shono
Advertisement
East Bengal

জার্সি মানেই আমার মা... ব্যর্থতাতেও ক্লাবকে বুকে আগলে আসল চ্যাম্পিয়ন ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরাই

'Then, Now, Forever'। ইস্টবেঙ্গল ছিল, আছে, থাকবে।
Published By: Arpan DasPosted: 09:29 PM May 21, 2026Updated: 12:58 AM May 22, 2026

ওই যে দূরে, ওই পাহাড়টা টপকাতে হবে। পথ অতি দুর্গম, রুক্ষ, বিপদে ভরা। খিদে, তেষ্টা, ক্লান্তিতে শরীর অবশ হয়ে যাবে। মনে হবে, আর না। আর পারা যাচ্ছে না। এবার ফিরে যাই। বহুবার কাছে গিয়েও ফের নীচে পড়ে যেতে হয়েছে। কিন্তু হার মানা তো রক্তে নেই। রাতের ঘন আঁধারে হাতে মশাল জ্বালিয়ে রাখো। বুকের সেই আগুন পথ দেখাবে। সেই যে কোন এককালে বাবার কোলে করে সফর শুরু। লাল-হলুদ জার্সির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাত্রা শুরু। তারপর থেকে অক্লান্ত সফর চলছে, চলছে... অবশেষে স্বপ্নপূরণ। ২২ বছরের গ্লানি, ব্যর্থতা, যন্ত্রণা, কান্না মিটিয়ে সর্বোচ্চ শিখরে। ইস্টবেঙ্গল ফের ভারতসেরা।

Advertisement

গত ২২ বছরের গল্পটার প্রতীকরূপ উপরের অংশটি। কিন্তু বিশ্বাস করতে অসুবিধা নেই যে, আজ ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের কাছে এই প্রতীকটাই বাস্তব। সেই কবে, ২০০৩-০৪ সালে সুভাষ ভৌমিকের কোচিংয়ে জাতীয় লিগ জয়। তারপর নাম বদলে আই লিগ হয়েছে। শুরু হয়েছে ইন্ডিয়ান সুপার লিগ। ইস্টবেঙ্গল ফেডারেশন কাপ জিতেছে, ঘরে সুপার কাপ এসেছে। ক্লাব শতবর্ষে পা দিয়েছে। মেয়েরা দু'বার দেশের সেরা হয়েছে। কিন্তু পুরুষ দল দেশের সেরা লিগ চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি।

উৎসবের প্রস্তুতি শুধু চেন্নাইয়ে নয়, আসমুদ্রহিমাচল জুড়ে। এমনকী দেশের বাইরেও৷ গোটা বিশ্বের 'বাঙাল পোলা-মাইয়া' আজ এক। ময়দানের প্রাচীন প্রবাদ, ইস্টবেঙ্গল খোঁচা খাওয়া বাঘ। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায়। হ্যাঁ, লড়াইটা দীর্ঘ ২২ বছরের ছিল।

হার একরকম। কিন্তু যেটা আরও যন্ত্রণার, সেটা হল আশা জাগিয়ে হার। আই লিগে চারবার রানার্সআপ। কোনওবার মাত্র এক পয়েন্টের জন্য লিগ হাতছাড়া হয়েছে। লাল-হলুদ ভক্তরা আজও আফসোস করেন, ২০১১-১২ মরশুমে ট্রেভর মর্গানের জমানায় সালগাওকারের বিরুদ্ধে ম্যাচে ২ গোলে এগিয়ে থেকেও না হারলে চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিশ্চিত ছিল। কিংবা ২০১৮-১৯ মরশুমে আলেজান্দ্রো মেনেন্দেজের সময় আইজল ম্যাচটা যে কেন ড্র হল! গোকুলাম কেরালার বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচ জিতেও সেই ব্যর্থতার আঁধারে মুখ গুঁজে থাকতে হল। আর আইএসএলে এতদিন পর্যন্ত শুধুই হতাশা। আইএসএলে ডার্বি মানে নিশ্চিত হার।

