বিদ্রোহী কবি মনের কোন গহীনে লুকিয়ে রাখেন এমন অতলান্ত প্রেম, বিরহ আর ভক্তির মেঘমল্লার? নজরুল মানে তো শুধু শিকল ভাঙার গান নয়, তিনি যে সুরের আকাশে একাধারে বসন্তের কোকিল আর শ্রাবণের বারিধারা। তাঁর সেই বহুমুখী সৃষ্টিসম্ভারকে ছুঁয়ে দেখতেই মেতে উঠেছিল তিলোত্তমা। নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তীতে কলকাতার সংস্কৃতি জগতের চেনা প্রতিষ্ঠান ‘বাণীচক্র’ আয়োজন করেছিল এক মায়াবী সন্ধ্যার। দক্ষিণ কলকাতার উত্তম মঞ্চে যেন রূপকথার জাল বুনলেন শিল্পীরা।
অনুষ্ঠানের শুরু থেকেই প্রেক্ষাগৃহে ছিল উপচে পড়া ভিড়। সুরের মায়াজালে একে একে ভেসে এল ‘দোদুল দোদুল দোলন চাঁপা’, ‘আমি বাদল হলাম ধূলির পথে’ কিংবা ‘হে পার্থ সারথি বাজাও বাজাও’-এর মতো চিরন্তন সব নজরুলগীতি। ইন্দ্রাণী সেন, দেবযানী রায়চৌধুরী থেকে শুরু করে দেবাশীষ ব্যানার্জিদের যোগ্য সঙ্গীত পরিচালনায় সমবেত ও একক কণ্ঠে শিক্ষার্থীরা তুলে ধরলেন কবির প্রেমের দুনিয়া। সংযুক্তা চক্রবর্তী, অদিতি চৌধুরী ও সুলগ্না নাইয়ার একক গান শ্রোতাদের আবিষ্ট করে রাখে।
গানের পাশাপাশি নৃত্যের ছন্দেও যেন প্রাণ পেলেন কবি। ‘নিম ফুলের মৌ পিয়ে’, ‘দূর দ্বীপবাসিনী’ কিংবা ‘হলুদ গাঁদার ফুল’-এর চেনা তালে পা মেলালেন একঝাঁক তরুণী। নিবেদিতা সরকার, মহাশ্বেতা মজুমদার গুপ্তদের নিখুঁত পরিচালনায় সেই নাচ দর্শকদের মন কেড়ে নেয়। শেষে আবৃত্তি পর্বটি অনুষ্ঠানের আবেগ আরও বাড়িয়ে দেয়।
কবির সৃষ্টির এই বহুমাত্রিক রূপ ফুটিয়ে তোলার পেছনে ছিল এক গভীর মানবিক বার্তা। সাম্য, দেশাত্মবোধ আর অসাম্প্রদায়িক চেতনার যে আলো নজরুল জ্বালিয়ে গিয়েছিলেন, বাণীচক্রের শিক্ষার্থীরা সেই মশালই তুলে নিলেন নিজেদের হাতে। নতুন প্রজন্মের হাত ধরে নজরুল-সংস্কৃতির এই চর্চা শুধু প্রশংসনীয় নয়, বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত জরুরিও বটে। সুর, তাল আর করতালির যুগলবন্দিতে উত্তম মঞ্চের সেই সন্ধ্যা হয়ে রইল এক স্মরণীয় যাপন।
