shono
Advertisement
Kanwar Yatra

কানওয়ার যাত্রায় দোকানে মালিকের নাম টাঙানোর নির্দেশ বিভাজন তৈরির চেষ্টা

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বরাবরই এই দেশের ভোজনপন্থা।
Published By: Biswadip DeyPosted: 09:19 PM Jul 26, 2024Updated: 09:19 PM Jul 26, 2024

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বরাবরই এই দেশের ভোজনপন্থা। এখানে মালিকের নাম দিয়ে নয়, খাবারের গুণেই বিচার্য হয় রেস্তোরঁার নামডাক। কিন্তু, যোগী সরকার উত্তরপ্রদেশ পুলিশকে এই তদারকির নির্দেশ দিয়েছে, কানওয়ার যাত্রা উপলক্ষে সেখানকার রাস্তার প্রত্যেকটা খাবার দোকানে যেন দোকানি তার নাম টাঙিয়ে রাখে! এ তো জনমানসে বিভাজন তৈরির চেষ্টা! লিখেছেন রাজদীপ সরদেশাই

Advertisement

বেশ কয়েক বছর ধরেই একটা টিভি শো আমি করে আসছি, ‘ইলেকশন অন মাই প্লেট’, যেখানে দেশজুড়ে নির্বাচনী প্রচারের গতিবিধি দর্শককে ঘুরে ঘুরে দেখাই, সঙ্গে থাকে খাওনদাওন ও পেটপুজোর উপরি অনুষঙ্গ। বলতে গেলে, এই উদরপুর্তিই শোয়ের তারকা! তা হবে না-ই বা কেন বলুন? ভারতের মতো এত দৃষ্টান্তমূলক খাদ‌্যবৈচিত্র বিশ্বের আর একটাও দেশে কি আছে? অথচ, এ-দেশেরই মধে‌্য আছে আরও একটা দেশ, যা দেশের নিগূঢ় সত্তায় আঘাত করতে ব‌্যস্ত– কানওয়ার যাত্রার সময় উত্তরপ্রদেশ এবং উত্তরাখণ্ডের পুলিশ কিনা খাবারের উপর নীতিপুলিশি করতে শুরু করেছে!

ভারত ছাড়া আর একটা দেশেও এই বৈচিত্র আপনি পাবেন না। যান দক্ষিণ ভারত। এই ধরুন মাদুরাই। ওখানে মীনাক্ষীপুরম মন্দিরের লাগোয়া জ্বলজ্বল করছে “আম্মা’জ কিচেন”– দেশের সেরা নন-ভেজ চেট্টিনাড় পদের ঠিকানা। কাঁকড়ার মাংস দিয়ে অমলেট, খরগোশের স্টু‌্য ওখানকার অন‌্যতম স্পেশাল আইটেম। এবার দেশের পশ্চিমে– রাজস্থান মূলত নিরামিষাশী জনগণেরই রাজ‌্য বলে ধারণা আমাদের। কিন্তু এখানেই পুরনো যোধপুরে ভরা আমিষ রেস্তোরঁার তল্লাটে আছে এমন একটা তিনতলা রেস্তোরঁা, যা প্রজন্মের-পর-প্রজন্ম ধরে চালাচ্ছে একটা মুসলিম পরিবার, একেবারে খাস মোগলাই খানাপিনা। আবার দক্ষিণে ফিরি, পুনে-সোলাপুর হাইওয়ের ধারেই পড়বে একটা ধাবা, নাম ‘জয় তুলজা ভবানী’। ওরকম সুস্বাদু মাটন আমি আর কোথাও খাইনি, বিশ্বাস করুন। ধাবা চালান একটা ধাঙড় পরিবার। উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন, এঁরা অনগ্রসর শ্রেণিভুক্ত। প্রচণ্ড ধার্মিক মানুষ সকলেই। এবং মনেপ্রাণে আমিষাশী। সেটা তঁাদের রান্নার হাতেই অনুভব করা যায়। বিজয়ওয়াড়ার রাস্তাজুড়ে স্ট্রিট ফুডের সারির কথাই বা ভুলি কী করে! সেখানে একটা স্টলে ছ’-রকমের অন্ধ্র বিরিয়ানি বিক্রি হচ্ছে, বলা বাহুল‌্য, আমিষ রান্না। আবার তার পাশেই ঢালাও সাজিয়ে বসেছে ইডলি-দোসার হেঁশেল!

