শৌচালয়ের জল মিশেছে পানীয় জলের সঙ্গে! ‘স্মার্ট সিটি’ ইন্দোরের ঘটনা। যার মাশুল গুনতে হল শিশু-সহ ১৫ জনকে। বেঘোরে প্রাণ গেল। হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন এখনও হাজারের বেশি মানুষ। প্রশাসনিক গাফিলতি স্পষ্ট। ‘জল জীবন মিশন’ হচ্ছে বটে, কিন্তু ‘বিশুদ্ধ’ পানীয় জল সরবরাহ করতে যে-সরকার ব্যর্থ হয়, তাতে পরিষ্কার– উন্নয়নের প্রদীপের নিচে কতটা অন্ধকার! লিখছেন পার্থপ্রতিম বিশ্বাস।
‘দাদা একটু জল পাই কোথায় বলতে পারেন?’
সুকুমার রায়ের ‘অবাক জলপান’ নাটকের সেই বিখ্যাত উক্তিটি এখন এ-দেশের শহুরে নাগরিক জীবনে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে নতুন বছরের শুরুতেই। প্রশ্নটি শুধু আর ‘একটু জল’ নয়, বরং ‘বিশুদ্ধ’ পানীয় জলের!
নগরায়নে বাড়ছে জলের চাহিদা
ছোটবেলা থেকেই বর্ণহীন, গন্ধহীন সেই তরল, যাকে মানুষ চিনেছে বেঁচে থাকার আবশ্যিক উপাদান হিসাবে, এখন সেই জল, বিশেষত পানীয় জলের জোগান নিয়েই তৈরি হচ্ছে প্রবল শঙ্কা!
এই দেশের বেড়ে ওঠা নগরজীবনে নগরায়নের দাপট বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেশের ছোট-বড় শহরে বাড়ছে জনঘনত্ব। ফলে সেই বাড়তি জনঘনত্ব সামাল দিতে বাড়ছে জলের চাহিদা। স্নানের জল থেকে পানের জল, কৃষির জল থেকে শিল্পের জল– উত্তরোত্তর মহার্ঘ হয়ে উঠেছে দেশজুড়ে। শুধু জলের পরিমাণ নয়, বরং জলের গুণমান নিয়েও তৈরি হচ্ছে নিত্যনতুন আশঙ্কা। যে-আশঙ্কা আরও বেশি ঘনিয়ে উঠেছে দেশের অন্যতম পরিচ্ছন্ন এবং আধুনিক শহর ইন্দোরের সাম্প্রতিক দূষিত পানীয় জলের ধাক্কায় শিশু-সহ ১৫ জন মানুষের মৃত্যুতে।
সাম্প্রতিকে, দেশের পুরনো শহরগুলির পরিকাঠামোর মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ঘোষিত হয়েছিল ‘স্মার্ট সিটি’ প্রকল্প। যে-প্রকল্পের মূল ‘লক্ষ্য’: দ্রুত নগরায়ন বৃদ্ধির সঙ্গে সংগতি রেখে বাছাই করা দেশের বেশ কিছু শহরের প্রযুক্তিনির্ভর পরিষেবা ও পরিকাঠামোর উন্নয়ন। উন্নয়নের সেই মাপকাঠিতে রয়েছে শহরের নিকাশি থেকে আবাসন, পরিবহণ থেকে পরিবেশ কিংবা বিদ্যুতায়ন থেকে পানীয় জলের মতো শহর জীবনের অতি আবশ্যিক উপাদানগুলি। দেশজুড়ে ঝাড়াই-বাছাই করা এমন শহর কার্যত এই দেশের শহুরে উন্নয়নের ‘আধুনিক মডেল’ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এমন ‘মডেল’ শহরগুলির অন্যতম ইন্দোরেই পানীয় জলের দূষণের ঘটনায় শিশু-সহ ১৫ জন মানুষ প্রাণ হারাল। শয়ে শয়ে মানুষকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
কেবল ইন্দোর নয়, দেশের আর-একটি স্মার্ট সিটি গান্ধীনগরেও কোটি কোটি টাকা খরচ করে নতুন জল প্রকল্পের নলবাহিত জলে দূষণের দাপটে ত্রাহি ত্রাহি রব! দেশের এমন আধুনিক
