এমি মার্টিনেজ। মেসি এবং আর্জেন্টিনা ভক্তদের হৃদয়ে এই নামটা চিরতরে গাঁথা হয়ে গিয়েছে। তাঁর পায়ের আলতো ছোঁয়াতে আর্জেন্টিনার ৩৬ বছরের বিশ্বজয়ের স্বপ্নপূরণ। সেদিন 'দিবু'র চওড়া দস্তানা এক মুহূর্তে নিঃশ্বাস আটকে যাওয়া কোটি কোটি আর্জেন্টিনা সমর্থক এবং মেসিভক্তদের মধ্যে প্রাণসঞ্চার করেছিল। চার বছর আগে এমি যেভাবে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের হৃদয়ে চিরতরে জায়গা করে নিয়েছিলেন, ঠিক তেমন ভাবেই লাল-হলুদ ভক্তদের হৃদয়ে স্থায়ীভাবে জায়গা করে গেলেন প্রভসুখন গিল (Prabhsukhan Gill)। করবেন না-ই বা কেন। কোটি কোটি ইস্টবেঙ্গল (East Bengal) সমর্থকের ২২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটার নেপথ্যে তাঁর পায়ের ছোঁয়া একইরকমভাবে কাজ করেছে।
শেষবার ইস্টবেঙ্গলের জাতীয় স্তরের লিগ জয় ২২ বছর আগে। তারপর একটার পর একটা বছর কেটেছে, প্রজন্ম কেটেছে, ইস্টবেঙ্গলের ভাগ্যে যে সাফল্য আসেনি তা নয়। কিন্তু দেশের সেরা লিগে চ্যাম্পিয়ন হওয়া, সেই স্বপ্ন বারবার অধরা থেকে গিয়েছে। বহুবার লাল-হলুদ জনতা দেখেছে তীরে এসে তরী ডোবার দুঃস্বপ্ন। কখনও শেষ মুহূর্তে গোল হজম করে জুটেছে রানার্স আপের তকমা। কখনও গোলপার্থক্যের জন্য জেতা হয়নি জাতীয় লিগ। আর আইএসএল জমানায়, দিনের পর দিন দুঃস্বপ্নের মধ্যে কাটাতে হয়েছে লাল-হলুদ সমর্থকদের। কখনও সবার শেষ, কখনও ৯ নম্বর-এ বছর সুবর্ণ সুযোগ ছিল, সেই দুঃস্বপ্ন কাটানোর। তবু যেন কোথাও আশঙ্কা কাজ করছিল, শেষ মুহূর্তে তীরে এসে তরী ডুববে না তো!
অনবদ্য সেভের সেই মুহূর্ত। ফাইল ছবি।
সেই আশঙ্কাটা জোরাল হয়ে গিয়েছিল ডার্বির রাতে। চ্যাম্পিয়নশিপের লড়াইয়ে টিকে থাকতে হলে কোনওভাবেই হারা চলবে না। এই পরিস্থিতিতে ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূর্তে হৃদস্পন্দন থেমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল লাল-হলুদ সমর্থকদের। ম্যাচের একদম শেষ মিনিট- ফলাফল দাঁড়িয়ে ১-১ গোলে। শেষ মুহূর্তে মরণ-কামড় দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা করেছে মোহনবাগান। জেসন কামিন্স জেমি ম্যাকলারেনকে ডানপ্রান্ত থেকে বল বাড়ালেন, গোটা ইস্টবেঙ্গল রক্ষণকে নিখুঁতভাবে চিরে দিয়ে সেই বল সোজা চলে গেল ম্যাকলারেনের পায়ে। পড়িমরি করে গোলমুখে বলটি ঠেলে দিলেন ম্যাকলারেন। এক মুহূর্তে স্তব্ধ গোটা ইস্টবেঙ্গল গ্যালারি। আবারও কী স্বপ্নভঙ্গ! মুহূর্তের আতঙ্ক গ্রাস করেছে অপামর লাল-হলুদ জনতাকে। ঠিক সেসময় ঈশ্বরের আশীর্বাদের মতো নেমে এল গিলের পা। অবধারিত গোল সেই পায়ের ছোঁয়ায় আটকে দিলেন তিনি। ম্যাচ শেষ হল ড্র দিয়েই। আরও এক লড়াইয়ের জন্য সঞ্জীবনী দিয়ে দিলেন। ওই সঞ্জীবনীই পিছিয়ে থাকা ইস্টবেঙ্গলকে লিগের শেষ ম্যাচে জিততে সাহায্য করল।
অবশ্য শুধু ওই একটা গোল বাঁচানো নয়। গোটা মরশুমেই আগের চেয়ে অনেক পরিণত, অনেক বুদ্ধিদীপ্ত এবং সাহসী গোলকিপিং করেছেন গিল। অথচ এই তরুণ গোলরক্ষককে একটা সময় কম সমালোচনা শুনতে হয়নি। ইস্টবেঙ্গলের যখন দুঃসময় ছিল, এই প্রভসুখন গিলকেই বহুবার ভিলেন বানানো হয়েছে। অবশ্য অতীতে তিনি এমন কিছু বিশ্রী ভুল যে করেননি, তেমন নয়। বহুবার দেখা গিয়েছে, অতি সহজ বল হাতের মধ্যে দিয়ে, দু'পায়ের ফাঁক দিয়ে গলিয়ে দিয়েছে তিনি। অহেতুক পয়েন্ট নষ্ট করতে হয়েছে ইস্টবেঙ্গলকে। কিন্তু ওই যে বলে চিরদিন কাহারও সমান নাহি যায়। সময় বদলেছে-ইস্টবেঙ্গলেরও-প্রভসুখন গিলেরও।