মাঠের মধ্যে যেমন লড়াই ছিল, তার থেকেও কঠিন ছিল মাঠের বাইরের যুদ্ধটা। পড়শি ক্লাবে ট্রফি এসেছে, কটাক্ষ হজম করতে হয়েছে মোহনবাগান সমর্থকদের থেকে। বারবার কোচ বদল, কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইনভেস্টরদের ঝামেলা, কোভিডের মধ্যে ক্লাবের সামনে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ঘাড়ধাক্কা খাওয়ার অপমান। আর কত যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে? ওই পাহাড়টা টপকাতে আর কত বিনিদ্র রজনী কাটবে? এক-একটা বছর গিয়েছে, আর একঝাঁক অন্ধকার মুখ নীরবে স্টেডিয়াম ছেড়েছে। কেউ অভিমানে দূরত্ব বাড়িয়েছেন, আবার কেউ-বা দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিজ্ঞা করেছেন, এর শেষ দেখে ছাড়বেন।

"কী করে এর সঙ্গ ছাড়ি বলুন তো? ইস্টবেঙ্গল যে আমাদের মা।" বলছিলেন 'প্রবাসে ইস্টবেঙ্গল' ফ্যান ক্লাবের শুভজিৎ পাল। ব্যান্ডেলের বাসিন্দা হলেও কর্মসূত্রে বর্তমানে চেন্নাইয়ে থাকেন। শেষ জাতীয় লিগ জয় বা আশিয়ান চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্মৃতি আজও টাটকা। কিন্তু স্বীকার করে নেন, সেদিনের সুখস্মৃতির সঙ্গে আজকের আকাশপাতাল তফাৎ। তখন ইস্টবেঙ্গল মাঠে নামা মানেই চ্যাম্পিয়ন, আর আজ আইএসএল জয় ২২ বছরের অপেক্ষার ফসল। শুভজিৎ বলতে থাকেন, "২০১৯-র শেষ ম্যাচে কোচিতে খেলা দেখতে গিয়েছিলাম। সেদিন টিম হোটেলে সেলিব্রেশনের সমস্ত আয়োজন ছিল। লাড্ডু এনে রাখা ছিল। কিন্তু ওদিকে চেন্নাই জিতে যাওয়ায় চ্যাম্পিয়ন হতে পারলাম না। এবার যখন চেন্নাইয়ে ম্যাচ খেলতে এল, তখন কোচ (অস্কার ব্রুজোর) সঙ্গে কথা হয়েছে। উনিই বরং আমাদের আত্মবিশ্বাস দিয়ে গিয়েছেন। এতদিন অপেক্ষা করেছি, তাই আজকের আনন্দটা আরও বেশি। সংস্কার বলতে পারেন, তবে আজ সেভাবে কোনও আয়োজন ছিল না। সপ্তাহ শেষে ধুমধাম করে সেলিব্রেট করব।"