স্মার্ট শহর জুড়েই যদি জলাতঙ্কের বহর বেড়ে চলে, সেখানে দেশ জুড়ে ছোট-বড়-মেজো শহরগুলির কোটি কোটি মানুষ যে বিপদের প্রহর গুনছে প্রতিনিয়ত– বলার অপেক্ষা
রাখে না! ইতিমধ্যে ১৫০ কোটি মানুষের দেশে ৩৬ শতাংশর বেশি মানুষ শহরে বাস করছে। অনুমান আগামী ৫ বছরে সেই মানুষের সংখ্যা ৪০ শতাংশে পৌঁছাবে। ফলে বিশুদ্ধ জলের চাহিদা সামাল দিতে না পারলে যে দেশের শহুরে মানুষের জীবন বেসামাল হতে পারে– সাম্প্রতিক জলদূষণ তারই ইঙ্গিতবাহী ।
বেহাল স্মার্ট সিটি ইন্দোর
ইন্দোর মধ্যপ্রদেশের অন্যতম প্রাচীন শহর। কেবল প্রাচীন বললে ভুল বলা হবে। ব্রিটিশ আমল থেকেই ইন্দোর শহরে পরিকল্পিত উপায়ে পরিকাঠামোর উন্নয়নের সূচনা ঘটেছিল। বিস্ময়ের হলেও সত্যি ১৯০৬ সালে সেই শহরের উপকণ্ঠে একটি হ্রদ থেকে পরিশ্রুত জল পাইপ লাইনের মাধ্যমে শহরে সরবরাহের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়েছিল, বাস্তবায়িত হয়েছিল সংগঠিত উদ্যোগে শহরে বিদ্যুতের পরিকাঠামো এবং নিকাশিব্যবস্থা। সার্ধশতবর্ষ অতিক্রান্ত দেশের অন্যতম প্রাচীন পুরসভার তত্ত্বাবধানে কেন্দ্রীয় সরকারের স্মার্ট সিটি প্রকল্পে সেই শহরের নাম জুড়েছে। কার্যত ইন্দোর শহর মধ্যপ্রদেশের জনসংখ্যার নিরিখে কেবল বৃহত্তম নয়, উপরন্তু সেই শহর ওই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্মারক এবং ধারকও বটে। ফলে শহরের পরিকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণে যে দেশের অন্যতম পোক্ত ‘ডাবল ইঞ্জিন’ রাজ্য সরকার অনেক বেশি সচেতন হবে– প্রত্যাশিত। কিন্তু সাম্প্রতিক জলদূষণ বিপর্যয়ের পর স্পষ্ট হল যে, শহর জুড়ে উন্নয়নের প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতোই রয়ে গিয়েছিল সেই শহরের পানীয় জলের ভাঙাচোরা, প্রাণঘাতী পরিকাঠামো।
ইতিমধ্যে প্রমাণিত, বিশুদ্ধ পানীয় জল পরিবাহী পাইপ লাইনের একেবারে কান ঘেঁষে তৈরি হয়েছিল সেই অঞ্চলের শৌচালয়। আর শৌচালয়ের নিকাশি পাইপ ফুটো হয়ে বিষাক্ত
তরল বর্জ্য পদার্থ, নিকটস্থ পানীয় জলের পাইপ লাইনের ফাটল দিয়ে গিয়ে মিশেছিল পাইপের পানীয় জলের সঙ্গে। সেই দূষিত ও বিষাক্ত পানীয় জল হাজারে হাজারে মানুষ পান করার পরিণতিতেই বেঘোরে প্রাণ গেল অনেকের। এমনকী, ওই ভয়াবহ দুর্ঘটনা হঠাৎ করে একদিন ঘটেনি। কার্যত বেশ কয়েক দিন ধরেই সেই অঞ্চলের পানীয় জলে শৌচালয়ের বর্জ্যের তরল মিশে গিয়ে জলের রং ও গন্ধ পাল্টে যাওয়া সত্ত্বেও ‘ক্লিন সিটি’-র পুর প্রশাসন কোনও কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি। ফলে প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে এবং প্রস্তুতির অভাবেই ওই বিপর্যয় মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে পুরসভা। এমন প্রেক্ষিতে এই ভয়ংকর মৃত্যুর ঘটনা বেশ কিছু জরুরি প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে দেশের শহরের সার্বিক জল সরবরাহের নিরাপত্তা নিয়েই।
