shono
Advertisement
Mamata Banerjee

যুদ্ধ অর্থনীতি বনাম শিল্পবান্ধব বাজার, মমতার নীতিই দেশের বেকারত্ব নির্মূলের পথ

কেন্দ্রীয় সরকার চায় গৃহযুদ্ধ বা বহির্যুদ্ধকেন্দ্রিক অর্থনীতি, আর সে-পথে রোজগার সৃষ্টি করতে। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লক্ষ্য স্থিতিশীল, দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের পথ।
Published By: Amit Kumar DasPosted: 07:33 PM Apr 25, 2026Updated: 07:33 PM Apr 25, 2026

কেন্দ্রীয় সরকার চায় গৃহযুদ্ধ বা বহির্যুদ্ধকেন্দ্রিক অর্থনীতি, আর সে-পথে রোজগার সৃষ্টি করতে। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লক্ষ্য স্থিতিশীল, দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের পথ। ক্ষুদ্র-ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য বাজার তৈরি করা। লিখছেন: বন্দনা মুখোপাধ্যায়

Advertisement

২০২৬ সালের বিধানসভা ভোটে এ রাজ্যের মানুষ বিজেপিকে এমনভাবেই পরাজিত করতে চাইছে– যাতে পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়নের যে-নীতি নিয়ে চলছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তা-ই ২০২৯ সালে দেশের বেকারত্ব নির্মূলের ‘বিকল্প নীতি’ হয়ে ওঠে। এখন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শিল্পায়নের দু’টি নীতি– মাঝামাঝি নেই কিছুই। হয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির যুদ্ধ-অর্থনীতি, নয়তো মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিল্পায়নের অর্থনীতি– দেশকে কোনও একটি বেছে নিতে হবে। শিল্পায়নের প্রথম ধাপ ও প্রাথমিক শর্ত হল– জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করা, বা ‘বাজার’ সৃষ্টি করা, যা ছাড়া বিনিয়োগ স্রেফ ‘জুমলা’, হাওয়া দিয়ে বেড়ালকে বাঘ বানানোর চেষ্টা।

স্রেফ অতি সীমিত, অতি ধনী ক্রেতার জন্য বিলাস-ব্যবসার মধ্য দিয়ে বা ফাটকাবাজি করে শেয়ার বাজারে প্রভাব-প্রতিপত্তি বজায় রাখার নামান্তর। আর সমাজের সর্বস্তর জুড়ে ‘বাজার’ তৈরির প্রাথমিক শর্তটি এ রাজ্যে আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং। এ রাজ্যে চতুর্থবার মুখ্যমন্ত্রী হয়ে, আর ২০২৯ সালে বিজেপিকে পরাজিত করার পরে, দেশের নেত্রী রূপে বাকি কাজ করতেও তিনি সক্ষম হবেন নিশ্চয়ই। সে উদ্দেশ্য পূরণ করতে এই ভোটে ৯১ লাখ ভোটাধিকার খোয়ানো সহ-নাগরিকের অপমানের জবাব দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলার মানুষ।

পশ্চিমবঙ্গে এক-একটি পরিবার মাসে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে পাচ্ছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা তৈরি হয়েছে, হচ্ছে। বিরাট বাজার তৈরি হচ্ছে পশ্চিমবাংলায়। বলা বাহুল্য, বিদেশি গাড়ি বা হিরের গয়না কেনার বাজার নয়। ‘বাজার’ মানে– ওষুধ, খাতা, লুঙ্গি, গেঞ্জি, ছাপা শাড়ি, দর্জিকে দিয়ে তৈরি করা পোশাক, চটি, বোরোলিন, ভ‌্যাসলিন, ফরসা হওয়ার ক্রিম, মাছ-মাংস, ডিম-ফল, ছাতা, চপ-আইসক্রিম-বিস্কুট, স্টিলের বাসন, ফসলের জন্য পর্যাপ্ত সার, বাল্‌ব, গ্যাস আভেন, সাইকেল, সস্তা মোবাইল, উচ্চশিক্ষার বই। আবার কখনও টাকা জমিয়ে সাবমার্সিবল্‌ পাম্প বা এমনকী, বাইক কেনার বাজার। ‘ক্রেতা’ তৈরি হচ্ছে মানেই শিল্পায়নের ভিত্তি তৈরি হচ্ছে।

