প্রেমের আকাশে মেঘ জমতে কতক্ষণ! সম্পর্কের গোড়ার দিকে যে মানুষটার মেসেজে ফোনের স্ক্রিন আলো হয়ে উঠত, রাতের পর রাত কেটে যেত ফিসফিসে ফোনালাপে, হঠাৎই সে কেমন যেন বদলে গেল একদিন! কাছে আসতেই না আসতেই বাড়ল দূরত্ব। যেন এক টুকরো কর্পূর। মোড়ক খুলতে না খুলতেই উবে গেল হাওয়ায়। প্রেমের এই চোরাবালির নতুন নাম ‘পাফার-ফিশিং’ (Puffer-fishing)। জেন জি প্রজন্মের ডেটিং ডিকশনারিতে ইদানীং এই শব্দেরই রমরমা বাজার।
প্রতীকী ছবি
নামে মাছের গন্ধ থাকলেও, এর সঙ্গে সমুদ্রের নোনা জলের কোনও যোগ নেই। বরং এ হল মনের গহীনের এক জটিল মনস্তত্ত্ব। এই ধরনের সম্পর্কের শুরুতে বসন্তের হাওয়া থাকে। চনমনে প্রেম, ঘন ঘন দেখা হওয়া, আবেগের দেদার আদানপ্রদান। কিন্তু যেই না সম্পর্কটা একটু থিতু হতে যায়, গভীরতা বাড়ে, অমনি উলটো দিকের মানুষটির ভোলবদল ঘটে। কোনও কারণ ছাড়াই সে গুটিয়ে নেয় নিজেকে। কেউ ফোন ধরা কমিয়ে দেন, কেউ মেসেজের উত্তর দেন দু’দিন পর। কেউ বা আবার কোনও কৈফিয়ত না দিয়েই কর্পূরের মতো উবে যান।
প্রতীকী ছবি
লেখিকা কাটি মর্টনের মতে, এই স্বভাবটা হুবহু পাফার মাছের মতো। সমুদ্রে এই মাছটি বিপদ দেখলেই নিজেকে ফুলিয়ে কাঁটাযুক্ত বল বানিয়ে ফেলে। সম্পর্কেও একদল মানুষ ঠিক এই কাজটাই করে থাকেন। অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলেই তাঁদের মনে এক অদৃশ্য বিপদের ঘণ্টা বেজে ওঠে। তাঁরা ভাবেন, এই বুঝি নিজের স্বাধীনতা গেল! এই বুঝি আটকে পড়তে চলেছেন শিকলের বন্ধনে। ব্যস, নিজেদের আড়াল করতে চারপাশে তুলে নেন এক দুর্ভেদ্য দেওয়াল।
এই লুকোচুরি খেলার চোরাস্রোত লুকিয়ে থাকে মূলত শৈশবে। মনোবিদরা বলছেন, যাঁরা ছোটবেলায় অবহেলা বা অস্থির পরিবেশের মধ্যে দিয়ে বড় হয়েছেন, তাঁদের মনে এই ভয়টা জাঁকিয়ে বসে থাকে ছোট থেকেই। কাউকে সহজে বিশ্বাস করতে পারেন না তাঁরা। সম্পর্ক একটু ‘সিরিয়াস’ মোড় নিলেই তাঁদের মনে হয় তাঁরা খাঁচায় বন্দি হতে চলেছেন। ফলে শুরু হয় ‘হট-অ্যান্ড-কোল্ড’ আচরণ। কখনও খুব কাছে আসা, আবার পরক্ষণেই যোজন দূরে চলে যাওয়া। সঙ্গীর খুঁত খোঁজা তখন তাঁদের রোজকার অভ্যেস হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতীকী ছবি
তবে এদেরকে ঢালাও ‘ভিলেন’ বানানো বোধহয় ভুল হবে। সম্পর্কে স্পেস বা নিজস্ব সময় চাওয়া অন্যায় নয়। কিন্তু মুশকিলটা হয় যোগাযোগের অভাবে। কিছু না জানিয়ে হঠাৎ উধাও হয়ে গেলে অন্য মানুষটার মানসিক অবস্থা খাদের কিনারে গিয়ে পৌঁছয়। এই কানামাছি খেলা থেকে মুক্তির একটাই উপায়। সম্পর্কের বাঁধন মজবুত করতে চাইলে ভয় পেয়ে পালানো বন্ধ করতে হবে। 'মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন'-এর মতো একে অপরের মুখোমুখি বসে মন খুলে কথা বলাই এই পাফার-ফিশিংয়ের একমাত্র ওষুধ।