নলবাহিত জল পরিবহণ
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এ-দেশে নলবাহিত জলের প্রায় ৪০ শতাংশ নষ্ট হয় সেই জল পরিবহণ ব্যবস্থার পরিণতিতে। নলবাহিত জল নষ্টের অন্যতম কারণ পাইপ লাইনের ফাটল। ইস্পাত কিংবা কংক্রিটের পাইপ লাইন মাটির নিচ দিয়ে বসানো হয় বলেই মাটিচাপা পড়া সেই লাইনের ফাটল, সাধারণভাবে ভূপৃষ্ঠে খালি চোখে ধরা পড়ে না। পাইপের উপরে মাটি জলে ভিজে উঠলে কিংবা ধসতে শুরু করলে আমজনতার নজরে আসে ভূপৃষ্ঠের নিচে পাইপে ফাটল। এমন পাইপগুলির বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়তে থাকে পাইপগুলির ফাটলের বিপদ। ফলে ভূপৃষ্ঠের উপর থেকে অধরা ওই পাইপ লাইনের ফাটলের ছিদ্রপথে বিশুদ্ধ জলের সঙ্গে মাটির নিচে ছড়িয়ে থাকা দূষিত জল মিশে গেলেই তৈরি হয় জল দূষণের বিপদ। সেই কারণেই মাটির নিচে পানীয় জলের পাইপের নিকটবর্তী অঞ্চল দিয়ে নিকাশি পাইপ বসানো উচিত নয়। অথচ শহরের স্থানাভাবের কারণে হামেশাই রাস্তার নিচ দিয়ে এমন বিভিন্ন ধরনের পাইপ– যেমন, জলের পাইপ, নিকাশির পাইপ, গ্যাসের পাইপ, বিদ্যুতের পাইপ গা ঘেঁষাঘেঁষি করেই বসানো হয়। ফলে সেক্ষেত্রে নিকাশি পাইপ ভূপৃষ্ঠের নিচে ফেটে গেলে ওই নিকাশি তরল মাটির সঙ্গে মিশে ভূপৃষ্ঠের নিচের জলকে বিষাক্ত করে তুতে পারে।
শহর কলকাতাতেও বহু অংশে এমন বিভিন্ন পাইপের সহাবস্থান রয়েছে ভূপৃষ্ঠের নিচে অল্প পরিসরে। যে-শহরে পানীয় জল থেকে নিকাশি নালার পাইপগুলি মূলত রাস্তার নিচ দিয়ে ছুটে চলে, সেখানে প্রযুক্তিনির্ভর উপায়ে ওই পাইপগুলির ফাটলের ভৌগোলিক অবস্থান এবং ব্যাপ্তি নজরবন্দি করা প্রয়োজন।
বলা বাহুল্য ইন্দোর ‘ক্লিন সিটি’-র তকমা পেলেও সেই শহরের ভগীরথপুরা অঞ্চলে পাইপের ওই ফাটল নির্ধারক-ব্যবস্থা ছিল না, কিংবা থাকলেও অকেজো হয়েছিল। এমনকী, ওই অঞ্চলে জলের পাইপ লাইনগুলি ৪৫ থেকে ৫০ বছরের পুরনো হওয়া সত্ত্বেও সেগুলির নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়নি। ফলে শৌচাগারের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে থাকা মাটির নিচে পানীয় জলের পাইপ লাইনের স্বাস্থ্যে নজর এড়িয়ে যাওয়ায় এই ভয়াবহ বিপত্তি ঘটেছে। এমন প্রেক্ষিতে দেশের প্রতিটি জনবহুল শহরেই পানীয় জল ও নিকাশি পাইপ লাইনের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ফাটল নির্ণয়ের প্রযুক্তি নির্ভর পরিকাঠামো তৈরি করা উচিত। যাতে করে শহরের এক-একটি অঞ্চলের কন্ট্রোল রুমে বসেই ভূপৃষ্ঠের নিচে বিভিন্ন পাইপ লাইনের