[আরও পড়ুন: ঘনিষ্ঠ ‘বন্ধু’দের তালিকায় উপরের দিকে রাখা হোক ভারতকে, প্রস্তাব পেশ মার্কিন কংগ্রেসে

শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বরাবরই এই দেশের ভোজনপন্থা। এখানে মালিকের নাম দিয়ে নয়, খাবারের গুণেই বিচার্য রেস্তোরঁার নামডাক। কিন্তু, যোগী সরকার উত্তরপ্রদেশ পুলিশকে এই তদারকির নির্দেশ দিয়েছে, সেখানকার রাস্তায় রাস্তায় প্রতে‌্যকটা খাবার দোকানে যেন দোকানি তার নাম টাঙিয়ে রাখে! এ তো জনমানসে পুরোদস্তুর বিভাজন তৈরির কার্যকলাপ। যোগী সরকার যতই দাবি করুক না কেন, কানওয়ার যাত্রাপথে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তাদের এহেন নির্দেশ– কথাটা বিশ্বাসযোগ‌্য ঠেকে না। যুগ-যুগ ধরে চলে আসছে এই কানওয়ার যাত্রা– কই, কস্মিনকালেও তো এই পথে খাবার নিয়ে হাঙ্গামার খবর পাওয়া যায়নি! বরং, উত্তরপ্রদেশ সরকার খাবার নিয়ে এমন একটা ভেঁাতা বিভাজনমূলক ছক কষল যে, তাতেই ঝামেলা বাধল এই প্রথম।

নিয়মনির্দিষ্ট এমন নাম-ঝোলানো নেমপ্লেট মানেই আখেরে সামাজিক পৃথকীকরণ, যাতে পুরো যাত্রাপথে তীর্থযাত্রীরা মুসলিম দোকানগুলো এড়িয়ে যায়। এর পরিণতিতে, সমাজে বিভেদেরই বিষ তৈরি হয়, আর এমনটা করার পিছনে উদ্দেশ‌্য একটাই: জনমানসে ধর্মীয় মেরুকরণকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলা। কোনও দোকানি কি কঁাওয়ার যাত্রীদের ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধাচারী খাবার বিক্রি করতে দোকান বসাবে? এমনকী, নেমপ্লেট নিয়ে এই বিক্ষোভের সঙ্গে ইসলামীয় নীতি-নির্ধারিত ‘হালাল স্বীকৃত’ পণ‌্য নিয়ে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ নীরবতার তুলনা হচ্ছে, যার কোনও ভিত্তি নেই। দুটো সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়, আলাদা প্রতর্ক। কেউ তো ‘খঁাটি নিরামিষ’ বা ‘পিওর ভেজ’-অলা রেস্তোরঁাকে নির্দেশ দেয় না, এরকম বোর্ড ঝোলানো যাবে না! কিন্তু, খাবার নিয়ে বিজ্ঞাপন, যা একটা নির্দিষ্ট আহারপ্রণালীকে নির্দেশ করে; তার সঙ্গে রেস্তোরঁার মালিকের নাম টাঙিয়ে তাকে চিহ্নিত করার মধে‌্য বিঘত ফারাক।
যদিও বিষয়টা এখানেই থেমে থাকেনি। নির্লজ্জতার মাথা খেয়ে, মুসলিম-পরিচালিত দোকানগুলিকে উদ্দেশ‌্য করে সোশ‌্যাল মিডিয়ায় প্রচার অবধি শুরু হয়েছে যে– এখানকার খাবার ‘অশুদ্ধ’, ‘অপরিষ্কার’। এ তো ন‌‌্যক্কারজনক, ডাহা মিথ‌্যা, সাম্প্রদায়িক কুৎসা, রটনা। যে কোনও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষ এমন বচনের ফঁাদে পড়ে যাবে! এই দেশের জিভে-জল-আনা স্ট্রিট ফুডে চিরকালই পরিচ্ছন্নতা একটা মাথাব‌্যথা, কিন্তু তা তো কখনওই সম্প্রদায়-নির্দিষ্ট ছিল না, নেই-ও। ‘ফুড সেফটি অ‌্যান্ড স্ট‌্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া’-র (এফএসএসএআই) কাজ খাবারের মান ও তার গুণাগুণ বহাল আছে কি না, তা নিশ্চিত করা। কিন্তু, রেস্তোরঁার মালিকের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে পরিচ্ছন্নতা পরীক্ষা করা তো কাজ হতে পারে না!

