সম্প্রতি সোনি লাইভ প্ল্যাটফর্মে এসেছে সৌমিক সেন পরিচালিত ওয়েব সিরিজ 'জ্যাজ সিটি'। নিঃসন্দেহে অত্যন্ত অ্যাম্বিশাস প্রোজেক্ট। দশটা পর্বের সিরিজ এবং প্রত্যেকটি পর্ব প্রায় পঞ্চাশ মিনিটের কাছাকাছি। যে সময়ে মানুষ কয়েক সেকেন্ডের রিলসে আসক্ত এবং তিন ঘণ্টার সিনেমা দেখতেই উশখুশ করে, সেই সময় দাঁড়িয়ে ‘জ্যাজ সিটি’ বানাতে সাহস লাগে। এই পিরিয়ড ড্রামার প্রেক্ষিত পাকিস্তানের শাসন থেকে যখন বাংলাদেশ তার আত্মপরিচয়ের সন্ধানে সংগ্রাম করছে।
এই ক্লাব গুপ্তচরবৃত্তি, তথা খবর আদান-প্রদানের আখড়া হয়ে ওঠে সেই সময়। ভারত-বাংলাদেশের সেতুর মতো যেন কাজ করে ‘জ্যাজ সিটি’। যেখানে প্রায় প্রতিনিয়ত আসে শীলা বোস (সৌরসেনী মৈত্র)। জিমির সঙ্গে শীলার হৃদয়ের যোগ। তাদের প্রেম-অপ্রেমের গাথার সঙ্গে জড়িয়ে যাবে দর্শক। আর অশান্ত সময়ের প্রেমের মাদকতা আলাদা! এই দু’জনকে ঘিরে অজস্র চরিত্র যায়-আসে সিরিজে। একই সঙ্গে উঠে আসে কলকাতার অভিজাত সমাজের ছবিটা।
'জ্যাজ সিটি'তে সৌরসেনী মৈত্র, আরিফিন শুভ। ছবি- সংগৃহীত
সময়কাল ১৯৭১ সাল। ভাষা আন্দোলনের সময়টা ধরা হয়েছে। যখন পূর্ব পাকিস্তান থেকে মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আসছে, সেই সময়ে সিরিজের কেন্দ্রে কলকাতা শহরের এক কাল্পনিক ক্লাব ‘জ্যাজ সিটি’। যার কর্ণধার জিমি রায় (আরিফিন শুভ)। যে নিজের রিফিউজি পরিচয় মুছে এই এলিট ক্লাবের সর্বেসর্বা হয়ে উঠেছে। এই ক্লাবের রেসিডেন্ট সিঙ্গার পামেলা (আলেক্সান্ড্রা টেলার), প্রতি সন্ধেতে আসর জমায়। আসে সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রভাবশালীরা। বলা যায় এই ক্লাব গুপ্তচরবৃত্তি, তথা খবর আদান-প্রদানের আখড়া হয়ে ওঠে সেই সময়। ভারত-বাংলাদেশের সেতুর মতো যেন কাজ করে ‘জ্যাজ সিটি’। যেখানে প্রায় প্রতিনিয়ত আসে শীলা বোস (সৌরসেনী মৈত্র)। জিমির সঙ্গে শীলার হৃদয়ের যোগ। তাদের প্রেম-অপ্রেমের গাথার সঙ্গে জড়িয়ে যাবে দর্শক। আর অশান্ত সময়ের প্রেমের মাদকতা আলাদা! এই দু’জনকে ঘিরে অজস্র চরিত্র যায়-আসে সিরিজে। একই সঙ্গে উঠে আসে কলকাতার অভিজাত সমাজের ছবিটা। জিমি চৌখস ছেলে, কথায়-কৌশলে সে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। জিমি নজরে পড়ে যায় ইন্টেলিজেন্স অফিসার সিনহার (শান্তনু ঘটক)। ক্লাবের লিকার লাইসেন্স ক্যানসেল করা দিয়ে, সে জিমিকে নিজের দিকে টানতে উদ্যোগী হয়। পরে বোঝা যায় তার চাহিদা একটা জমি। পরপর ঘটে যায় অনেক ঘটনা। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, তিনজন বাংলাদেশি ছাত্র, যাদের পাকিস্তানি এজেন্ট তাড়া করছে। তাদের উদ্ধার করে জিমি। পাকিস্তানি ভিলেনের ভূমিকায় এখানে শতাফ ফিগার। নানা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ঘটনা উঠে এসেছে দীর্ঘ সিরিজে এবং অবশ্যই বাংলাদেশের গঠনের সময়টা। ঐতিহাসিক চরিত্রদের মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধু মুজিবুর রহমান (কৌশিক বন্দ্যোপাধ্যায়), পাকিস্তানের লিডার ইয়াহিয়া খান (সৌভিক মজুমদার), ভারতের ইন্দিরা গান্ধী (আলোলিকা দে), ইউএস প্রেসিডেন্ট রিচার্ড এম নিক্সন (এডওয়ার্ড একেলস্টন), হেনরি কিসিংগার (গৌতম বীর প্রসাদ) ও আরও অনেকে। ইতিহাস এবং রাজনৈতিক দিকটা অনেকটা ধরেছেন পরিচালক সৌমিক। তার সমান্তরালে চলতে থাকে জিমি-শীলার সম্পর্কের ওঠানামা। শীলার জন্য সমস্ত ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত জিমি। দারুণ মানিয়েছে আরিফিন শুভকে। খুব ভালো লাগে সৌরসেনী মৈত্রকেও। শেষ পর্যন্ত তাদের প্রেমের পরিণতি কোন দিকে যায় দেখতে হয়।
'জ্যাজ সিটি'র এক দৃশ্য।
ভাষা আন্দোলনের ঘটনা ফিরে দেখতে গিয়ে স্পাই থ্রিলারের চার্ম কিছুটা ধরতে পেরেছেন পরিচালক। শান্তনু ঘটকের অভিনয় এক্ষেত্রে দারুণ কার্যকর। সৌমিক এর আগে ‘জুবিলি’র মতো সিরিজ লিখেছেন, তাই বোধহয় বড় স্কেলে ভাবতে পেরেছেন। তবে অতিরিক্ত সাবপ্লট এবং অজস্র চরিত্র সিরিজে, সেখানে দর্শকের ধৈর্যের পরীক্ষাও বটে। দারুণ ভিস্যুয়াল সঙ্গে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুল গীতি ও জ্যাজের ব্যবহার বেশ লাগে দেখতে। অর্পিতা চট্টোপাধ্যায় প্রযোজিত এই সিরিজের কাহিনি, চিত্রনাট্য শুধু নয়, প্রোডাকশন ডিজাইনেও যত্নের ছাপ রয়েছে। বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি তিনটে ভাষাই জড়িয়ে এই সিরিজে। বাংলার আরও অনেক অভিনেতা দারুণ কাজ করেছেন। যেমন– লোকনাথ দে, শুভাশিস মুখোপাধ্যায়, দুলাল লাহিড়ী, শ্রেয়া ভট্টাচার্য, তানিকা বসু, সায়নদীপ সেনগুপ্ত, অনিরুদ্ধ গুপ্ত, শাহির রাজ। এবং অবশ্যই শতাফ ফিগার দুরন্ত। সিনেমাটোগ্রাফি খুবই নান্দনিক। ইতিহাস ও আবেগের কারণে এই সিরিজ মনে ধাক্কা দিলেও থ্রিলের ভাগ কম। কিছুটা ধীর গতির। অবশ্য সেই সময়ে জীবনে এত দ্রুতি ছিল না। উপমহাদেশের জটিল অতীত জানতে যারা আগ্রহী তাদের দারুণ লাগবে। তবে দৈর্ঘ্য কম হলে ভালো হত। সাবপ্লটের ভারে ফোকাস কিছুটা হারিয়ে গেলেও অভিনেতাদের চমৎকার পারফরম্যান্সের জন্য সিরিজটা দেখতে ভালো লাগে। সৌমিক সেন স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন– ধর্মের জোরে দেশ হয় না। মাটির ধুলো, ভাষার ঝড়, রক্তের চিৎকারে দেশ হয়। সংযতভাবে বাঙালির আবেগের মূল সুর ধরতে সক্ষম তিনি।