ফাটলের যাবতীয় তথ্য হাতের মুঠোয় নিয়ে আসা যায়। বিশেষত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের প্রয়োগের মাধ্যমে হাল আমলে এমন ফাটল নির্ণয় অনায়াসেই করা যাচ্ছে। ফলে ফাটল তথ্য হাতের কাছে থাকলে সেই ফাটলের মেরামতি কিংবা পাইপ বদলের মতো কার্যকরী সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে পারলে পানীয় জলের দূষণ বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব।
জল দূষণে আক্রান্ত নদীর জল
নলবাহিত জল দূষণের ক্ষেত্রে পাইপের ফাটল যেমন একদিকে প্রাসঙ্গিক, তেমনই প্রাসঙ্গিক জলের উৎসমুখে দূষণের বিপদ। এই দেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও দেশের জনসংখ্যার
নিরিখে ভূপৃষ্ঠে মিষ্টি জলের উৎসের পরিমাণ যথেষ্টই কম। বিশ্বের ১৭ শতাংশ মানুষের বাস এই দেশে হলেও বিশুদ্ধ মিষ্টি জলের উৎস রয়েছে গোটা বিশ্বের নিরিখে কেবল ৪ শতাংশ। ফলে এটা স্পষ্ট যে, এ-দেশ নদীমাতৃক হলেও নদীর জলের চাহিদা এবং জোগানের ফারাক বিস্তর। পাশাপাশি, নদীর জলের গুণগত মান জনজীবনে ব্যবহৃত জলের কাঙ্ক্ষিত মানের তুলনায় যথেষ্টই খারাপ। ফলে নদীর জল দ্রুত পরিশ্রবণ করে শহর, শহরতলিতে সরবরাহ করার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা জরুরি। ইতিমধ্যে কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের সমীক্ষায় দেশের ২,১১৬টি স্থানে বিভিন্ন নদনদীর বিভিন্ন অংশের মধ্যে ২৯৬টি স্থানে জলদূষণের প্রমাণ মিলেছে। যার অর্থ: দেশের ১৫.৬৭ শতাংশ নদীর জল দূষিত।
কুম্ভমেলার মতো উৎসব স্থলেও উচ্চ পর্যায়ের সরকারি সতর্কতা সত্ত্বেও জলের গুণগতমান স্নানের নিরিখে ‘দূষিত’ ছিল বলেই অভিযোগ উঠে এসেছে। পাশাপাশি বায়োকেমিক্যাল অক্সিজেন ডিমান্ডের নিরিখে দেশের ৩৮ শতাংশ নদীর জল বিপজ্জনক মাত্রায় রয়েছে। বহু আইনি বিধিনিষেধ চালু করার পরেও নদীকেন্দ্রিক নগরজীবনের শিল্প এবং নিকাশি বজ্র অপরিশোধিত অবস্থায় এখনও প্রতিদিন এসে জমা হয় দেশের নদীবক্ষে। এই অবস্থায় নদীর জলকে নগরজীবনে প্রয়োজনে নলবাহিত উপায়ে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে দূষিত জলের ঝুঁকিও উত্তরোত্তর বাড়ছে। বাড়ছে জল পরিশোধনের খরচ।
জল দূষণে ঝুঁকি কৃষিতে
কৃষিভিত্তিক এই দেশে মানুষের খাদ্য চাহিদার মূল শস্য কিংবা সবজিগুলি উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রচুর জলের প্রয়োজন। ফলে, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি কারণে, বর্ধিত খাদ্য চাহিদাকে সামাল দিতে