[আরও পড়ুন: বাংলার বীর কণাদের স্মৃতি ফিরল কার্গিলে, ভাইয়ের মরণোত্তর সম্মান নিয়ে চোখে জল দিদির]

এই ঘটনার সঙ্গে তুলনায় আসতে পারে কোভিড-কালে তবলিঘ-ই-জামাতে জমায়েত। কোভিড সংক্রমণের প্রথম ঢেউয়ের সময়, এই জমায়েতকে কেন্দ্র করে প্রচুর কোভিড কেস বেড়েছিল বলে, দেশজুড়ে সমস্ত ইসলাম সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষকে ‘করোনা স্প্রেডার’ বলে তকমা দেওয়ার হিড়িক পড়েছিল। এতটাই সংক্রমক ছিল এই ঘৃণা যে, সাধারণ মুসলিম আনাজ-বিক্রেতাদের অর্থনৈতিকভাবে বয়কট করতে শুরু করেছিল শহুরে উচ্চবিত্ত, মধ‌্যবিত্তরা। অনুরূপ কোনও তিক্ত প্রভাবই হাসিল করে ফেলত কঁাওয়ার যাত্রা ঘিরে এমন সাম্প্রদায়িক বিভাজন, যদি না চটজলদি সুপ্রিম কোর্ট মধ‌্যস্থতা করত, এবং ঘোষণা করত এর বিরোধিতা প্রকাশ করে যে– এমন নির্দেশ আক্ষরিকভাবে অসাংবিধানিক, জীবন ও ব‌্যক্তি-স্বাধীনতার মৌলিক অধিকারকে লঙ্ঘিত করে।

উত্তরপ্রদেশে রাজ‌্য সরকার হিসাবে ক্ষমতাসীন বিজেপি, অথচ লোকসভায় যেরকম লজ্জাজনক ফল করেছে এরা এখানে, তাতে নির্বাচনী ফলপ্রকাশের কয়েক হপ্তা যেতে না যেতে যে এমন একটা ঘটনা ঘটল– তাতে আর অবাক হওয়ার কিছু নেই। ফলপ্রকাশের পর থেকে, বিজেপির এখানে এমনিতেই ল‌্যাজেগোবরে অবস্থা। এমন ফলের জন‌্য এ-ওকে দায়ী ঠাওরানোর খেলায় শেষমেশ আপাতভাবে একটা যুদ্ধ বেধে গিয়েছে রীতিমতো বিজেপি দলের মধে‌্য। আর এই সমস্তটায় কোণঠাসা করার চেষ্টা চলছে মুখ‌্যমন্ত্রী যোগী আদিত‌্যনাথকে।

পক্ষ নিতে-নিতে ক্লান্ত বিজেপির প্রধান ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, এখন এই ‌অাকচাআকচির খেলাটাকে ঘা-পুঁজ করে তুলতেই চাইছেন। এর নিরাময়ের ইচ্ছা উচ্চ নেতৃত্বের নেই বলেই জানা যাচ্ছে। যদিও, কম যান না এই গেরুয়াধারী সাধু নেতাও! যোগী আদিত‌্যনাথ তঁার সহজাত জনপ্রিয় প্রকরণে, তঁার অনুশোচনাহীন আক্রমণাত্মক বিবদমান হিন্দু যোদ্ধার ভঙ্গিমায় এর পাল্টা জবাব দিয়েছেন– কোনওরকম প্রথাগত রাজনৈতিক শুদ্ধতা বজায় রাখার দায় তঁার নেই, এবং কোনও শৃঙ্খলে তঁাকে বঁাধাও যাবে না। কানওয়ার যাত্রার ‘পবিত্রতা’ রক্ষার্থে তিনি বদ্ধপরিকর, আর তার জন‌্য যোগী সরকার হিন্দু পবিত্রতা রক্ষার্থে তার সমর্থকদের মধে‌্য গুরুত্ব আরোপ করবেই। সে তো ভাল কথা, কিন্তু, এর অর্থ যদি মুসলিম ব‌্যবসায়ী ও রেস্তোরঁা-মালিকদের একঘরে করা হয়, তাহলে বলতেই হচ্ছে– সমস্ত নির্দেশ একদম জেনে-বুঝে, ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নেওয়া। এবং সাংবিধানিক নৈতিকতার অবমাননা ও উল্লঙ্ঘনই ছিল এই সরকারের লক্ষ‌্য।

