পিটার মাগইয়ার। ডান-ঘেঁষা এক মধ্যপন্থী দল ‘টিসা পার্টি’-র নেতা, বয়স মধ্য চল্লিশের কোঠায়। গত ১৬ বছর বিরোধী পক্ষ ছিলেন। ক’দিন আগেই পুরোদস্তুর দক্ষিণপন্থী ‘ফিদেজ’ পার্টির (হাঙ্গেরীয় সিভিক অ্যালায়েন্স) খ্রিস্টান জাতীয়তাবাদী নেতা ভিক্টর অরবানের টানা ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটাতে সমর্থ হয়েছেন তিনি। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছেন। আর, তারপরই চক্ষু উন্মীলনকারী বিবৃতি পিটার মাগইয়ারের– ‘এর আগে কখনও গণতান্ত্রিক হাঙ্গেরির ইতিহাসে এত মানুষ ভোট দেয়নি আর কোনও একটি দলও এর আগে এমন জোরদার জনাদেশ পায়নি।’
হাঙ্গেরির (Hungary) ভোটের ভোটের ফলাফল বলছে– টিসা পার্টি আসন পেয়েছে ১৯৯ আসনবিশিষ্ট সংসদে ১৪১টি। পক্ষান্তরে, অরবানের দল জিতেছে ৫২টি আসনে। হাঙ্গেরির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হলে, আইনজীবী থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা, পিটার মাগইয়ার অরবান-জমানার বহু ‘জনবিরোধী’ আইনকে পালটে ফেলার সুযোগ পাবেন। অরবান-জমানার যেসব আইনের সম্পূর্ণ বদল সময়ের অপেক্ষা মাত্র, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে– শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি বিষয়ক নানা বিধি, এবং সেসব আইন, যেগুলি বিচার বিভাগ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করেছিল। পিটার মাগইয়ারের জয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে হাঙ্গেরির পুনরায় সম্পর্ক বন্ধনের অনুকুলে সবুজ সংকেতও বটে।
২০২৪ সালে টিসা পার্টিতে যোগ মাগইয়ারের। সে বছর ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে তাঁর এই যোগদান। দু'-বছর আগে, সেই নির্বাচনে তিনি জেতেন। তার আগে ফিদেজ পার্টির কর্মকর্তা ছিলেন। আটের দশকে হাঙ্গেরিকে সোভিয়েত-প্রভাব থেকে বাঁচানোর জন্য অরবানের লড়াই দ্বারা অনুপ্রাণিত হন।
বেশি দিন আগের কথা নয়। এই মাগইয়ার ছিলেন অরবানের অন্ধ সমর্থক। ২০২৪ সালে টিসা পার্টিতে যোগ দেন। ২০২৪ সালের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে তাঁর এই যোগদান। এবং দু’-বছর আগে, সেই নির্বাচনে তিনি জিতেছিলেন। তার আগে ফিদেজ পার্টির কর্মকর্তা ছিলেন। আটের দশকে হাঙ্গেরিকে সোভিয়েত-প্রভাব থেকে বাঁচানোর জন্য অরবানের যে-লড়াই, তার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। সেসব কথা প্রকাশ্যে জানাতে দ্বিধা করেননি। তীব্র রক্ষণশীল নেতা অববানের একটি ছবিও নাকি পিটারের শয়নকক্ষে ছিল।
২০১০ সালে হাঙ্গেরির ক্ষমতার আসে ফিদেজ পার্টি। তখন বিদেশমন্ত্রকে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেই দায়িত্ব পালনের অঙ্গ রূপইে পিটার মাগইয়ার ইউরোপীয় ইউনিয়নে হাঙ্গেরির কূটনৈতিক প্রতিনিধি দলেও জায়গা পান। ব্রাসেলসের কাজ মিটিয়ে হাঙ্গেরিতে প্রত্যাবর্তন ২০১৮ সালে, আর তারপরই অরবান প্রশাসনের নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাতে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। কিন্তু ছবি বদলে যায় বছর দুয়েক আগে। রাষ্ট্রপতির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে মার্জনা করা নিয়ে। তখন হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট ছিলেন কাতালিন নোভাক। শিশুদের যৌন নির্ঘাতনের দায়ে অভিযুক্ত একটি অনাথ আশ্রমের ডেপুটি ডিরেক্টরকে মার্জনা করে তাঁর শাস্তি মকুব করে দেন। সেই কেচ্ছায় জড়িয়েছিল পিটার মাগইয়ারের প্রাক্তন পত্নী জুডিত ভার্গার নামও। জুডিত, অরবান সরকারের, বিচার মন্ত্রকের দায়িত্বে ছিলেন। ওই যৌন কেলেঙ্কারির সুবাদে নোভাক ও ভাগা– দু’জনকেই পদত্যাগ করতে হয়। এর পর ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পিটার মাগইয়ার ফিদেশ পার্টি ত্যাগ করেন। ফাঁস করে দেন তাঁর স্ত্রী ভার্গার একটি অডিও ক্লিপ। তাতে শোনা গিয়েছিল, হাঙ্গেরি সরকার কীভাবে দুর্নীতির মামলা ধামাচাপা দিতে তৎপর, সেসব কথা। বুদাপেস্টের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্ক অরবান জমানায় তলানিতে ঠেকেছিল। তাই, মাগইয়ারের জয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নেও এখন স্বস্তির বাতাস।