কৃষি উৎপাদনের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই দেশে বেড়ে চলেছে জলের চাহিদা। এই মুহূর্তে দেশের ভূগর্ভস্থ জলের ৮৭ শতাংশ ব্যবহৃত হয় কৃষিক্ষেত্রে, এবং ২ শতাংশ শিল্পক্ষেত্রে। আর বাকি ১১ শতাংশ জল ব্যবহৃত হয় মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার প্রয়োজনে। এই প্রেক্ষিতে যদি কৃষি উৎপাদনের বীজ, সার এবং সেচ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন না করা যায়, সেক্ষেত্রে ২০৫০ সালের মধ্যেই তীব্র জল সংকটের মুখোমুখি হবে এ-দেশের মানুষ। বিশ্বব্যাঙ্কের সংজ্ঞা অনুযায়ী, মাথাপিছু বছরে ১০০০ কিউবিক মিটারের কম জল সরবরাহের মাত্রা পৌঁছালে তীব্র জল সংকটের তুল্য পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়। ২০২৫ সালে এ-দেশে মাথাপিছু বাৎসরিক জলের জোগান ছিল ১,৩৪১ কিউবিক মিটার, যেটা আগামী ২০৫০ সালে কমে দঁাড়াতে পারে ১,১৪০ কিউবিক মিটারে। অর্থাৎ স্বাধীনতার শতবর্ষপূর্তি কালে শিয়রে সমন নিয়েই হাজির হবে জলসংকট এ-দেশের মাটিতে। পাশাপাশি, জলবায়ুর উত্তরোত্তর নেতিবাচক পরিবর্তন ও বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব বিবেচনা করলে জলসংকট এই দেশে আরও দ্রুত তীব্র আকার ধারণ করবে বলেই আশঙ্কা। ইতিমধ্যে দেশের চেন্নাই শহর জলশূন্য শহরের তকমা পেয়েছে।
নীতি আয়োগের সমীক্ষা অনুযায়ী, ‘জলশূন্য’ হওয়ার পথে দেশের আরও ২১টি বড় শহর। এমন প্রেক্ষিতে নগর জীবনে উপযুক্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ জলের জোগান বজায় রাখাই হয়ে উঠবে এই শতাব্দীর মধ্যভাগে অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। সেই নিরিখে এখন থেকে নলবাহিত জল পরিবহণ প্রক্রিয়ায় জল নষ্টের পরিমাণ কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব
দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, বিশ্বে এমন নলবাহিত জল পরিবহণে জল নষ্টের পরিমাণ যেখানে ১৬-১৮ শতাংশ, সেটাই এ-দেশে দ্বিগুণ। এই প্রেক্ষিতে বিপুল জনসংখ্যার দেশে যখন মিষ্টি জলের অাধার সীমিত, সেখানে জলের অপচয় কমিয়ে সঞ্চয় বৃদ্ধি ও জল পরিবহণের সুরক্ষায় বাড়তি গুরুত্ব আরোপ করা ছাড়া গতি নেই।
ভূগর্ভের লুকিয়ে বিপদ
ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলনের ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। বিশেষত কৃষি থেকে শিল্পের প্রয়োজনে যে-পরিমাণ ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলন করা হয়, সেই জল ভূগর্ভে ফিরে না গেলে যে-শূন্যতা সৃষ্টি হয় ও হচ্ছে, তার থেকেও ঘটতে পারে ভূগর্ভস্থ জলে বিভিন্ন মাত্রার দূষণ। বিশেষত, আর্সেনিক থেকে ফ্লুরাইড কিংবা নাইট্রেট দূষণ, ভূগর্ভস্থ জলে উত্তরোত্তর বিপদের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
