অরূপ বসাক, মালবাজার: কালিম্পংয়ের কমলালেবু চাষ এই বছর বড়সড় সংকটের মুখে। কোথাও লাগামছাড়া বানরের দৌরাত্ম্য, কোথাও আবার আচমকা শিলাবৃষ্টির ক্ষতি - সব মিলিয়ে জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় কমলাচাষিরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। সামসিং ও সংলগ্ন লোয়ার ঘুমতি গাঁও, আপার ঘুমতি গাঁও, ভালুখোপ, তিনকাটারি, চিপলেদাড়া এবং খোলাগাঁও - এই এলাকাগুলি বহুদিন ধরেই উন্নত মানের কমলালেবু চাষের জন্য পরিচিত। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে পাহাড়ি সংলগ্ন জঙ্গল থেকে নেমে আসা বানরের দল বেঁধে হামলায় কার্যত ভেঙে পড়েছে এই অঞ্চলের কমলা বাগান। অভিযোগ, পাকা ফল খেয়ে নেওয়ার পাশাপাশি অসংখ্য ফল নষ্ট করে দিচ্ছে বানরেরা।
স্থানীয়দের দাবি, বন দপ্তর ও হর্টিকালচার দপ্তরে একাধিকবার অভিযোগ জানানো হলেও এখনও পর্যন্ত কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সামসিংয়ের প্রবীণ কমলা চাষি প্রবীন প্রধান, সুরোজ প্রধান-রা বলেন,বহু বছর ধরে আমরা কমলা চাষ করে আসছি। একসময় এখান থেকে ট্রাকে ট্রাকে কমলা ডুয়ার্স এবং তরাই এর বিভিন্ন বাজারে যেত। সেই আয়েই সারা বছরের সংসার চলত। এখন বানরের উৎপাতের কারণে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেকে কমলা চাষ ছেড়ে অন্য কাজ করছে।
একই সুর শোনা যাচ্ছে দীপক ছেত্রী ও নবীন তামাংয়ের কণ্ঠেও। তাঁদের কথায়, প্রতিদিন বানরের আক্রমণ এতটাই বেড়েছে যে চাষিদের মধ্যে আর আগ্রহ বা আশা অবশিষ্ট নেই। ফলে গাছের পরিচর্যা, সার প্রয়োগ বা রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তবুও স্বাভাবিকভাবে যে সামান্য ফলন হচ্ছে এবং যা কোনওভাবে বানরের হাত এড়িয়ে বাঁচানো যাচ্ছে, সেটুকু বিক্রি করেই কোনওমতে দিন চলছে।
অন্যদিকে, গরুবাথানের নিমবস্তী বস্তী এলাকায় বানরের সমস্যা তেমন না থাকলেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ চাষিদের বিপাকে ফেলেছে। নভেম্বরের শুরুতে হওয়া শিলাবৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে কমলা বাগানের। এলাকার কমলা চাষি বিকেক সোনার, স্বপন ছাত্রীরা জানান, আমাদের ৮০-৯০ টি কমলা গাছের বাগান রয়েছে। গত বছর এইসব কৃষকেরা প্রায় দেড় লক্ষ টাকা আয় করেছিলেন। এইসব এলাকার কমলার স্বাদ ও গন্ধ আলাদা। এই এলাকার কৃষকেরা সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে কমলা চাষ করে, কোনও কীটনাশক ব্যবহার করে না। সেই কারণেই এইসব এলাকায় কমলার সুনাম রয়েছে। তবে এ বছর শিলাবৃষ্টিতে কিছুটা ক্ষতি হয়েছে।” গরুবাথানের রাইগাঁও বস্তীর নির্জল রাই ও শুভরাজ থাপার বাগানের অনেক গাছই ৩০ থেকে ৪০ বছরের পুরনো। গত কয়েক বছর ধরে ফলন কমতে থাকায় তাঁরা পরীক্ষামূলকভাবে নতুন চারা রোপণ শুরু করেছেন। ফলন ভালো হলে ভবিষ্যতে আরও গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান নির্জল। তবে পুরো জেলায় হতাশার মধ্যেও আশার আলো রয়েছে। প্যারেন, তোদে-তাংতা, চুইখিমের ওপরে মুঙপেল গ্রামে এ বছর কমলার ফলন ও মান তুলনামূলকভাবে ভালো হওয়ায় স্থানীয় কৃষক কমল গিরি ও সুরজ লিম্বুদের মতো চাষিরা কিছুটা হলেও আশাবাদী।
কমলালেবু চাষের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে কালিম্পং জেলা হর্টিকালচার আধিকারিক সঞ্জয় দত্ত জানান, কালিম্পং জেলার পাহাড়ি অঞ্চলে কমলা চাষের জন্য প্রয়োজনীয় দোআঁশ বা বেলে দোআঁশ মাটি, উপযুক্ত অম্লতা, পর্যাপ্ত সূর্যালোক, বৃষ্টিপাত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৯০০ থেকে ১৮০০ মিটার উচ্চতা-সবই বিদ্যমান। তিনি আরও বলেন, “বর্ষার শুরু ও শেষে গাছের সঠিক পরিচর্যা অত্যন্ত জরুরি। ছত্রাকজনিত ‘ডাই ব্যাক’ রোগ প্রতিরোধে সতর্কতা প্রয়োজন। এই বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ শিবিরের মাধ্যমে চাষিদের সচেতন করা হচ্ছে। পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধী নতুন প্রজাতির কমলার চারা বিতরণ, বানরের হাত থেকে ফসল রক্ষার উপায় এবং বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়েও দপ্তর কাজ করছে।”
জেলা হর্টিকালচার দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, কালিম্পং জেলায় প্রায় ১৭০০ হেক্টর জমিতে কমলালেবু চাষ হয়। গত বছর প্রতি হেক্টরে গড়ে ৮ থেকে ১০ টন ফলন হয়েছিল। তবে চলতি বছরে সেই লক্ষ্যমাত্রা আদৌ পূরণ হবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন আধিকারিক থেকে শুরু করে চাষিরাও। একসময় কালিম্পং জেলার অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল কমলালেবু চাষ। বানরের উপদ্রব, প্রতিকূল আবহাওয়া ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে সেই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে-এমনটাই আশঙ্কা স্থানীয়দের।