কিন্তু আদিত‌্যনাথ এবং তঁার সমর্থক শ্রেণি-সম্ভ্রমের সীমা ছাড়িয়ে ভুলই করল বলব। কারণ, তারা ভুলে গিয়েছে, সংখ‌্যাগরিষ্ঠ পরিচয়ের রাজনীতি দিয়ে নির্বাচনী সাফলে‌্যর সমীকরণ অধুনা গ‌্যারান্টিহীন। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের বিজেপি কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল দলিত-মুসলিম-যাদব-অনগ্রসর জোটে। কারণ, বিজেপি এখানে সার্বিকভাবে সবরকমের মানুষকে একসঙ্গে নিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক অ‌্যাজেন্ডা রাখতে ব‌্যর্থ। জাতিগত বৈষম‌্য ও ফাটলগুলো উল্টে আরও প্রকট হয়েছে এই সময়কালে এবং আবার তা চাগাড় দিল। এখন যেখানে মুসলিম ব‌্যবসায়ীর পেটে লাথি পড়ছে, কে নিশ্চয়তা দেবে যে, আগামী দিনে দলিত কিংবা আরও অনগ্রসর শ্রেণির মানুষ এরকমই কোণঠাসা হবে না? কারণ, ভুলে গেলে তো চলবে না, এই খাদ‌্য-সংক্রান্ত ‘পবিত্রতা’ ও ‘অচ্ছুত’-এর ধারণাই কয়েক শতক প্রাচীন হিন্দুত্ববাদের জাতিবৈষমে‌্যর আধার হয়ে আছে। কিন্তু, এঁদো অতীতের কুসংস্কারকে পুনর্জাগরিত না করে কুসংস্কারমুক্ত আলোময় ভবিষ‌্যতের অনুসন্ধানের চেষ্টা করাটাই একটা সরকারের কাজ। ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর অবধারণায় খাদ‌্যখাবার সংক্রান্ত রাজনীতি দিয়ে সাম্প্রদায়িক উসকানির কোনও জায়গা নেই।

পুনশ্চ: আমার ওই শোয়ের ভোজন-অভিলাষময় যাত্রায়, একটা খাবার খুব মনে পড়ে যাচ্ছে। উত্তরপ্রদেশ হাইওয়ের ধারে 'মুন্না’স কিচেন' নামে এক রেস্তোরঁায় তুরীয় একটা চিকেন কষা খেয়েছিলাম। মুন্না আদপে মালিকের ডাকনাম, ভাল নাম মহম্মদ খান। কিন্তু, তঁার রান্নাকারীদের মধে‌্য প্রধান যিনি, তিনি একজন যাদব। এটাই ভারত, এটাই ভারতের জাদু!

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
  • শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বরাবরই এই দেশের ভোজনপন্থা। এখানে মালিকের নাম দিয়ে নয়, খাবারের গুণেই বিচার্য হয় রেস্তোরঁার নামডাক।
  • কিন্তু, যোগী সরকার উত্তরপ্রদেশ পুলিশকে এই তদারকির নির্দেশ দিয়েছে, কানওয়ার যাত্রা উপলক্ষে সেখানকার রাস্তার প্রত্যেকটা খাবার দোকানে যেন দোকানি তার নাম টাঙিয়ে রাখে!
  • এ তো জনমানসে বিভাজন তৈরির চেষ্টা!
Advertisement