তুলছেন, তা বলে দিতে হয় না নতুন করে। কিন্তু যে-জনস্তরের উদ্দেশে এই এআই-নির্মিত 'শান্তিময় ভট্টাচার্য' জনমুখী বিবৃতিটি জ্ঞাপন করলেন, সেই জনমানস যদি বুঝতে না পারে এটি 'তৈরি' করা, সাজানো, সত্যিকারের নয়, তাহলে ফল কেমন হবে? এর দায়ই-বা কে নেবে? এআই এমনই শক্তিশালী এখন, দর্শন ও শ্রবেণেন্দ্রিয়র বিভ্রম ঘটিয়ে মনের মানচিত্র বদলে দিতে পারে। এত করে 'অসত্য' প্রাধান্য পায়। এত করে 'ভুয়ো' তথ্যের মালিকানা ফুলেফেঁপে ওঠে। ছড়িয়ে পড়ে অসেদ্ধ, অসিদ্ধ ভাবনার ঢেলা। 'অর্ধসত্য', সম্পূর্ণ 'মিথ্যা'র চেয়েও ভয়ানক। কেননা, সেখানে 'চেনা' ও 'অচেনা' দুই বৃত্তের জলের ঢেউ মিশে থাকে। বাস্তব জ্ঞান থেকে সামান্য টাল খেলেই 'এআই' দ্বারা সৃষ্ট শান্তিময় ভট্টাচার্যর বিজ্ঞাপনী আহ্বানটি মুহূর্তের ব্যবধানে সমাজমাধ্যম বাহিত হয়ে বহু মানুষের রাজনৈতিক চেতনাকে প্রভাবিত করতে শুরু করবে। তিনি যে বিগত, এটি বিস্মৃত হলেই, সময়ের হিসাব ভুলে, দলীয় প্রচারের অ্যাজেন্ডার সঙ্গে আপন মত মিলিয়ে ফেলবে হয়তো বহু মানুষ।
এ ধরনের উদ্যোগ যে কোনও রাজনৈতিক দল নিলেই তার প্রতিফল বিষবৎ হতে বাধ্য। বামেরা সম্যক সংযোগ ও মানুষের সঙ্গে মানুষের প্রত্যক্ষ মেলামেশার ফলে নির্মিত রাজনৈতিক বয়ানে বিশ্বাস করে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তি তাদের প্রচারের অঙ্গ হয়ে উঠবে, এতে অন্যায় ও আশ্চর্য নেই। কিন্তু কূটবুদ্ধির প্রয়োগে প্রযুক্তিকে ইতিহাসের কালানুক্রম ঘুচিয়ে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করলে- কমরেড, সমালোচনা যে হবেই!
