রূপচর্চার ঘরোয়া আকর্ষণ বহু প্রাচীন। ইতিহাসে এমন বহু সুন্দরী ও প্রভাবশালী রানির উল্লেখ রয়েছে, যাদের সৌন্দর্য, কমনীয়তা এবং ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ তৎকালীন শাসক, বীর এবং সাধারণ মানুষকে বিমোহিত করেছিল। মেবারের প্রাঙ্গণ থেকে শুরু করে মুঘলদের অন্তরালে রানিদের রূপের দ্যুতি আজও ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করে। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, কী এমন পদ্ধতিতে সেদিনকার রূপচর্চা চলত, যা আজও সমান প্রাসঙ্গিক? এস্থেটিশিয়ানদের মতে, প্রাকৃতিক উপাদান, আয়ুর্বেদ এবং দেশীয় উপায়ের জাদুতেই লেখা হয়েছিল সেই রূপকথা। প্রাচ্যের সেই চিরাচরিত রূপটানের রহস্য আজও প্রাসঙ্গিক।
ছবি: সংগৃহীত
মুঘল যুগে সুগন্ধি এবং ফুলের ব্যবহারের আলাদা স্থান ছিল। সম্রাট জাহাঙ্গীরের মহিষী নূরজাহানের সৌন্দর্যের নেপথ্যে ছিল প্রাকৃতিক গোলাপের জাদুস্পর্শ। কথিত আছে, গোলাপজল তৈরি করতে গিয়েই তিনি আবিষ্কার করেন মহার্ঘ গোলাপের আতর। নিয়মিত গোলাপজলে স্নান এবং ত্বকে গোলাপের ব্যবহার ত্বককে সতেজ ও উজ্জ্বল রাখত। এ ছাড়া সুবাস ধরে রাখতে চমেলি বা কেওড়ার ব্যবহারেরও যথেচ্ছ চল ছিল। চুলকে রেশমের মতো নরম রাখতে তারা ব্যবহার করতেন বিশেষ জড়ি-বুটি মেশানো তেল এবং প্রাকৃতিক মেহেদি। বিষাক্ত রাসায়নিকের বদলে চোখের সাজে শোভা পেত চিকিৎসাগুণ সম্পন্ন বিশেষ সুরমা।
ছবি: সংগৃহীত
মরুভূমির শুষ্ক হাওয়া থেকে ত্বককে রক্ষা করতে রাজপুত রানিরা শরীরে আর্দ্রতা বজায় রাখতেন। সাবানের বিকল্প হিসেবে তারা ভরসা রাখতেন খাঁটি বেসন, হলুদ, চন্দন, দই ও কাঁচা দুধের তৈরি বিশেষ উপটানে। ত্বকের অকাল বার্ধক্য ও পিগমেন্টেশন রুখতে রানি পদ্মাবতী নিয়মিত ব্যবহার করতেন জাফরান ও চন্দনের লেপন। চুলের জন্য ব্যবহৃত হত তিল বা সর্ষের তেলে আমলকী, ভৃঙ্গরাজ এবং মেথি ফোটানো বিশেষ নির্যাস। চুলের প্রাক-পরিচর্যা বা কন্ডিশনিংয়ের জন্য রিঠা ও শিকাকাই ছিল তাঁদের নিত্যসঙ্গী।
ছবি: সংগৃহীত
দক্ষিণ ভারতের ত্রাভাঙ্কোর রাজপরিবারে প্রাধান্য পেত কেশচর্চা। নারকেল তেলের সঙ্গে কারিপাতা, জবা ফুল এবং ভৃঙ্গরাজের প্রলেপ চুলকে করত দীঘল ও ঘন। মুখের সৌন্দর্যে ব্যবহৃত হত কস্তুরী হলুদ, চালের গুঁড়ো ও সবুজ মুগের গুঁড়োর ফেসপ্যাক।
অন্য দিকে, জয়পুরের মহারানি গায়ত্রী দেবীর রূপচর্চার দর্শন ছিল একদম আলাদা। কম প্রসাধনী ব্যবহার এবং ত্বক পরিষ্কার রাখাই ছিল তাঁর মূল মন্ত্র। সুষম খাদ্যতালিকা, নিয়মানুবর্তিতা আর হালকা আইলাইনারেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিশ্ববন্দিত রূপসী।
রাজকীয় এই প্রাকৃতিক রূপটান আজও আধুনিক রূপচর্চার অন্যতম সেরা দিশারী।
