shono
Advertisement

Breaking News

Adamya Movie Review

তথাকথিত শ্রেণিতন্ত্রের পর্দা সরিয়ে অন্য বাংলার দিকে তাকাতে বাধ্য করে ‘অদম্য’, কেমন হল ছবি? পড়ুন রিভিউ

ঋতুপর্ণ ঘোষ একটা স্ট্যান্ডার্ড সেট করে দিয়েছিলেন, সেটারই খানিক এদিক আর ওদিক, কপি হতে-হতে সিনেমায় বাঙালির সত্যি চেহারাটা ভুলতে বসেছি ক্রমশ।
Published By: Arani BhattacharyaPosted: 02:35 PM Feb 13, 2026Updated: 03:12 PM Feb 13, 2026

বাংলা ছবির দৃশ্যকল্প বহুকাল থেকেই এক ধাঁচের হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণত যে আর্থসামাজিক বর্গকে তুলে ধরা হয় অর্থাৎ রুচিশীল ইন্টেলেকচুয়াল বাঙালি তাঁদের ড্রইং রুম, বেড রুম, পর্দার প্রিন্ট, আলোচনার বিষয়, পারস্পরিক সমীকরণ বা ক্রাইসিসের খুব একটা পরিবর্তন দেখিনি অনেকদিন। ঋতুপর্ণ ঘোষ একটা স্ট্যান্ডার্ড সেট করে দিয়েছিলেন, সেটারই খানিক এদিক আর ওদিক, কপি হতে-হতে সিনেমায় বাঙালির সত্যি চেহারাটা ভুলতে বসেছি ক্রমশ। মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, খুব ধনী, যে কোনও শ্রেণিরই স্টিরিওটাইপ তৈরি করে দিয়েছে বর্তমান বাংলা সিনেমা। এমন একটা সময়ে রঞ্জন ঘোষ পরিচালিত ‘অদম্য’ যেন দমকা হাওয়া। এক ঝটকায় ফ্যাব ইন্ডিয়াসুলভ নান্দনিক পর্দা সরিয়ে দিয়ে আরেক বাংলার দিকে তাকাতে বাধ্য করে। মুহূর্তে বাংলা ছবির চেনা সেটআপ বদলে যায়। শহুরে দর্শক সন্দিহান হয়ে পা রাখে অচেনা পরিসরে। আমরা দেখি একলা ছেলে হাঁটছে সেই পথে। তার নাম পলাশ (অভিনয়ে আরিয়ুন ঘোষ)। সে একা কেন? আর কেনই বা সে শহর ছেড়ে দূরে চলে যাচ্ছে ক্রমশ? আধুনিক জীবন, সভ্যতা, সমাজ, সবকিছু ছেড়ে সে শহর থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে জঙ্গল, জঙ্গল থেকে জমির শেষ প্রান্ত–সমুদ্রতীরে এসে দাঁড়িয়েছে। মনে পড়ে যায় সেই ক্রমাগত স্কুল পালানো, কারেকশনাল হোম থেকে পালানো ‘অ্যান্তোয়েন ডইনেল’-এর (দ্য ফোর হান্ড্রেড ব্লো’জ, ১৯৫৯) কথা।

Advertisement

'অদম্য' ছবির দৃশ্য, ছবি: সংগৃহীত

সময় পালটেছে, পৃথিবী পালটেছে কিন্তু সমাজচ্যুত হয়ে অন্য পথে হাঁটার তাগিদ এবং কারণ এখনও জিইয়ে আছে। তাদের আমরা কখনও দলছুট, কখনও অ্যান্টিন‌্যাশনাল, কখনও বিপ্লবী, কখনও আইন অমান্যকারী, কখনও দাগি আসামিও বলে থাকি। রাষ্ট্র, সমাজ তাদের মেনে নেয় না। তাদের অনেকেই চিরতরে হারিয়ে যায় নাজিব আহমেদের (১৬ অক্টোবর, ২০১৬ সালে জে.এন.ইউ থেকে নিখোঁজ) মতো অথবা গৌরী লঙ্কেশের মতো। রঞ্জনের ছবিতে পলাশেরও ঠাঁই নেই এই সমাজে। সে রাষ্ট্রের বিরোধিতা করেছে, পুলিশ তার পিছনে ফেউয়ের মতো লেগে আছে। তাঁকে নিয়েই গোটা ছবি। গ্রাম থেকে গ্রামাঞ্চলে তার একা যাপন। একেবারে ন্যূনতম উপাদানে তার প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প বলে ‘অদম্য’। সেই গ্রামের চায়ের দোকানের ছোট্ট ছেলে কিংবা জেলেদের বেঁচে থাকা দেখি পলাশের চোখ দিয়ে। জল, জঙ্গল, জমিনের ছবি উঠে আসে। বাংলা ছবিতে এমন দৃশ্য দেখেছি বলে মনে পড়ে না।

'অদম্য' ছবির কলাকুশলীরা, ছবি: সংগৃহীত

পলাশের চরিত্রে আরিয়ুনের অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় যদি হয় এই ছবির এক স্তম্ভ তাহলে অর্কপ্রভ দাসের সিনেমাটোগ্রাফি এই ছবির আরেক স্তম্ভ। ‘অদম্য’-র স্টোরিটেলিং-এ সিংহভাগ সাহায্য করেছে অর্কপ্রভ দাসের ক্যামেরা এবং তার ক্যামেরা এতটাই কার্যকরী যে অনেক সময় ভয়েস ওভার আর সংলাপ বাড়তি মনে হয়েছে। তার প্রতিটা ফ্রেম খুব সহজ, বিশ্বাসযোগ্য এবং কিছু জায়গায় অবিশ্বাস্য। ছবির সংলাপ আর ভয়েসওভারে আরও যত্ন নেওয়া যেত। তবে পরিচালক রঞ্জন ঘোষের মাস্টারস্ট্রোক ছবির একদম শেষে। বিপ্লবী এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নানা উল্লেখ গোটা ছবি জুড়ে রয়েছে। দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, দেশোদ্ধারের কাজে যেন কেবল পুরুষরাই! কিন্তু ছবির শেষে জানা যায়, পলাশের অসমাপ্ত কাজ তাদেরই দলের একটি মেয়ে সম্পন্ন করেছে। এই অন্তর্ভুক্তি খুব জরুরি বার্তা দেয়। কারণ একটা জিনিস বুঝতে হবে, বর্তমান সময়ে যে কোনও সংবেদনশীল মানুষই গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং প্রভাবিত। ফলে সেই ক্ষতির মুখে দাঁড়িয়ে লিঙ্গ-জাতি-শ্রেণি নির্বিশেষে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে সেটাই কাম্য। কিছু মানুষ আপস না করে, কমফোর্ট জোন থেকে বেরিয়ে তাদের প্রতিবাদ জারি রাখবে চিরকাল, পরিচালক রঞ্জন ঘোষের ‘অদম্য’ সেই বার্তাই দিয়ে যায়। বাংলা ছবির দর্শক কি তাদের কমফোর্ট জোন থেকে বেরোতে পারবে?

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement