দাবার বোর্ডে রাজা-মন্ত্রী থাকতে পারে। কিন্তু সত্যিকারের মন্ত্রী-রাজাদের কি ঠাঁই হওয়া উচিত মাঠে ময়দানের লড়াইয়ে? একসময় পোরবন্দরের মহারাজা নটবর সিংজি ভারতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হয়েছিলেন। সেটাও ব্রিটিশদের খুশি করে নিজের ক্ষমতা জাহির করেই। কিন্তু এখানে সেকথা আমরা বলছি না। মাঠের খেলায় অংশ নেওয়ার রাজনীতিতে রাজা-বাদশার ইনফ্লুয়েন্স নয়, বরং খেলার মাঠের রাজনীতির বিষবৃক্ষের কথাই হচ্ছে। শনিবার থেকে শুরু হতে যাচ্ছে টি২০ বিশ্বকাপ। কিন্তু খেলার চেয়ে ঢের বেশি আলোচনা চলছে ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ নিয়ে। এই লেখা লেখার দিনই জম্মু কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লা বলেছেন, ভারত-পাক ম্যাচ এখন যুদ্ধেরই সমতুল। কেননা এখন খেলা ও রাজনীতির মধ্যে তফাত নেই! স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে, অতীতেও কি এতটাই তিক্ত ছিল আবহ? নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ খারাপ দিকে গিয়েছে বাইশ গজে দুই প্রতিবেশীর ক্রিকেট-যুদ্ধ!
শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা ‘শীতের দুপুরে দুই প্রতিবেশী’ বইটি যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানেন, দুই দেশের শুরুর দিকের টেস্টের রোদমাখা সুন্দর দিন, হাড়কাঁপানো হাওয়ায় ভেসে আসা লাল বলের জৌলুসময় সময়ের কথা। ১৯৬৫ এবং ১৯৭১ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে জোড়া যুদ্ধে অবশ্য দেড় দশকের বেশি সময় দু'দেশের মধ্যে কোনওরকম দ্বিপাক্ষিক সিরিজ হয়নি। ১৯৭৮ সালে ফের ক্রিকেটে ফেরে দুই দেশ। এরপর এল ১৯৮৩। তিরাশিতে ভারতের প্রুডেনশিলাপ কাপ তথা বিশ্বকাপ জয় স্রেফ এক নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়নের আবির্ভাব মাত্র নয়। এই দেশে তো বটেই। বলা যায়, উপমহাদেশীয় ক্রিকেটকেই সাহেবদের সামনে সগর্বে তুলে ধরা! কার্যত এই বার্তা দেওয়া যে, আমরাও কম নই। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার পাশাপাশি নিউজিল্যান্ডের 'দাদাগিরি'র উলটো দিকে একটা নতুন ক্ষমতা বলয়ের আভাস ফুটে উঠতে শুরু করল যেন! কয়েক বছরের মধ্যেই যা মজবুত হয়ে গেল।
মুখোমুখি ভারত-পাকিস্তান। ফাইল ছবি
মনে রাখতে হবে, ১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপ ক্রিকেটের কথা। রিলায়েন্স কাপ নামের সেই প্রতিযোগিতা আয়োজনে হাতে হাত রেখে কাজ করেছিল ভারত ও পাকিস্তান। ভারতীয় বোর্ডের মাথায় ছিলেন এনকেপি সালভে, যিনি আদতে একজন রাজনীতিবিদ। অন্যদিকে পাকিস্তানের দায়িত্বে নুর খান যিনি একজন এয়ার মার্শাল। আজ এটা স্রেফ নস্ট্যালজিয়া। এশিয়া কাপের করমর্দন বিতর্কের আবহে কার্যতই রূপকথা বলে মনে হয়।
১৯৯৬ বিশ্বকাপও আয়োজন করেছিল ভারত-পাকিস্তান। সঙ্গে ছিল শ্রীলঙ্কাও। দ্বীপরাষ্ট্রে খেলতে যায়নি অস্ট্রেলিয়া। তা নিয়ে জলঘোলা কম হয়নি। কিন্তু ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে এই নিয়ে কোনও টেনশন ছিল না। যদিও কোয়ার্টার ফাইনালে দুই দেশের দ্বৈরথ ঘিরে উত্তেজনা কম ছিল না। না খেলতে পারার জন্য কম গঞ্জনা সইতে হয়নি ওয়াসিম আক্রমকে। গ্যালারি 'আওয়াজ' দিয়েছিল মিঁয়াদাদকে। কিন্তু ১৯৯৯ সালে কোমরের অকথ্য যন্ত্রণা নিয়ে শচীনের শতরানের পরও পাকিস্তান হাড্ডাহাড্ডির টেস্টে জিতে যায়। অথচ গোটা স্টেডিয়াম সেদিন উঠে দাঁড়িয়ে 'স্ট্যান্ডিং ওভেশন' দিয়েছিল পাক দলকে। যদিও ১৯৯৯ কার্গিল যুদ্ধের পর ফের দু'দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেট বন্ধ হয়ে যায়, তবু... ২০০৪ সালের ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট সিরিজের নাম কিন্তু ছিল 'ফ্রেন্ডশিপ সিরিজ'।
