যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী সংসদের উদ্যোগে এক সন্ধ্যায় দর্শকের ভাবনার জগৎকে নাড়িয়ে দিল নাট্যদল 'যাপনচিত্র' প্রযোজিত 'পাপ'। ত্রিগুণা সেন মেমোরিয়াল অডিটোরিয়াম, যাদবপুরে শুক্রবার সন্ধ্যা ছ'টায় মঞ্চস্থ হওয়া এই নাটকটি দর্শকমহলে বিশেষ সাড়া ফেলেছে। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সমরেশ বসুর ছোটগল্প 'পাপ-পুণ্য' অবলম্বনে নাট্যরূপটি রচনা করেছেন সুমন টিংকু। এবং নির্দেশনার দায়িত্বে ছিলেন সুহান বসু।
'পাপ' নাটকের একটি দৃশ্য
সমাজের তথাকথিত নৈতিকতা, পাপ-পুণ্যের দ্বন্দ্ব এবং প্রান্তিক মানুষের জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে নাটকের কাহিনি। গল্পের মূল সুরকে অক্ষুণ্ণ রেখে সমকালীন সমাজ বাস্তবতার সঙ্গে তাকে মেলাতে পেরেছেন নির্দেশক। নাটক জুড়ে মানবিক টানাপোড়েন, বিশ্বাস ও ভণ্ডামির সংঘাত দর্শকদের গভীরভাবে ভাবিয়েছে। মঞ্চাভিনয়ে বিশেষভাবে নজর কাড়েন সুহান বসু (কালুরাম) ও সুমন কুন্ডু (বলরাম)। কালুরামের চরিত্রে সুহান বসু সংযত অথচ তীব্র আবেগের প্রকাশ ঘটিয়েছেন, অন্যদিকে বলরামের চরিত্রে সুমন কুন্ডুর অভিনয় ছিল শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য। পার্বতী চরিত্রে মধুমিতা ব্যানার্জির অভিনয় নাটকে আবেগের গভীরতা বাড়িয়েছে। জগাই চরিত্রে দেবপ্রিয় দত্ত-র অভিনয় বিশেষ প্রসংশার দাবী রাখে। কমলা দিদির চরিত্রে প্রাপ্তি ঘোষ এক সাবলীল অভিনয় উপহার দেন। ডোম চরিত্রে সুকুমার সর্দার ও সুবর্ণ ঘোষ, এবং পুরোহিতের ভূমিকায় অচিন চৌধুরী নাটকের সামগ্রিক ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
'পাপ' নাটকের একটি দৃশ্য
নাটকের আবহ নির্মাণে সৌরশান্ত বিশ্বাস এবং আবহ প্রক্ষেপণে সানন্দিতা চট্টোপাধ্যায় নাটকের আবেগকে আরও দৃঢ় করেছেন। আলো পরিকল্পনায় রঞ্জন বসু এবং প্রক্ষেপণে গোকুল চট্টোপাধ্যায়ের কাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আলো-আঁধারির খেলা দৃশ্যগুলিকে বিশেষত শ্মশান ও চিতার দৃশ্যগুলোকে জীবন্ত করে তুলেছে। তবে বেশ কিছু জায়গায় আলোর অভাব নাটকের তাল কেটেছে। নির্দেশনার পাশাপাশি মঞ্চসজ্জা ও মেকআপের দায়িত্বও সুচারুভাবে সামলেছেন সুহান বসু। নাটক শেষে দর্শকদের দীর্ঘ করতালিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রযোজনার সাফল্য। অনেক দর্শকই মত প্রকাশ করেন, 'পাপ' কেবল একটি নাটক নয়, বরং সমাজের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া এক তীক্ষ্ণ প্রশ্ন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী সংসদের এই উদ্যোগ আবারও প্রমাণ করল, অর্থবহ ও চিন্তাশীল নাটক আজও দর্শকের মন জয় করতে সক্ষম।