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অরবানের নীতিগত সংঘাত ক্রমশ বাড়ছিল। পুতিনের মুখ্য সহযোগীদের অন্যতম অরবান এই যুদ্ধের জন্য হামেশাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জেলেনস্কির ভূমিকাকে দোষারোপ করতেন। সাম্প্রতিক অতীতে কিয়েভের অর্থ সাহায্যার্থে প্রদত্ত ৯০ বিলিয়ন ইউরোর একটি আর্থিক সাহায্যও আটকে যায় অরবানের ভিটো দেওয়ার কারণে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে অরবানের নীতিগত সংঘাত ক্রমশ বাড়ছিল। পুতিনের মুখ্য সহযোগীদের অন্যতম অরবান এই যুদ্ধের জন্য হামেশাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জেলেনস্কির ভূমিকাকে দোষারোপ করতেন।
মাগইয়ার কিন্তু ইতিমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি যেমন ইউক্রেনকে দেওয়া কোনও আর্থিক প্যাকেজ আটকাবেন না, তেমনই তা তড়িঘড়ি পাস করার ব্যাপারেও অহেতুক তৎপরতাও দেখাবেন না। তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম: ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে হাঙ্গেরির পারস্পরিক সম্পর্কের উন্নতি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন অরবানের স্বৈরাচারী শাসনের কারণে ১৮ বিলিয়ন ইউরোর আর্থিক তহবিল হাঙ্গেরিতে না পাঠিয়ে ঠান্ডা ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছিল। পিটার মাগইয়ার আরও দু’টি বিষয়ে আগ্রহী। এক) ১৬ বিলিয়ন ইউরো ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ঋণ বাবদ পাওয়ার ব্যাপারে। দুই) ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিবাসন আইন অমান্য করার জন্য হাঙ্গেরিকে জরিমানা বাবদ যে রোজ এক মিলিয়ন ইউরো দিতে হচ্ছে, সেটা মকুব করার বিষয়ে। কিন্তু সমস্যা হল, অভিবাসন নীতির ক্ষেত্রে পিটার মাগইয়ার অরবানের মতোই কট্টরপন্থী।
এতদসত্ত্বেও, সামগ্রিকভাবে অরবানের পতন হাঙ্গেরির তথা ইউরোপের কাছে সুসংবাদ। কট্টরপন্থী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের একত্রীভবন প্রক্রিয়ার বিষয়ে সংশয়বাদী একজন দক্ষিণপন্থী নেতার উত্থানের হাত থেকে রেহাই পেয়ে ইউরোপ যেন হাঁফ হাত থেকে ছেড়ে বাঁচল। কত কী-ই না করে করেছিলেন অরবান গদি বঁাচানোর জন্য! হাঙ্গেরির নির্বাচনী ব্যবস্থাটিকে সংস্কারের নামে ফিদেজের অনুকূলে আনতে অনাবাসী বিশুদ্ধ হাঙ্গেরীয়দের ভোটাধিকার দিয়েছিলেন। নির্বাচনী কেন্দ্রগুলির পুনর্বিন্যাস করে নিজের দলের সাফল্য নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও করেছিলেন। বদলেছিলেন বিদেশনীতি, যাতে হাঙ্গেরিকে অনুদার গণতন্ত্রের ‘মডেল’ রূপে তুলে ধরা যায়।
কিন্তু সব বিফলে গেল। অপ্রত্যাশিতভাবে, পূর্বানুমান ছাড়া, এবারের নির্বাচনে হেরে গেলেন ভিক্টর অরবান ও তাঁর দল। ৭৬.৫ শতাংশ ভোটারের ভোটদান, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জেন জি-র সক্রিয় অংশগ্রহণ, অর্থনীতিতে বদ্ধ দশা, বেকারত্বের হার বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভগ্নদশা এবং মাগইয়ারের দুর্নীতিবিরোধী প্রচার– সবের সম্মিলিত ফল– ১৬ বছরের অরবান জমানার অবসান, কট্টর দক্ষিণপন্থী শাসনের বিপর্যয়। আমাদেরও হাঙ্গেরির থেকে শেখার এবং নতুন স্বপ্নে বুক বাঁধার সময় কি আসেনি?
