নির্মল ধর: বাংলার ফিল্ম পরিচালকরা সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে ছবি করতে সাহস করেন না, পাছে রাজনীতি বা কোনো দলের রং লেগে যায়। এমন একটা আশঙ্কা ও ভয় নাকি বিনোদুনিয়ায় প্রচলিত। আজকের অধিকাংশ দল এবং তাদের নেতারাও বহুলাংশে এই সত্যটি অস্বীকারও করতে পারেননা। কিন্তু আমাদের চারদিকে প্রায় প্রতিটি ঘটনা নিয়ে যে রাজনৈতিক তরজা নামের খেউড় চলে মিটিং মিছিলে, খবরের কাগজের পাতায়, টিভির পর্দায়। সেখান থেকেই স্পষ্ট টালিগঞ্জের ছবিকরিয়েরা নিরাপদ ও নিশ্চিত দূরত্ব রাখতে সর্বদা অতি সতর্ক। এই প্রথম, স্পষ্টভাবে সেই নীরবতা ভাঙলেন রাজ চক্রবর্তী। তিনি যে শাসকদলের ঘনিষ্ঠ, সেটা সব্বাই জানেন। তবুও তিনি যাদবপুর (ছবিতে নাম যদুপুর) বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের এক তরুণ ছাত্রের র্যাগিংয়ের কারণে মৃত্যুকে নিয়ে ক' বছর আগে যে রাজ্যজুড়ে শুধু ছাত্র বিক্ষোভ নয়, জনরোষ গর্জে উঠেছিল, এবং একই সঙ্গে পুলিশ ও প্রশাসনের দিক থেকে সেই ঘটনার তদন্ত নিয়ে যে ঢিলেমির অভিযোগ উঠেছিল তা নিয়ে অনেকদিন আলোচনা পর্যালোচনা হয়েছে, এবং শেষ পর্যন্ত দোষীরা শাস্তি পেয়েছে কিনা আজও রহস্যময়।
ছবির শুরুতেই অবশ্য অকপটে পরিচালক রাজ চক্রবর্তী জানিয়ে দিয়েছেন "সত্য ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই ছবির গল্প ভেবেছন তিনি। চিত্রনাট্য লিখতে গিয়ে অবশ্যই ফিল্মিক কিছু স্বাধীনতা নিতেই হয়েছে সৌভিক ভট্টাচার্যকে। এবং ছবির শেষে জানিয়েও দিয়েছেন পাশবিক র্যাগিং এর বিরুদ্ধে 'হোক কলরব' লড়াই জারি থাকতেই পারে, থাকবেও। এবার আসা যাক ছবির নির্মাণশৈলীর প্রসঙ্গে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সৌভিকের চিত্রনাট্য অনেকটাই থ্রিলারের আকারে লেখা। পরিচালক রাজ প্রায় সব চরিত্র, ঘটনা, ঘটনার পরম্পরা, সেই সব ঘটনার প্রেক্ষিতগুলোও সুন্দরভাবে সাজিয়েছেন, মানস গাঙ্গুলির ক্যামেরা ছাত্রদের হোস্টেল, তাদের উত্তেজক মিছিল, থানা আক্রমণই নয়, ছাত্রনেতাদের বিভিন্ন কার্যকলাপ, তাঁদের রাগিং কাজটির পশ্চাৎপটও বিশ্লেষণ করেছেন। সেখানে কোনও রাজনৈতিক দলের ঝাণ্ডা না দেখিয়েও তাদের শরীরী ভাষা ও কিছু মাঝারি মাপের নেতার সামাজিক ক্রিয়াকর্মের দৃশ্য ও প্রধান ছাত্রনেতা হোস্টেল বাবা গৌরবের উচ্চাশার স্বপ্নের কথা শুনিয়ে ও দেখিয়ে প্রকারান্তরে বুঝিয়ে দিয়েছেন যদুপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠন কাদের অধিকারে ছিল। নিশ্চিতভাবেই তাঁর এই সুচতুরতার সঙ্গে নিরপেক্ষতার ভণিতা থাকার প্রশংসা করতেই হবে। রাজ পুরো ছবিটিকে বাংলার ছাত্র রাজনীতিতে 'হোক কলরব' পর্বের এক দলিল করে তোলার প্রয়াসই নিশ্চয়ই, এবং তা সফলও। ওই ঘটনার তদন্তে থাকা পুলিশ অফিসার ক্ষুদিরাম মাঝির (শাশ্বত) সঙ্গে ছাত্রদের মোলাকাত এবং জিজ্ঞাসাবাদ পর্বগুলোও সংলাপের ওজনে, ভারে দর্শককে একইসঙ্গে উৎসুক করে, আবার উত্তেজনাও জাগায়, এখানেই রাজের ছবির সাফল্য। 'হোক কলরব' শেষ পর্যন্ত ছাত্র আন্দোলন বা ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে যায়নি, বরং সুস্থ রাজনীতির বাতাবরণে ছাত্র জগৎকে চলার কথাই বলেছে।
ছবি: সোশাল মিডিয়া
তাঁর এই ছবিটির সাফল্যের পেছনে অবশ্যই রয়েছে একঝাঁক তরুণ ও স্বল্পপরিচিত অভিনেতা অভিনেত্রীর দুরন্ত অভিনয়, এমনকি কিছু নতুন মুখ (স্বপ্নময় চরিত্রের শিল্পী) ও ক্যামেরার সামনে জীবন্ত চরিত্র হয়েছেন। ক'জন ছাত্রনেতা ও সাধারণ ছাত্র গৌরব, অর্ঘ্য, ফারহান, সৌম্য,অসিত, মনোতোষ চরিত্রে জন ভট্টাচার্য, আকাশ, ওম সাহনি, দেবদত্ত, পুষণ, সামিউল আলম প্রত্যেকেই জান লড়িয়ে অভিনয় করেছেন। ছোট্ট দুটি নারী চরিত্র, একটি পুলিশ অফিসার বহ্নি(শ্রেয়া) ও উঠতি ছাত্রী নেত্রীর চরিত্রে অভিকাও তাল মিলিয়েছেন সবার সঙ্গে। এমন সফল এনসম্বল কাস্টিং সাম্প্রতিক বাংলা ছবিতে কম দেখা গিয়েছে। এবং সবার ওপরে রয়েছেন পুলিশ অফিসার ক্ষুদিরামের ভূমিকায় শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়। তিনি বেশ কিছু সময় ধরেই জাঁদরেল কাজের পুলিশ অফিসার হিসেবে বাংলা ছোট ও বড় পর্দায় জাঁকিয়ে বসে আছেন। তবে শুরুতে তাঁর ও স্ত্রীর সম্পর্কের ভাঙন নিয়ে যে আভাস ছিল চিত্রনাট্যে, সেটাকে আবার জুড়ে দেবার ইঙ্গিত না রাখলেও ছবির কোন ক্ষতি হতোনা। তাঁর দুই সঙ্গী সহকারীর চরিত্রে পার্থ ভৌমিক ও রোহন সুন্দর সঙ্গত করে গেছেন শাশ্বতর সঙ্গে। ছবির সঙ্গীতপরিচালক চারজন। কে কোন কাজটি করেছেন জানানেই, তবে 'শৃঙ্খলা এনে দিতে পারে প্রতিকার/নাশকতা করা আর নয় দরকার..' গানের এই দুটি লাইনই হয়ে থাকে এই ছবির ট্যাগ লাইন।
