কোনও এক নির্দিষ্ট অঞ্চল, গ্রাম, দেশের কতটা ক্ষতি হয়ে গিয়েছে তা নির্ধারণ করতে অপরাধ আদতেই একটা মাপকাঠি হতে পারে। এই ক্ষতির পরিমাণ, ব্যাপ্তি এবং ধারাবাহিকতার ব্লু প্রিন্ট বলে সেই সমাজের অবক্ষয়ের কথা। ‘কোহরা সিজন ওয়ান’-এ আপাতদৃষ্টিতে ঘটে যাওয়া এক এনআরআই-এর মার্ডারের কুয়াশা ভেদ করে সেই জরাজীর্ণ ছবি তুলে ধরেছিল। ‘কোহরা সিজন টু’ (Kohrra Season 2) যেন পাঞ্জাবের হৃদয় ভেদ করে আরও গভীর ঢুকে গেল। একটি মেয়ের খুনের আশপাশে যারা নিশ্বাস ফেলছে, মেয়েটির পরিবার, দাদা, বউদি, মা, স্বামী– তাদের মনোজগৎ, কর্মজগৎ, লোভ, আক্রোশ কীভাবে এই ‘দলেরিয়া’ গ্রামে যুগ যুগ ধরে হয়ে চলা হিংসা, বৈষম্য এবং অপরাধের দলিল হয়ে উঠছে ‘কোহরা টু’, তা অতি সন্তর্পণে ব্যক্ত করে। সুদীপ শর্মা, গুঞ্জিত চোপড়া, ডিগ্গি সিসোদিয়ার লেখা এবং সুদীপ শর্মা ও ফয়জল রহমানের পরিচালনা, এই কল্পিত গ্রামের অপরাধ এবং হিংসার ইতিহাসকে প্রায় নিখুঁত করে তুলে ধরে।
'কোহরা সিজন ২'-এর দৃশ্য, ছবি: সোশাল মিডিয়া।
এখানেও এক এনআরআই বিবাহিত নারী ‘প্রীতি’ তার নিজের বাপের বাড়িতে খুন হয়ে যায়! অনুসন্ধানে যায়, সাব ইনস্পেক্টর ‘ধনওয়ান্ত’ (মোনা সিং), অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর ‘আম্রপাল গারুন্দি’ (বরুণ সোবতি)। মহিলা অফিসারকে রিপোর্ট করতে হবে জেনে ‘আম্রপাল’ খুব খুশি নয়। হাসতে হাসতে বলে, আমার দুজন বস, একজন থানায় অন্যজন বাড়িতে, তার স্ত্রী। ‘দলেরিয়া’ গ্রামে ‘প্রীতি’র পরিবার বা তার বর্ধিত পরিবারের নিরিখে বিচার করলে এই ক্যাজুয়াল মিসোজিনি ধর্তব্যের মধ্যেই আসবে না। সমাজের ক্ষয়ে আসা নানা দিক এমনভাবে চিত্রনাট্যে বুনে দেওয়া হয়েছে যে একটার থেকে অন্যটাকে ছাড়ানো যায় না। এমনকী ক্রাইম থ্রিলারের প্লটও আলাদা করা যায় না। আসলে অপরাধ কখনওই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। প্রতিটা চরিত্রের ব্যক্তিগত যাপনের মধ্য দিয়ে পাঞ্জাবের বিবর্তন দেখছি বলেই মনে হয়। সফল চিত্রনাট্য এমনই হওয়ার কথা। পুলিশ যখন ফেরার রিলমেকার ‘জনি’কে ধরতে যায় তার বাবা বলে, ছেলে আমার ভালোই, ড্রাগের নেশা করে না। পাঞ্জাবে যেখানে একটা গোটা প্রজন্ম এই নেশায় শেষ হয়ে যাচ্ছে সেখানে পিতার এই বয়ান যতটা না মজার শুনতে লাগে তার চেয়েও বেশি করুণ মনে হয়। ‘ধনওয়ান্ত’ বেশির ভাগ রাতে নিজের স্বামীকে মদের ঠেকে খুঁজতে যায়। দেখতে দেখতে তক্ষুনি মনে পড়ে যায় কিছুদিন আগের খবর। উত্তরপ্রদেশের ললিতপুর গ্রামে বীতশ্রদ্ধ হয়ে প্রায় ১০০ জন মহিলা একজোট বেঁধে দুটো দোকান মিলিয়ে ১৫ লাখ টাকার মদের বোতল ভেঙে দিয়েছে।