রেল, যা দেশের অন্যতম বৃহৎ রোজগারের ক্ষেত্র, সেখানে ৫০% পদ রদ করে দেওয়া হয়েছে। তারপরেও ১.৫ লাখ পদ খালি। সেনাতেও প্রায় ১.১ লাখ পদ খালি। গান্ধীজির নাম সরিয়ে রামের নামে গ্রামীণ রোজগারের সুযোগ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প মন্ত্রকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত (registered) ‘এমএসএমই’ (MSME)-র সংখ্যা ৫ কোটি ছাড়িয়েছে। তবে অসংগঠিত এবং অনিবন্ধিত ক্ষেত্র মিলিয়ে এই সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি। এই ক্ষেত্রটি ভারতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে। ভারতের মোট জিডিপি-র প্রায় ৩০% আসে এই ‘এমএসএমই’ খাত থেকে। ভারতের মোট রফতানির প্রায় ৪০-৪৫% এই ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পেরা অবদান রাখে। ফলে, অবাক হওয়ার কারণ নেই যে, পশ্চিমবঙ্গ ‘এমএসএমই’ সংখ্যার (‘এনএসএসও’-র তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯০ লাখ) দিক থেকে ভারতের শীর্ষস্থানীয় রাজ্যগুলির মধ্য একটি। কেন্দ্র সরকারের যদি সদিচ্ছা থাকত, তবে মোদিজির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, বছরে ২ কোটির মধ্যে এই ক্ষুদ্র-ছোট ও মাঝারি ক্ষেত্রে বছরে ১ কোটি চাকরি দিলেও ৫ কোটি মানুষের সংখ্যাটি ১০ বছরে বেড়ে ১৫ কোটি হতে পারত।

নয়ডার আন্দোলনরত শ্রমিকরা মাসে ন্যূনতম ২০ হাজার টাকা বেতন চেয়েছেন, সেই টাকা বেতন দিয়ে যদি এই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলি লোক নিয়োগ করে, তবে তাদের ব্যবসা বাড়বে, বাড়বে দেশের জিডিপি, কমবে বেকারত্ব, এবং বাড়বে ক্রয়ক্ষমতা। যদিও এটা ঠিক যে কোনও ক্ষুদ্র বা মাঝারি মালিকের পক্ষেই প্রতি মাসে এত টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে কেন্দ্রীয় সরকারকে অর্ধেক মাইনের দায় নিতে হবে, ভরতুকি দিতে হবে ‘এমএসএমই’-কে। ‘এমএসএমই’-র ভরতুকির জন্য সরকারের খরচ হত বছরে সোয়া ১ লাখ কোটি, আর বাকি দিয়ে বড় শিল্পের বিনিয়োগ। আসলে, নরেন্দ্র মোদি তো শিল্পায়নের প্রথম কাজটাই তো করেননি, ‘বাজার’ তৈরি করেননি, ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা শূন্যে এনে ঠেকিয়েছেন। সুস্থিতির অর্থনীতি আসলে কেন্দ্রের না-পসন্দ। প্রধানমন্ত্রীর জুমলা পথ হল: যুদ্ধ অর্থনীতি-ভিত্তিক শিল্পায়ন। হিমন্ত বিশ্বশর্মা প্রায়ই বেকার ও গরিব দলিত, এসসি, ওবিসি, আদিবাসী হিন্দুদের লাঠি-বন্দুক, তরোয়াল তুলে মুসলিম মারার ডাক দিয়ে থাকেন। যেভাবে সাভারকার, গোলওয়ালকার, নাথুরাম গডসে তাতিয়েছিলেন ১৯৪৭ সালে। অন্যদিকে, মোদি সরকার রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠায় দেশের বেকারদের, তাদের কফিনবন্দি দেহ ফিরে আসে স্বদেশে।

ভারতের মোট জিডিপি-র প্রায় ৩০% আসে এই ‘এমএসএমই’ খাত থেকে। ভারতের মোট রফতানির প্রায় ৪০-৪৫% এই ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্পেরা অবদান রাখে। ফলে, অবাক হওয়ার কারণ নেই যে, পশ্চিমবঙ্গ ‘এমএসএমই’ সংখ্যার (‘এনএসএসও’-র তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৯০ লাখ) দিক থেকে ভারতের শীর্ষস্থানীয় রাজ্যগুলির মধ্য একটি।

ক্ষমতায় বসার পরমুহূর্ত থেকে প্রধানমন্ত্রী প্রতিষ্ঠিত সব শিল্পকে ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। তিনি চান এক বিরাট বেকার-বাহিনি যাদের দাঙ্গা, যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধে, ড্রাগ-অস্ত্র-নারীপাচারে অনায়াসে ব্যবহার করা যাবে, মোদি-ছাপ ধর্মের বড়ি গিলিয়ে। রেল, যা দেশের অন্যতম বৃহৎ রোজগারের ক্ষেত্র, সেখানে ৫০% পদ রদ করে দেওয়া হয়েছে। তারপরেও ১.৫ লাখ পদ খালি। সেনাতেও প্রায় ১.১ লাখ পদ খালি। গান্ধীজির নাম সরিয়ে রামের নামে গ্রামীণ রোজগারের সুযোগ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আদানি, আম্বানি, টাটা বা বিদেশি কোম্পানি কেউ-ই চাকরি দিচ্ছে না, প্রত্যেকেই চাকরি খাচ্ছে। তা কখনও করোনার অজুহাতে, কখনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অজুহাতে, অথচ তাদের বায়না যে তারা কোনও কর দেবেন না, আর সেটাও মেনে নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রপ্রধান আর বহুজাতিকদের অন্তরঙ্গ সম্পর্কের কামিনী-কাঞ্চনের দিকটা যদিও অজানা, ইডি-সিবিআই তো আর সেই তদন্ত করেনি! এপস্টিন তথ্য সেই সম্পর্কের কিছু হদিশ দিয়েছে মাত্র।

