স্মৃৃতিকে চুম্বকের সঙ্গে তুলনা করার মধ্যে দোষ নেই, কারণ স্মৃতিও সুযোগ পেলে স্যাটাস্যাট যেভাবে চুম্বক আলপিন টানে, সেরকম করে পুরনো মেমরির ভল্ট ভেদ করে লোহালক্কড় টেনে আনে দরকার মতো। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলার ভোটপ্রচারে এসে ঝালমুড়ি কিনেছেন খবরটি জেনে, আমাদেরও মনে পড়ল, একটি লেখার শিরোনাম ‘চানাচুরতন্ত্র’। লেখক: শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। একটি জনপ্রিয় ওয়েব প্ল্যাটফর্ম দেখাচ্ছে ফিচারধর্মী এ গদ্যটি শেষবার ‘আপডেট’ করা হয়েছে ২০১৭ সালের এপ্রিলে। অর্থাৎ লেখাটি ৯ বছরের পুরনো। কী বলছে সেই গদ্য?
শীর্ষেন্দুবাবুর ভাষায়, ‘চানাচুরের সঙ্গে আমি ভারতীয় গণতন্ত্রের বেশ মিল পাই।’ কেন? চানাচুরে ঝুরিভাজার বগলের তলা দিয়ে ডালমুট উঁকি মারে, বাদামের গা ঘেঁষে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে কিশমিশ। আধখানা কাজুর কোলে নিশ্চিন্তে বসে থাকে পাপড়ি। গাঠিয়ার সঙ্গে অনবরত পাঞ্জা কষে কাঠিভাজা। ফলে, তৈরি হয় বিচিত্র স্বাদ। টক, ঝাল, মিষ্টি। কখনও হিংয়ের গন্ধ উত্তাপ ছড়ায়। ভারতীয় সমাজও তো চানাচুরের মতো। কেউ হিন্দু, কেউ মুসলমান, কেউ জৈন, কেউ বৌদ্ধ বা শিখ। ভাগাভাগি কেবল ধর্মপরিচয়ে নেই। আঞ্চলিক ভাষা-পরিচয়েও কত না তফাত ও বিপুলতা। কেউ তামিল, কেউ অসমিয়া, কেউ মালয়ালি ও কেউ বাঙালি। রবি ঠাকুরের ভাষায়, এত বিভাজন নিয়েও, এত ক্যাটাগরি নিয়েও, ভাতের মাটিতে এরা ‘এক দেহে হল লীন’।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ভাষায়, ‘চানাচুরের সঙ্গে আমি ভারতীয় গণতন্ত্রের বেশ মিল পাই।’ কেন? চানাচুরে ঝুরিভাজার বগলের তলা দিয়ে ডালমুট উঁকি মারে, বাদামের গা ঘেঁষে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে কিশমিশ। আধখানা কাজুর কোলে নিশ্চিন্তে বসে থাকে পাপড়ি।
কিন্তু কেউ কারও বিশেষত্ব ও স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দেয়নি। চানাচুরে যেমন কাজু ডালমুট হয়ে যায় না, বা পাপড়ি হয়ে যায় না কাঠিভাজা– তেমনই ভারতের সংবিধান এ দেশের প্রতিটি ধর্মসম্প্রদায় ও ভাষাভাষীর মানুষকে নিজস্বতা বজায় নিয়ে চলতে উৎসাহিত করেছে, দিয়েছে রক্ষাকবচ। চানাচুরকে কেউ যদি মিক্সিতে ফেলে ঘুরিয়ে দেয়, সে হবে আহাম্মকি কাজ। কারণ, চানাচুর একমাত্রিক, একঢালা বস্তু নয়। ভারতের গণতন্ত্রও নয় একঢালা বিধি-বন্দোবস্তের উপাসক।
চানাচুরে যেমন কাজু ডালমুট হয়ে যায় না, বা পাপড়ি হয়ে যায় না কাঠিভাজা– তেমনই ভারতের সংবিধান এ দেশের প্রতিটি ধর্মসম্প্রদায় ও ভাষাভাষীর মানুষকে নিজস্বতা বজায় নিয়ে চলতে উৎসাহিত করেছে, দিয়েছে রক্ষাকবচ।
চানাচুরের মতো ঝালমুড়িও কিন্তু বিচিত্র স্বাদের একটি জিভে জল আনা খাবার। সেখানে মুড়ি আছে, চানাচুর আছে, বাদাম আছে, ছোলা-মটর (ভাজা বা সেদ্ধ বা জলে ভেজানো), তেলমশলা আছে, লঙ্কা আছে, গাঠিয়া আছে, রয়েছে আরও অনেক কিছু। কিন্তু কেউ কারও মধ্যে বিলীন হয়ে যায় না। আলাদা করে জেগে থাকে ও নিজস্ব স্বাদের সঞ্চার ঘটায়। প্রধানমন্ত্রী সহাস্যে ঝালমুড়ি কিনলেন, ঝালমুড়ি ভাগ করে নিলেন, কিন্তু ঝালমুড়ির অন্তর্নিহিত বার্তাটি কি উপলব্ধি করতে পারলেন?
ঝালমুড়ি, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ব্যাখ্যানুসারে, ‘একঢালা’ নয়। বহুস্তরে, বহুস্বাদে, বহুবিভঙ্গে ঝালমুড়ি আমাদের নোলাকে প্রবর্ধিত করে। আমাদের দেশেও তো এই ‘ঝালমুড়িতন্ত্র’ থাকা উচিত। ভারতের গণতন্ত্রর আদি মডেল তো এভাবেই নির্মিত। প্রধানমন্ত্রী যদি ঝালমুড়ি খেয়ে প্রীত হন, তাহলে বিভাজনমুখী ও একঢালা সমাজব্যবস্থায় তাঁর তো খুশি হওয়ার কথা নয়। ভাষা থেকে ভোট– দেশের ছাঁদে চরম একপেশেমি আনা ও ঝালমুড়িকে ভালোবাসা– কিছুতেই এক হতে পারে না।