সম্প্রতি একটি সমীক্ষায় প্রকাশিত যে, এ-দেশের ভূগর্ভস্থ জলের উৎসের ৭০ শতাংশ দূষিত। দূষণের নিরিখে পৃথিবীর ১২২টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১২০। যার অর্থ: ভারতে ভূগর্ভস্থ জলদূষণের ঝুঁকি সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এই প্রেক্ষিতে ভূগর্ভের জল নিষ্কাশনের ক্ষেত্রেও সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিল্লি কিংবা তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যে ভূগর্ভের জল ব্যবহারের প্রবণতা সর্বোচ্চ।
দেশের পশ্চিম ভারতের রাজস্থান বা গুজরাতের বিভিন্ন অঞ্চল জুড়েও ভূগর্ভস্থ জল ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ছে। দক্ষিণ ভারতের কর্নাটক, তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানা কিংবা মধ্যপ্রদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ভূগর্ভের জলধারণের ক্ষমতা ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই যথেষ্ট কম। আমাদের রাজ্যে জলের জোগানের পরিমাণ নিয়ে আশু সংকট না থাকলেও জলের গুণমান নিয়ে সমস্যা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সেই মাটির ভিতর থেকে জল টেনে বের করে শিল্প, কৃষি কিংবা দৈনন্দিন জীবনে লাগামছাড়া ব্যবহার করতে থাকলে শেষমেশ নলবাহিত জলেও দূষণের ঝুঁকি বাড়বে বইকি।
জলসঞ্চয়ের পরিকল্পনা
ভবিষ্যতের জলসংকট বিবেচনায় রেখে প্রয়োজন জলাভূমি থেকে খালবিল, জলাশয় সংরক্ষণের সরকারি উদ্যোগ। ইতিমধ্যে দেশে সরকারি উদ্যোগে বড় বড় জলাশয় তৈরির পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। এর পাশাপাশি দেশের শহরগুলিতে বৃষ্টির জল সংরক্ষণের পুর উদ্যোগ সীমিত পর্যায়ে চালু হয়েছে যেটার আরও বেশি প্রসার প্রয়োজন বৃহত্তর জলসংকট মোকাবিলার স্বার্থেই।
সার্বিক এই পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে সরকারি স্তরে দেশে নলবাহিত জলের জোগান সুনিশ্চিত করার ক্ষেত্রে জলের গুণমানের প্রতি নজর দেওয়া বিশেষ প্রয়োজন। ইতিমধ্যে ‘জল জীবন মিশন’-এর মাধ্যমে গ্রাম থেকে শহরের বিভিন্ন পরিবারে নলবাহিত জলের সংযোগ সরকারি উদ্যোগেই কার্যকর হয়েছে। কার্যত দেশের ৮০ শতাংশ গ্রামীণ এলাকায় এমন জলের সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, নলের সংযোগ জলের প্রয়োজনে বাড়ি অবধি যেমন জরুরি– তেমনই জরুরি সেই নল দিয়ে উপযুক্ত মানের পানীয় জলের পরিষেবা মানুষের বাড়ি অবধি পৌঁছানো। জলবাহিত রোগে বছর বছর আক্রান্ত আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার জীবনরক্ষার্থে সর্বাগ্রে চাই বিশুদ্ধ জল সরবরাহের সরকারি অঙ্গীকার।
জলের অপর নাম যে জীবন! বা, জীবনচক্র।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক অধ্যাপক
drppb@yahoo.in