বিশ্বজুড়েই বিনিয়োগের সর্ববৃহৎ ক্ষেত্র হল অস্ত্র ও যুদ্ধব্যবসা, আর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিনিয়োগ হয় মাদক ও পর্নোগ্রাফিতে। নরেন্দ্র মোদির ফরমুলা হল: একটি অস্থির গৃহযুদ্ধ বা বহির্যুদ্ধকেন্দ্রিক অর্থনীতি আর সেই পথে রোজগার সৃষ্টি। বেকার-সমস্যা বিদীর্ণ জার্মানিতে ‘ভার্সাই চুক্তি’ বাতিল করে হিটলার সাময়িকভাবে হলেও ১০০% চাকরি দিয়েছিলেন। বহু বেকারকে আগে ইহুদি ধর্মপরিচয়ে হত্যা করে বেকার সংখ্যা কমিয়েছিলেন। তারপরেও বহু ইহুদিকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বেগার খাটিয়ে সেই সংখ্যা আরও কমিয়েছিলেন। যুদ্ধ-অর্থনীতির দৌলতে মৃত ইস্পাত কারখানার চিমনি দিয়ে আবার ধোঁয়া উড়েছিল, সেখানে তখন শুধুই সঁাজোয়া গাড়ির বডি উৎপাদন হতে থাকে। রাবার কোম্পানিতে তৈরি হচ্ছিল যুদ্ধগাড়ির টায়ার। কেমিক্যাল কোম্পানিতে গ্যাস-চেম্বারের গ্যাস। এসব কারখানায় আর্য-রক্তের বেকাররা চাকরি পেত। আর বাকিরা মরিয়া হয়ে ও পেটের জ্বালায় আর ইহুদি-ঘৃণায় বশীভূত হয়ে পোল্যান্ড, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও রাশিয়া দখল করতে যুদ্ধে নাম লিখিয়েছিল। মেয়েদের জন্য ছিল সৈন্যদের মনোরঞ্জনের চাকরি। এই হল যুদ্ধ-অর্থনীতিতে বেকার সমস্যা সমাধানে যুগে-যুগে ফ্যাসিস্টদের প্রকল্প।

২০২৯ সালে কেন্দ্রীয় সরকার কোন নীতিতে শিল্পায়ন করবে? ‘বাজার’ তৈরির শিল্পায়ন না কি দাঙ্গা অস্ত্র, ড্রাগ যুদ্ধের শিল্পায়ন? স্থিতিশীল, দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের প্রথম কাজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করছেন। পশ্চিমবঙ্গের সাফল্যের একটি কাহিনি দিয়েই তাই আলোচনা শেষ করি। বঙ্গের ‘এমএসএমই’ খাতের মাধ্যমে স্কুল ইউনিফর্ম তৈরি একটি নীরব বিপ্লব রূপে পরিচিতি পেয়েছে। আগে রাজ্যের প্রায় ১ কোটিরও বেশি ছাত্রছাত্রীর জন্য প্রয়োজনীয় ইউনিফর্মের কাপড় আসত মূলত ভিনরাজ্য থেকে। ৮৫০ কোটি খরচ হত, এবং সেই টাকা চলে যেত মহারাষ্ট্র বা গুজরাটে।

২০২৯ সালে কেন্দ্রীয় সরকার কোন নীতিতে শিল্পায়ন করবে? ‘বাজার’ তৈরির শিল্পায়ন না কি দাঙ্গা অস্ত্র, ড্রাগ যুদ্ধের শিল্পায়ন? স্থিতিশীল, দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের প্রথম কাজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করছেন।

আগে প্রতি বছর কয়েক কোটি মিটার কাপড় ভিনরাজ্য থেকে কিনতে হত। এখন ‘তন্তুজ’ ও ‘মঞ্জুষা’-র মতো সরকারি সংস্থার মাধ্যমে রাজ্যের নিজস্ব ‘এমএসএমই’ এবং পাওয়ার লুম ক্লাস্টারসমূহ আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে এই কাপড় উৎপাদন করছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। নদিয়া, পূর্ব বর্ধমান এবং উত্তর ২৪ পরগনার শয়ে-শয়ে তাঁতি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সরাসরি কাজ পাচ্ছেন। রাজ্যজুড়ে ৩.৫ লক্ষেরও বেশি গ্রামীণ মহিলা, যাঁরা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত, তাঁরা এই ইউনিফর্ম সেলাইয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। এরপরেও বলব ‘বাজার’ তৈরি নয়?

(মতামত নিজস্ব)

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement