গত কয়েক বছর ধরে অক্সফ্যামের রিপোর্ট নিয়ে দেশে বিস্তর শোরগোল হয়েছে। এসব রিপোর্টে দেশের আর্থিক বৈষম্যের দেশে ‘অতি ধনী’ ও ‘বিলিওনিয়র’ বাড়ছে, কিন্তু একইসঙ্গে বাড়ছে বেকারত্ব, অনিশ্চয়তা ও আর্থিক বৈষম্য– এই দ্বৈত বাস্তবই সামনে আনছে বিভিন্ন সমীক্ষা রিপোর্ট। একদিকে সম্পদ পুঞ্জীভূত হচ্ছে মুষ্টিমেয়র হাতে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবন হচ্ছে ক্রমশ কঠিনতর। উন্নয়নের সুফল আদৌ কি পৌঁছচ্ছে মানুষের কাছে?
নিদারুণ ছবি স্পষ্ট। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই ছবির কোনও বদল ঘটেনি। দেশের বিপুল সম্পদ মুষ্টিমেয়র হাতে পুঞ্জীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ হয়নি। সদ্য সামনে এসেছে ‘নাইট ফ্র্যাংক’-এর ২০২৬ সালের ‘দ্য ওয়েলথ রিপোর্ট’। এই রিপোর্টে বৈষম্যের সেই চেনা ছবি আরও একবার চাঞ্চল্য ফেলেছে।
‘নাইট ফ্র্যাংক’-এর রিপোর্ট তৈরি হয় দুনিয়াজুড়ে লগ্নিকারী ও নীতিনির্ধারকদের কথা মাথায় রেখে। ভারত সম্পর্কে এই রিপোর্টের মূল বক্তব্য হল, এখানে ‘অতি ধনী’দের সংখ্যা বাড়ছে। এদের সূচকে ‘অতি ধনী’ বলতে ‘বিলিওনিয়র’ বোঝায় না। তার চেয়ে অনেক কম, মাত্র তিন কোটি ডলারের সম্পত্তির মালিকই অতি ধনী। টাকার অঙ্কে আমাদের দেশে যারা প্রায় ৩০০ কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক, তারা অতি ধনীদের তালিকায়। কিন্তু ভারতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে চলেছে বিলিওনিয়রের সংখ্যাও। ‘বিলিওনিয়র’ মানে ১০০ কোটি ডলারের মালিক। টাকার অঙ্কে সেটা প্রায় ১০ হাজার কোটি। ভারতে এই বিলিওনিয়রের সংখ্যাটা এখন ২০৭, যা আমেরিকা ও চিনের পরেই।
‘সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি’ নামক সংস্থা মার্চ মাসের যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা গিয়েছে দেশে সামগ্রিক বেকারত্ব ফেব্রুয়ারি মাসের ৪.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫.১ শতাংশ হয়েছে। শহরের বেকারত্ব ৬.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬.৮ শতাংশ।
যারা আমেরিকা ও চিনে কখনও পা রাখেনি তাদেরও এই দু’টি দেশের বিপুল ঐশ্বর্য বিষয়ে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান সম্পর্কে ধারণা রয়েছে। দু’টি দেশ এখন বিশ্বের দুই ‘সুপারপাওয়ার’। বিশ্ব অর্থনীতি এদের কবজায়। সেই নিরিখে ভারত এখনও তৃতীয় বিশ্বের একটি ‘উন্নয়নশীল দেশ’ ছাড়া কিছু নয়। দেশে দারিদ্র সর্বব্যাপী। বস্তুত দারিদ্র ও কর্মহীনতা আমাদের ঘরে ঘরে। দেশের সিংহভাগ মানুষের কাছে শিক্ষা ও চিকিৎসা কার্যত অধরা। এই বছরের আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিপোর্টে বলছে– ২৫ বছরের কমবয়সি স্নাতকদের ৪০ শতাংশ বেকার। অাজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের রিপোর্টকে মান্যতা দেন গবেষকরা। কেন্দ্রীয় সরকার প্রতি বছর ‘পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে’ প্রকাশ করে। ২০২৫-’২৬ সালের রিপোর্ট আজ, ২৮ এপ্রিল প্রকাশিত হবে। এই রিপোর্টে দেশের গ্রাম ও শহরের সার্বিক বেকারত্বের পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে। ‘সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি’ নামক সংস্থা মার্চ মাসের যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা গিয়েছে দেশে সামগ্রিক বেকারত্ব ফেব্রুয়ারি মাসের ৪.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫.১ শতাংশ হয়েছে। শহরের বেকারত্ব ৬.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬.৮ শতাংশ।
বেকারত্ব বৃদ্ধির এই প্রেক্ষাপটে দেশে ‘অতি ধনী’ ও ‘বিলিওনিয়র’-এর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া খুব তাৎপর্যপূর্ণ। ‘নাইট ফ্র্যাংক’-এর রিপোর্ট ‘ফোর্বস’-এর রিপোর্টের মতোই গ্রহণযোগ্য। এরা ভারতের অতি ধনীদের সংখ্যা বৃদ্ধির যে পরিসংখ্যান দিয়েছে, তাতে বলা হচ্ছে ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ‘অতি ধনী’দের সংখ্যা ৬৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দঁাড়িয়েছে ১৯,৮৭৭ জন। ৫ বছর পর, মানে ২০৩১ সালের মধ্যে আরও ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে এটা ২৫,২১৭ জনে গিয়ে দঁাড়াবে। অন্যদিকে, প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক তথা ‘বিলিওনিয়র’দের সংখ্যা দেশে আগামী ৫ বছরে ৫১ শতাংশ বেড়ে হবে ৩১৩ জন। এই হিসাব ‘সাদা’ টাকার ভিত্তিতে। বড়লোকদের কালো টাকা ও অনৈতিক উপায়ে অর্জিত সম্পদের পরিমাণ হিসাব করতে পারলে ‘অতি ধনী’ ও ‘বিলিওনিয়র’দের সংখ্যাটা আরও বাড়ত। অপরাধী ও কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতার হিসাবও সম্ভবত এতে নেই। এরাও অনেকে ‘অতি ধনী’। এঁদের মধ্যে দু’-একজন ‘বিলিওনিয়র’ও থাকতে পারেন।
বেকারত্ব বৃদ্ধির এই প্রেক্ষাপটে দেশে ‘অতি ধনী’ ও ‘বিলিওনিয়র’-এর সংখ্যা বেড়ে যাওয়া খুব তাৎপর্যপূর্ণ। ‘নাইট ফ্র্যাংক’-এর রিপোর্ট ‘ফোর্বস’-এর রিপোর্টের মতোই গ্রহণযোগ্য।
এই প্রাচুর্যের বিপ্রতীপে আমরা সাদা চোখে দেশের চরম দারিদ্র ও সাধারণ মানুষের দুর্দশা সবসময় দেখতে পাই। যেখানে জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে হু হু করে, সরকারি চাকরিতে নিয়োগ নেই বললেই চলে, শিক্ষিত বেকার যুবকদের ৬৭ শতাংশ স্নাতক ইত্যাদি, ইত্যাদি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সমীক্ষক সংস্থাগুলির রিপোর্ট অনুযায়ী, যে-হারে কৃত্রিম মেধার বিস্তার ঘটছে, তাতে ভারতে যারা এখন চাকরি করছে, তাদের ৬৩ শতাংশকে ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন করে প্রশিক্ষিত হতে হবে, নচেৎ তারা চাকরি ধরে রাখতে পারবে না। কারণ এই সময়ের মধ্যে এখনকার ৯ কোটি চাকরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। যদিও ১৬ কোটি নতুন ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তার মধ্যে অবশ্য ‘গিগ’-কর্মী থাকবে ২ কোটি ৩০ লক্ষ। ‘গিগ’-কর্মীদের সামান্য অায়ের জন্য কীরকম পরিশ্রম ও ঝুঁকির জীবনের মধে্য চলতে হয় তা অামরা দেখতে পাই। অর্থাৎ, ‘নাইট ফ্র্যাংক’-এর রিপোর্টে বিলিওনিয়র ও অতি ধনীদের সংখ্যা বাড়তে থাকলেও, দেশের রূঢ় বাস্তব হল, সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের সম্পদ ক্রমশ কমছে এবং অারও কমে যাবে। গরিবদের মাথা তুলে দঁাড়ানোর সুযোগ দ্রুত আরও সীমিত হয়ে পড়বে। দুঃখ, কষ্ট ও হতাশাকে সঙ্গে করে নিয়ে বাকি ১৪০ কোটি ভারতবাসীকে অাগামী দিনে চলতে হবে।