'কোহরা সিজন ২'-এর দৃশ্য, ছবি: সোশাল মিডিয়া।
জীবনের গ্লানি, হতাশা থেকে বাঁচতে পুরুষ খুব সহজেই নেশার হাত ধরে বাঁচতে চায় বা আরও হিংস্র হয়ে ওঠে। কিন্তু নারীকে দাঁতে দাঁত চেপে জীবন, সংসারের হাল ধরতে হয়। ‘ধনওয়ান্ত’ এক বছর সাসপেনসনের পর কাজে ফিরেছে, সন্তান হারানোর শোক গিলে নিয়েছে, কাঠিন্যকে বর্ম করে তার পথচলা। তার স্বামী ‘জগদীশ’ (অসম্ভব বিশ্বাসযোগ্য প্রধুম্ন সিং মালি) একাকিত্ব আর ব্যর্থতাবোধ নিয়ে কেবল বেঁচে আছে যেন। এই একা হয়ে যাওয়া ভয়াবহ। জীবনের এমন একটা প্রান্ত থেকেই মানুষ বেপথু হয়ে যায়। ঝাড়খণ্ড গ্রাম থেকে হারিয়ে যাওয়া মজদুর বাবাকে খুঁজতে আসা সর্বহারা ‘অরুণ’ (অবিশ্বাস্য প্রায়ার্ক মেহতা) যেমন শেষ পর্যন্ত আর নিজেকে সামলাতে পারে না। আমাদের দেশে অভিবাসী শ্রমিকদের করুণ কাহিনি লিখে রেখে যায় ‘কোহরা টু’। গোডাউনে শৃঙ্খলিত শ্রমিকরা আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর তাদের দগ্ধ মরদেহের দৃশ্যে মনে করিয়ে দেয় পশ্চিমবঙ্গের খোদ কলকাতায় ‘ওয়াও মোমো’-র শ্রমিকদের পুড়ে মারা যাওয়ার ঘটনা। এখানে পায়ে বেড়ি হয়তো ছিল না কিন্তু দরজা বাইরে থেকে বন্ধ ছিল। এই মৃত্যুর দায় কেউই নেয় না– না ওয়েব সিরিজে, না বাস্তবে।
‘কোহরা টু’-তে দুই প্রধান অভিনেতা খুব সফলভাবে নিজেদের চরিত্র তুলে ধরতে পেরেছেন। আম্রপালের চরিত্রে বরুণ সোবতির আবেগপ্রবণ অভিনয়ের পাশে ধনওয়ান্তের চরিত্রে মোনা সিংয়ের অনুভূতি চেপে রাখা অভিনয় দারুণ কনট্রাস্ট তৈরি করে। আম্রপালের চরিত্রের গ্রাফ যেভাবে প্রথম সিজন থেকে এই সিজনে পরিবর্তিত হয় সেটা নিয়ে একটা গোটা লেখাই লেখা যেতে পারে। তবুও সিরিজ শেষে তাড়া করে জগদীশ এবং অরুণের চোখ দুটো। এই সিরিজ দেখতে দেখতে ক্রমশ পাঞ্জাবের কল্পিত গ্রাম দলেরিয়া থেকে বেরিয়ে আসি। আমাদের আশপাশটাও হয়তো দলেরিয়ার মতোই হয়ে আছে। আমাদের চারপাশেও হয়তো প্রীতির মতো স্বাধীনচেতা, নিজের দাবি নিয়ে সোচ্চার হওয়া নারীকে মেরে ফেলা হয়। অরুণের বাবার মতো কত শ্রমিক হারিয়ে যায়, জগদীশের মতো একাকী পুরুষ নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। একটা গোটা প্রজন্ম কর্মসংস্থানের অভাবে নেশায় হারিয়ে যায়, ভুল রাস্তায় চলে যায়। এত কিছুর মধ্যে কোনও ‘একজন’ খুনি নয়, ‘কোহরা টু’ সেই কথাই বলে।
