"যব যব দুনিয়া মে রাখস্স জনম লেতা হ্যায়, তব দুনিয়া মে এক দেবী কো জনম লেনা পরতা হ্যায়" — ভিলেনের প্রতি গর্জে ওঠে রানি মুখোপাধ্যায় তাঁর নতুন ছবি ‘মর্দানি থ্রি’তে। এই সংলাপ ক্লিশে হতে হতে ছিবড়ে হয়ে গিয়েছে। এক পাবলিক ইভেন্টে রিজ উইদারস্পুন একবার বলেছিলেন, বেশির ভাগ ছবিতে আমরা মেয়েরা অসহায় হয়ে আমাদের পাশের পুরুষ চরিত্রের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে বলে থাকি, ‘ হোয়াট ডু উই ডু নাউ?' — এটা বোধহয় হলিউডে সবচেয়ে ক্লিশে সংলাপ। আমার মনে হয় দর্শক হিসেবে ওপরের লাইনটা হিন্দি ছবিতে কত সংখ্যকবার শুনেছি, তা গুনে শেষ করতে পারব না ।
নারীকে বহুকাল থেকে দেবীর আসনে বসিয়ে তাঁকে দিয়ে বেমক্কা সাফাইয়ের কাজ করিয়ে চলেছে সমাজ। অনেকটা এইরকম- তোমাকে তো হায়ার পজিশন দিয়ে দেওয়া হয়েছে , সাম্মানিক দেবী উপাধি দেওয়া হয়েছে, এবার তুমি সব জঞ্জাল সাফ করো। আহা যোগ্য পারিশ্রমিক না দেওয়া হল, সম্মান তো দেওয়া হল! মায়ের সম্মান, দেবীর সম্মান নিয়েই খুশি থাকো। একেবারে সরাসরি এটা বলা না হলেও মোটের ওপর এটাই। এবং মেনস্ট্রিম পপুলার জনারে নারীকেন্দ্রিক ছবির আড়াল নিয়ে এমন গুচ্ছ গুচ্ছ কাজ হয়ে চলেছে যেখানে নারী শক্তি আসলে টোকেনিজম মাত্র। সান্তনা পুরস্কার! এবং অনেকদিন পর্যন্ত এই টোকেনিজম নিয়েই খুশি ছিল মেয়েরা। কিন্তু আর কতদিন? রানি মুখোপাধ্যায় অভিনীত ‘মর্দানি থ্রি’ দেখতে দেখতে তাই প্রশ্ন জাগে কেন এমন নারীকেন্দ্রিক ছবি একটা বাস্তবচিত, বিশ্বাসযোগ্য চিত্রনাট্য পেল না? শিবানী শিবাজী রায়কে দেবী বানানোর জন্য এত কীসের তাড়া যে, দায়সারা চিত্রনাট্য দিয়ে কাজ চালিয়ে নিতে হল?
এক নারীপাচার চক্রকে কেন্দ্র করে গল্প তৈরি হয়। একজন এমব্যাসডরের মেয়ের কিডন্যাপ দিয়ে শুরু। অন্যদিকে সিনিয়র পুলিশ সুপার শিবানী শিবাজী রায় সুন্দরবনে আন্ডার কভার অপারেশন সেরে সদ্য ফিরেছে। সেই অপারেশনের গোটা অংশটাও কিভাবে নিষ্পত্তি হবে দর্শক আসনে বসে দিব্যি বোঝা যায়। চিত্রনাট্যকার এবং লেখক বি জেয়ামোহন ( B. Jeyamohan ) বলেছিলেন ফিল্মমেকাররা সিনেমা দেখে সিনেমা তৈরি করছেন, অরিজিনাল গল্পের, চিত্রনাট্যের অভাব! হিন্দি হোক বা বাংলা ছবি- তা মেনস্ট্রিম সিনেমায় বাণিজ্যিকভাবে সফল ছবির প্যাটার্ন বা ছক অনুসরণ করেই তৈরি করা হয়। তাই ক্রমাগত কপি হতে হতে যে সব চিত্রনাট্য নিয়ে ছবি হয়, দর্শক হিসেবে সেই ছবির গল্পের মোড়, গতিপথ সবটাই আগে থেকে বলে দেওয়া যায়। একবারে চেনা ফর্মুলা, পুরনো সিলেবাস, এমনকি আগের ভুলগুলোও শুধরে দেওয়া হয় না। দর্শকও জানে কোন ফ্র্যাঞ্চাইজি থেকে কী পাওয়া যেতে পারে? রানি মুখোপাধ্যায় অভিনীত ‘মর্দানি থ্রি’ সেই চেনা ফর্মুলার টোপেই পা দিয়েছে যেখানে শিবানী শিবাজী রায় মহিষাসুরমর্দিনী হয়ে উঠছেন। তিনি আর রক্তমাংসের থাকছেন না। অসম্ভবকে সম্ভব করে ফেলছেন। এবং এই ধরনের লার্জার দ্যান লাইফ এবং একটু জ্ঞান দেওয়া মার্কা ছবিই এখন বিনোদনের মার্কেটে সেফ। তা সে নারীকেন্দ্রিক হোক বা জাতীয়তাবাদী ছবি। কারণ বেশির ভাগ বড় স্কেলের ছবি এবং সেই ছবির ক্রাইসিস আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয় বা আমাদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে না। সেসব ছবি পপকর্ন খেতে-খেতে দেখে এসে সিনেমা হলেই ফেলে আসা যায়।
‘মর্দানি থ্রি’ ছবির দৃশ্যে মল্লিকা প্রসাদ
‘মর্দানি থ্রি ‘দেখতে-দেখতে ভারতে ব্যান হওয়া ছবি ‘সন্তোষ’-এর কথা মনে হচ্ছিল। এই ছবি একজন অতি সাধারণ মহিলা পুলিশ কনস্টেবলের গল্প বলে। সে কখনোই দেবী হয়ে ওঠে না এবং সবচেয়ে বড় কথা, সে দেবী হতেও চায় না। এত দায়িত্ব তার দরকার নেই। সে কাজ করতে চায় কিন্তু নিজের অস্তিত্ব খুইয়ে নয়। সে সংশোধনাগার হওয়ার দৌড়ে নেই। এই ছবি ভারতে মুক্তি পেলে অনেক প্রশ্ন উঁকি মারবে, ভাবনার জন্ম দেবে। তাই অগত্যা ব্যান! সে যাই হোক ‘মর্দানি থ্রি’ দেখতে গিয়ে আমি ‘সন্তোষ'-এর আশা করছিও না। যদি কেবলমাত্র বিনোদনের নিরীখেও ধরা যায়, তাহলে কিছু চমক ছাড়া খুব বেশি পাওয়ার নেই। মল্লিকা প্রসাদ (আম্মার চরিত্রে ) এবং প্রজেশ কাশ্যপের ( রামানুজনের চরিত্রে) উপস্থিতি বেশ চমকদার। মুখ্য ভূমিকায় রানি মুখোপাধ্যায় নিজের চরিত্রের ডিমান্ড পূর্ণ করতে পারলেও, ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয় তেমন চিত্রনাট্য পেলে তিনি এর চেয়ে অনেক বেশি পারেন! তাঁর মতো অভিনেতা আরও ভালো চিত্রনাট্য দাবি করেন! ‘মর্দানি থ্রি’- এর মতো ছবির চেয়েও অভিনেত্রী রানি মুখোপাধ্যায় আরও অনেক বেশি সম্ভাবনাময় ।
