shono
Advertisement

Breaking News

Kalipotka

নারীকেন্দ্রিক গল্পই সিরিজের একমাত্র উপজীব্য নয়, এসব কারণেই দেখুন 'কালীপটকা'

চারপাশে অন্যান্য মূলধারার ছবি এবং ওটিটি যতটুকু নারীর ক্ষমতায়ন, স্পর্ধা দেখানো সমীচীন মনে করে ততটাই দেখানো হয়। সবটাই আসলে একটা অদৃশ্য, অলিখিত শৃঙ্খল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলে মনে হয় যেন।
Published By: Arani BhattacharyaPosted: 07:40 PM Feb 04, 2026Updated: 07:40 PM Feb 04, 2026

অভিরূপ ঘোষ পরিচালিত ওয়েব সিরিজ 'কালীপটকা'র ট্রেলার এবং প্রিভিউ দেখে মনে হয়েছিল খুব জোরে ফাটবে প্রায় চকোলেট বোমার মতো। এবং সেই জোরের মাপকাঠি কেবল ডেসিবলে মাপা যাবে, অভিঘাতে নয়। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই আমার অনুমান সবটা ঠিক নয়। 'কালীপটকা' কি তাহলে চড়া দাগের নয়, লাউড নয়? অবশ্যই কিছু জায়গায় তাই! তাহলে? তাহলে কেন এই সিরিজ মেনস্ট্রিম হয়েও নিজস্ব একটা পরিচিতি তৈরি করল! যে ধাঁচে গল্প বলা হয়েছে, মূলত এই ধরনের গল্পের প্রোটাগোনিস্ট হয় পুরুষ। সেখানে চার জন মহিলাকে গল্পের কেন্দ্রে এনে একটা অন্য পথে হেঁটেছেন অভিরূপ ঘোষ (পরিচালক ,গল্প, চিত্রনাট্য) এবং তার টিম অরিত্র বন্দ্যোপাধ্যায় (চিত্রনাট্য) এবং সৌমিত দেব (সংলাপ)! কিন্তু নারীকেন্দ্রিক গল্প এটাই এই সিরিজের একমাত্র ইউএসপি নয়। যেভাবে গল্প বলা হয়েছে, চারজন মহিলাকে চার্জে আনা হয়েছে, সাধারণত মেনস্ট্রিম পপুলার জনারে এই বিহেভিয়ার প্যাটার্ন পুরুষ চরিত্রের মাধ্যমেই দেখানো হয়। তেজি মহিলার চিত্রায়নও খানিক স্যানিটাইজ করেই পর্দায় আনা হয়। সাধারণ দর্শকের অর্থাৎ ভদ্র সমাজ যতটা আল্যাউ করে ততটা আর কি! চারপাশে অন্যান্য মূলধারার ছবি এবং ওটিটি যতটুকু নারীর ক্ষমতায়ন, স্পর্ধা দেখানো সমীচীন মনে করে ততটাই দেখানো হয়। সবটাই আসলে একটা অদৃশ্য, অলিখিত শৃঙ্খল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলে মনে হয় যেন। সেই নিয়ন্ত্রণ মার্কেটের, ক্যাপিটালিস্ট সমাজের, পিতৃতন্ত্রের।

Advertisement

কালীপটকা সিরিজের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

একজন জানতে চেয়েছিল, 'কালীপটকা'য় যে ভাষায় কথা বলা হচ্ছে সেটা সত্যিই এগজিস্ট করে কিনা! আমার ধারণা সে আসলে জানতে চেয়েছিল মেয়েরা কি আদৌ এইভাবে কথা বলে? তার ভদ্রতা তাঁকে দিয়ে এইভাবে বলিয়েছিল। হোক না তারা একবারে নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে আসা মেয়েদল! শুধু সে কেন, ট্রেলার দেখে তো আমারও মনে হয়েছিল শুধু যেন শক দেওয়ার জন্যই শক দেওয়া। কিন্তু সিরিজটা দেখতে দেখতে বুঝতে পারলাম , এ আমাদের ‘ভদ্র‘ মগজের মধ্যে তৈরি হওয়া একটা সোশ্যাল কনস্ট্রাক্ট যে মেয়েরা কোমলতর। হাঁটা চলা, কথা বলা, ব্যবহার, আবেগপ্রকাশে সবকিছুতেই। সিরিজে একটা সংলাপ আছে, যেখানে স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় বলছেন , ‘ভদ্দরলোকেরা ওয়াক থু করবে।' শুনতে শুনতে মনে হল এই সিরিজ দেখলে সত্যি তাই করবে। এবং আমার কাছে যেটা উল্ল্যেখযোগ্য মনে হল সেটা হল প্রথমত এই প্রশ্ন যে ভদ্র সমাজ কেন ওয়াক থু করবে বা করে? এবং দ্বিতীয়ত যেটা বুঝতে পারি সেটা হল তা সত্ত্বেও শ্রীমা (স্বস্তিকা), মিনতি (শ্রেয়া), রানি (শ্রুতি) এবং রিংকুদের (হিমিকা) কিসসু এসে যায় না। তাদের জীবন সংগ্রাম তাদের কোনও কিছু তোয়াক্কা না করতেই শেখায়। ফলে এসি ঘরে বসে যদি শ্রীমা, মিনতিদের জীবন দেখতে হয় তাহলে তাদের শর্তেই দেখতে হবে। স্যানিটাইজড, সাফসুতরো সংস্করণ আশা করলে চলবে না। ভালো লাগে বা বলা যায় একটা তৃপ্তি হয় যে সেই আশায় জল ঢেলেছে জি ফাইভের এই সিরিজ। তবে আরও ভালো লাগত এই বাস্তববাদী অ্যাপ্রোচ যদি ওপর ওপর না হয়ে গল্পে, চরিত্রায়নে আরও গভীরভাবে টের পাওয়া যেত।