উৎসবের প্রস্তুতি শুধু চেন্নাইয়ে নয়, আসমুদ্রহিমাচল জুড়ে। এমনকী দেশের বাইরেও। গোটা বিশ্বের 'বাঙাল পোলা-মাইয়া' আজ এক। ময়দানের প্রাচীন প্রবাদ, ইস্টবেঙ্গল খোঁচা খাওয়া বাঘ। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায়। 'ফাইনালেও' তা প্রমাণিত হল। হ্যাঁ, লড়াইটা দীর্ঘ ২২ বছরের ছিল। কিন্তু রূপকথার শেষে রাজপুত্রের জয়। আজ থেকে আর শুধু 'স্মৃতি সততই সুখের' নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য রূপরেখা তৈরি হয়ে গেল। 'ইস্টবেঙ্গল আলট্রাস' গ্রুপের সদস্য কৃষ্ণেন্দু দত্ত যেমন বললেন, "এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। তবে আমি অতীত সাফল্য দেখেছি, আমি চাই আজকের প্রজন্ম এই দিনটা উপভোগ করুক। ওরা তো শুধু ব্যর্থতাই দেখেছে। ইউরোপীয় ফুটবলের চাকচিক্যের মধ্যেও মায়ের ক্লাবের পাশে থেকেছে।" ভারতীয় ফুটবলে 'আলট্রাস সংস্কৃতি' নিয়ে এসেছিল 'ইস্টবেঙ্গল আলট্রাসই।' প্রথম দিকে অনেকেই এই বিশেষ ধরনের সমর্থনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেননি। অনেক সমস্যা, ঝুটঝামেলা পেরিয়ে যেন এই দিনটার জন্যই যেন অপেক্ষা করেছিলেন কৃষ্ণেন্দুবাবুর মতো অনেকে। গোলপোস্টের পিছন থেকে তারা বলতে থামেননি, 'ও ইস্টবেঙ্গল, এগিয়ে চলো। আমরা আছি, তোমারই পাশে।' কৃষ্ণেন্দুবাবু বললেন, "আজ থেকে ইস্টবেঙ্গলে পালাবদল শুরু হল। এবার শুধুই সাফল্য আসবে।"

তরুণ প্রজন্মের লাল-হলুদ সমর্থক বিদিশা রয় আবার শ্রদ্ধাশীল আগের প্রজন্মের প্রতি। তিনি বললেন, "আমি বাবা-কাকাদের কাছে সোনালি সময়ের গল্প শুনেছি। কিন্তু সুপার কাপ জেতা ছাড়া কোনও সাফল্য দেখিনি। আজ প্রথমবার মনে হল, মায়ের আদর পাচ্ছি। এতদিন শুধুই যন্ত্রণা পেয়েছি, গুমরে কেঁদেছি। আজও কাঁদছি। তবে সেটা সুখের কান্না। কিন্তু অনেকেই আছেন, যাঁরা এই দিনটা দেখে যেতে পারলেন না। মাতৃসম ক্লাবের জয়ে তাঁদের আত্মা যেন শান্তি পায়।"

এভাবেই এক হয়ে যায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। ওই যে 'Then, Now, Forever'। ছিল, আছে, থাকবে। একশো বছরের স্পর্ধার আরেক নাম ইস্টবেঙ্গল। হারতে হারতে পালটা লড়াই করার নাম ইস্টবেঙ্গল। একদিনে হবে না, একদিন ঠিক হবে। সমর্থকরা হাল ছাড়েননি, 'মায়ের' সঙ্গ ছাড়েননি। ভোর হওয়ার আগের রাতের কালোয় কোটি-কোটি মানুষ প্রতীক্ষা করেছেন। কেউ জীবন বাজি রেখেছে, কেউ কেরিয়ার। কলেজ কেটে, মাইনের টাকা বাঁচিয়ে, মায়ের মৃত্যুর পর, নিজের বিয়ের দিন- সবার নিজের নিজের গল্প আছে। সব কটা গল্প একার, আবার সবার। সব কটা গল্প মিশে যায় একটাই শব্দে- 'ইস্টবেঙ্গল'। লাল-হলুদ জার্সি পরলে আজও নিজেকে অপ্রতিরোধ্য মনে হয় অনেকের। 'জয় ইস্টবেঙ্গল' স্লোগান তুলে অনেকে ভাবেন সব যুদ্ধ জিতে নেওয়া যায়। তাঁদের বিশ্বাস আজ সত্যি হল। কল্যাণী, বারাসত, যুবভারতী, কিশোর ভারতী হয়ে ভারতীয় ফুটবলের রং আজ লাল-হলুদ।

রাত বাড়ছে, রাত শেষ হচ্ছে। এমন একটা ভোর আসছে, যে দিনটা নতুন। দূরে শোনা যাচ্ছে চিরন্তন এক স্লোগান, 'আমরা কারা..., জিতছে কারা..., ওই ছেলেটা..., উদ্বাস্তু...।'

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ

হাইলাইটস

Highlights Heading
Advertisement