আসলে তখনও ভূ-রাজনৈতিক উদ্বেগের ঝড়টা সরকার, রাজনৈতিক দলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন দৈনন্দিন সামাজিক জীবনে বিষবৃক্ষের প্রভাব এমনভাবে পড়েছে যে, সাধারণ ভারতীয় সাধারণ পাকিস্তানিকে শত্রু হিসেবে দেখে। সাম্প্রতিক সময়ে যার মধ্যে ঢুকে পড়েছে আরেক প্রতিবেশী বাংলাদেশও। ফলে পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে।
এবছরের শুরুতেই বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া একটি ঘোষণা করেন। জানিয়ে দেন, কলকাতা নাইট রাইডার্সকে আইপিএলের স্কোয়াড থেকে বাংলাদেশের তারকা পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দিতে হবে। আজকের সময়ে এই উপমহাদেশে খেলার সঙ্গে রাজনীতির যে প্রবল যোগ, তা স্পষ্ট হয়ে যায় এমন ঘোষণায়। যে পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বেমালুম ভুলে গেল ২০০১ সালে তাদের টেস্ট খেলাই হত না জগমোহন ডালমিয়া না থাকলে!
হাসিনা সরকার উৎখাত হয়ে যাওয়ার পরও প্রবল হয়ে ওঠে ভারতবিরোধী হাওয়া। যা ক্রমশ উত্তপ্ত থেকে উত্তপ্ততর হয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের মতো ভারতবিরোধী সংগঠনের লাগাতার প্রচার, সম্প্রতি পরপর সংখ্যালঘু হত্যা ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হয়েছে। বাংলাদেশে বেশকিছু ভিসা কেন্দ্র বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র। আর এই আবহেই আইপিএলে মুস্তাফিজুর রহমানের খেলা নিষিদ্ধ করেছে বিসিসিআই। এরপর বাংলাদেশ জানিয়ে দেয় তারা ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে রাজি নয়। এর জন্য নিরাপত্তাকে ইস্যু করে তারা। নানা আলোচনার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দেয় আইসিসি। তবে নিজেদের ‘গোঁয়ার্তুমি’ বজায় রাখে বিসিবি। শেষ পর্যন্ত সরকারিভাবে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার কারণ জানিয়ে কড়া বিবৃতি দেয় আইসিসি।
এই পরিস্থিতিতে ফের প্রকাশ্যে এসে পড়ে ভারত-পাকিস্তানের 'শত্রুতা'র ছায়া। তারা বাংলাদেশের সঙ্গে 'বন্ধুত্ব' দেখিয়ে ভারতের সঙ্গে ম্যাচ বয়কট করেছে পাকিস্তান। অন্য ম্যাচ ঠিক আছে, কিন্তু ভারতের বিরুদ্ধে খেলতেই যত আপত্তি ইসলামাবাদের! আইসিসি’র শাস্তির খাঁড়া নেমে আসতে পারে পাক বোর্ডের উপর। কিন্তু সেটা অন্য প্রসঙ্গ। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খোয়াজা আসিফের দাবি, দক্ষিণ এশিয়ায় আইসিসি ভারতের রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য বন্দি হয়ে গিয়েছে। এ যেন ইশপের গল্প! নিজের দোষটা পিছনে ঝুলিয়ে সামনে কেবল অন্যের দোষ রেখে আত্মতৃপ্তি লাভের চেষ্টা।
'অপারেশন সিঁদুর' পরবর্তী সময়ও কিন্তু ভারত বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতায় খেলতে আপত্তি করেনি। অথচ 'সন্ত্রাসীদের আশ্রয়দাতা' পাকিস্তান এখন বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়ে ভারতে সঙ্গে ম্যাচ বয়কট করতে ব্যস্ত! এহেন অবস্থায় বলাই যায়, ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট-সেতু কিন্তু চূর্ণ হয়ে গিয়েছে। 'অনুঘটক' বাংলাদেশের কারণে সেই ভাঙা সেতু আর জোড়া লাগা মুশকিল। হয়তো অসম্ভবও।