সাধারণ মানুষের জীবনে এই বিপর্যয় নেমে আসার দায় দেশের সরকার কোনওভাবে ঝেড়ে ফেলতে পারে না। বিশেষত নরেন্দ্র মোদির সরকারকে এই দায় নিতে হবেই। ‘বিলিওনিয়র’ ও ‘অতি ধনী’দের সম্পদের যে অংশ অনৈতিক পথে হয়, তা বন্ধ করার কোনও চেষ্টা এই ১২ বছরে হয়নি। কালো টাকা উদ্ধারের কথা ‘জুমলা’ হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে। বিজয় মালিয়া, মেহুল চোকসি বা নীরব মোদিদের বিদেশে পালাতে দেখে ভাবার কোনও কারণ নেই যে, দেশে ব্যাঙ্কের টাকা লুট বন্ধ হয়ে গিয়েছে। বড় লোকের সম্পদে আরও কর চাপানোর ইচ্ছাও সরকারের দেখা যায় না। বরং এই সরকার বিনা কারণে রাতারাতি ব্যবসায়িক সংস্থার কর্পোরেট কর কমিয়েছে। অপরাধী ও দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতারা তো সরকারের অাশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েই থাকেন। উপরন্তু চিনের মতো ‘এমপ্লয়মেন্ট ফার্স্ট’ নীতি গ্রহণেও সরকার এত দিন ধরে ব্যর্থ। অামাদের দেশের ক্ষেত্রে বলা হয় ‘মিসিং মিডল’-এর সংকট। সহজ কথায় এর মানে হল, তথ্যপ্রযুক্তি বা গাড়ি শিল্পের মতো কিছু পুঁুজি নির্ভর শিল্প দেশে হলেও হচ্ছে না শ্রমনিবিড় শিল্প। এই শ্রম নির্ভর শিল্পকেই বলা হয় মাঝারি তথা ‘মিডল’ স্তরের শিল্প। এর মধে্য জামাকাপড়, হোসিয়ারি, জুতো, খেলনা ইত্যাদি রয়েছে। চিন সরকারি উদ্যোগে এই ‘মিডল’ স্তরের শ্রমনিবিড় শিল্পের প্রসার ঘটিয়েই তাক লাগিয়েছে। ভারতের ক্ষেত্রে সেটা ঘটেনি। এটাকেই বলা হয় ‘মিসিং মিডল’। ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র শিল্পের প্রসার ঘটিয়ে এই ‘মিসিং মিডল’ দূর করার চেষ্টা করতে পারত মোদি সরকার। কিন্তু এত দিনেও সেটা তারা করতে পারেনি। ২০২৫-’২৬-এর কেন্দ্রীয় বাজেটে ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র শিল্পে উৎসাহ দেওয়ার জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা রাখার কথা বলা অাছে। সেই টাকা কীভাবে খরচ হবে, তা অবশ্য কেউ জানতে পারবে না।
অামাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘স্কিল গ্যাপ’-ও বহুচর্চিত। ডিগ্রি লাভের পরও ছেলেমেয়েরা ‘কমিউনিকেশন স্কিল’ ও ‘ক্রিটিকাল থিংকিং’-এর ক্ষমতা লাভ করে না। এখন বলা হচ্ছে অামাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ডিগ্রি প্রাপকদের ৮০ শতাংশেরই কোনও চাহিদা শিল্পের কাছে নেই। তাহলে দরকার শিক্ষাব্যবস্থার অামূল পরিবর্তন। সেটা করা হয়নি। এখন নির্বাচনী প্রচারে নরেন্দ্র মোদির মুখে শুনতে পাচ্ছি স্কুলে স্কুলে ‘কনটেন্ট ক্রিয়েশন ল্যাব’ তৈরির প্রতিশ্রুতি। এসব ভাবনা এত দিন কোথায় ছিল? পরিকাঠামোয় উন্নতি ঘটিয়ে চিন শিল্প উৎপাদনের খরচ ১৪ শতাংশ কমিয়েছে। তাতে তাদের পণ্যের বাজার গোটা বিশ্বে প্রসারিত হয়েছে। ভারত এখনও সেই রাস্তায় হঁাটতে পারেনি। এটা প্রশাসনিক গাফিলতি।
দেশের সরকার হাত গুটিয়ে বসে থেকে, ব্যবসায়ীদের মুনাফা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরির মধে্য দিয়ে যদি শুধু দেশের উন্নতির কথা ভাবে, তাহলে কোনও দিনই কমবে না অার্থিক বৈষম্য ও সাধারণ মানুষের দুর্দশা। ‘অক্সফ্যাম’, ‘নাইট ফ্র্যাংক’ বা ‘ফোর্বস’-এর মতো সংস্থা শুধু রিপোর্টের পর রিপোর্টই তৈরি করে যাবে।
