সহিষ্ণুতা, সংবেদনা, মাঙ্গলিক চেতনা- এই গুণগুলি হার-জিতের যুদ্ধে যেন লুণ্ঠিত ও নাশিত না হয়, শেষ পর্বের ভোটে শপথ নিক পশ্চিমবঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গে আজ দ্বিতীয় ও শেষ পর্বের ভোট। তারপর ৪ মে পর্যন্ত রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা। সেদিন সকাল থেকে শুরু হবে ভোটগণনা। ধীরে ধীরে উন্মোচিত হবে ভোটের ফলাফল। জানা যাবে কোন দল বসল শাসকের আসনে।
প্রচার চলেছে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত। যত বেলা বেড়েছে, বেড়েছে তর্জন-গর্জন। শুধু বাক্যের আক্রমণ-প্রতিআক্রমণ নয়। গাড়ির কাচ ভাঙা থেকে শরীরী ঘাত-প্রতিঘাত থেকে হিংসাত্মক মারামারি থেকে অস্ত্রের ব্যবহার থেকে রক্তপাত, ভোটের প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আক্রোশের বিচিত্র রূপ প্রকাশিত হয়েছে। বিবিধ উপায় ঘৃণার বীজ বপণ ও চাষ করা হয়েছে আম জনতার মনন ও মনস্তত্বে।
এই পরিস্থিতিতে আপামর পশ্চিমবঙ্গবাসীর মনে একটি প্রশ্ন ও আতঙ্ক ঘনিয়ে উঠেছে: এই রাজ্যে বহু বছর পরে প্রথম পর্বের ভোট যেমন শান্তিতে ঘটেছে, দ্বিতীয় পর্বেও সেই ছবিটি বজায় থাকবে তো? রক্ষা হবে তো গণতন্ত্রের মান-মর্যাদা? না কি, দ্বিতীয় পর্বের ভোটে ফিরে আসবে আমাদের পরিচিত ছবি: নাশ, হত্যা, হিংসা, রক্তপাত, প্রসারিত ধ্বংসলীলা, প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা, আতঙ্ক?
ভোট যখন হয়েছে, অবধারিতভাবে একদল জিতবে, একদল হারবে। জেতার আনন্দ, উল্লাস, উৎসব যেমন হবে, হারের বেদনা, হতাশা, দুঃখও তেমনই লুকনো যাবে না। কিন্তু এই বিরোধাভাসের মধ্যে একটু জরুরি গণতান্ত্রিক শর্ত যেন আমরা মনে রাখি। সেই শর্তটি হল: সর্বপ্রকার প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার বর্জন, বিজয় ও পরাজয়ের মধ্যে ভারসাম্য হরিয়ে আমরা যেন এমন কিছু না করে বসি, যা সমাজ, সংসার এবং স্বাভাবিক জীবন প্রবাহের পক্ষে ক্ষতিকর। সহিষ্ণুতা, সংবেদনা, মাঙ্গলিক চেতনা, এই তিনটি মানবিক গুণ ভোটের হার-জিতের যুদ্ধে যেন লুষ্ঠিত ও নাশিত না হয়। মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রের দর্শন গড়ে উঠছে সহনশীলতা, উদারতা এবং ভালোবাসার উপর। হিংসার পরিবেশে গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘটে।
আপামর পশ্চিমবঙ্গবাসীর মনে একটি প্রশ্ন ও আতঙ্ক ঘনিয়ে উঠেছে: এই রাজ্যে বহু বছর পরে প্রথম পর্বের ভোট যেমন শান্তিতে ঘটেছে, দ্বিতীয় পর্বেও সেই ছবিটি বজায় থাকবে তো?
এই প্রশ্ন-পরিপ্রশ্ন ও প্রসারিত অনিশ্চয়তার মধ্যে একটি আশাব্যঞ্জক সুসংবাদ হল, আলিপুর আবহাওয়া দফতরের এই পূর্বাভাস: আজ ভোটের দিন কলকাতা এবং দক্ষিণবঙ্গের সর্বত্র ঝড় বৃষ্টি হবে। অর্থাৎ, কালবৈশাখী উপস্থিত। মনে হচ্ছে আগামী কয়েক দিন মেঘলা আকাশ, বৃষ্টি, এবং ঝোড়ো বাতাস গরমের তাপ কমাবে। ফলে কিছুটা প্রাকৃতিক আরাম আসবে বঙ্গের জীবনে। এই প্রবল হাওয়া ও বর্ষণ যে স্নিগ্ধতার আরাম আনবে বাংলার জীবনে, তা কি বাংলার রাজনীতির রণাঙ্গনে তাপমাত্রার পারদকেও কিছুটা নামিয়ে আনবে না?
একটিই প্রার্থনা এখন আমাদের প্রত্যেকের মনে, আমাদের সব রাজনৈতিক আক্রোশ, হুংকার, ঘৃণা এবং আঘাত-প্রত্যাঘাতের তাড়নার উপর বৃষ্টি যেন হয়ে ওঠে আকাশ থেকে ঝরে পড়া করুণাধারা, শান্তিজল। যেদিন ভোটের ফলাফল বেরবে, ৪ এপ্রিল, সেদিন যেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের 'যখন বৃষ্টি নামলো' কবিতার একটি পঙ্ক্তি প্রতিটি বাঙালিকে আচ্ছন্ন করে রাখে: ভারি ব্যাপক বৃষ্টি আমার বুকের মধ্যে ঝরে।