কালীপটকা সিরিজের দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

'কালীপটকা' মেনস্ট্রিম হয়েও যে স্টিরিওটাইপ ভেঙে দেয় সেটা হল নারীর ক্ষমতায়নকে নারীর ঈশ্বরীকরণ না মনে করা। বেশির ভাগ মূলধারার কাজে নারীকেন্দ্রীক ছবি মানেই শেষে দুর্গা অবতার হয়ে অসুরবধ! সেই ক্লিশে থেকে রেহাই দিয়েছে বলা যায়। এই মেয়েরা দুর্গরূপেণ নয়, ওরা মানুষ এবং মানুষ হয়েই থাকতে চায়। এবং মেয়েদের মনের খোঁজ নিলে জানতে পারবেন আমরা কেউই দেবী হয়ে দারুণ সহ্যশক্তি নিয়ে জন্মাইনি। এবং এত সহ্য ক্ষমতার আমাদের প্রয়োজন নেই। আমরা রেগে গেলে, রাগ দেখাতে চাই। পেছনে ঠেলে দিলে 'রিঅ্যাক্ট' করতে চাই। আমাদের অস্তিত্ব মুছে দিতে চাইলে মাথা তুলতে চাই। 'শ্রীমা', 'মিনতি', 'রানি', 'রিংকু'ও তাই। এরা প্রত্যেকেই লোভী। সকলেরই চাহিদা আছে। একে অপরের থেকে নিজেকে সকলেই দিতে চায়। নিজেদের পাপের খাতা নিয়ে চারজনেই সচেতন। সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সকলেই নিজের জীবনের, কর্মের দায়ভার স্বীকার করে সোচ্চারে। এবং উইমেন বন্ডিং এর গল্পেও একে অপরকে ছুড়ি মারার কেসও তাই খুব স্বাভাবিক লাগে । তাতে তাদের আর পাঁচটা মানুষের মতো স্বার্থপর ছাড়া আর কিছু মনে হয় না! এই গল্পে ভিলেনকে কে হারিয়ে কেউ একা বিজয়মুকুট পরে নিল সেটাও দেখানো হয় না। একে অপরকে ঠকালেও বৃহত্তর স্বার্থে একজোট হয় এই চার নারী। নারীর দমনের ইতিহাস পাল্টে দিতে হলে মেয়েদের একজোট না হয়ে উপায় যে নেই তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় ‘কালীপটকা’-রা । এই স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়কে আগে কোনওদিন দেখেননি। তিনি 'কালীপটকা'র বারুদ। সিরিজের সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ‘মিনতি’র নানা স্তর শ্রেয়া ভট্টাচার্য দারুণ তুলে ধরেছেন। শ্রুতি দাস অভিনীত 'রানি' এবং 'কাজল' 'কালীপটকা'র চকমকি মোড়ক! 'হিমিকা' ছটফটে , অধৈর্য 'রিংকু'র চরিত্রে চমৎকার! অনির্বাণ চক্রবর্তী ক্রমশ ভুলিয়ে দিচ্ছেন 'একেনে'র স্মৃতি। যদি ভদ্দরলোকের খোলস ছেড়ে বেরোতে পারেন তাহলে 'কালীপটকা' দেখার একটা চেষ্টা করে দেখতে পারেন ।

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement