মিকেল ওয়ারজাবালের যা মাতৃভাষা, এ পৃথিবীতে তা শোনা যায় না বড়। কোনও কালেই যেত না। ‘ইউস্কারা’-য় কথা বলেন ওয়ারজাবাল। স্পেনের ‘বাস্ক’ প্রদেশের বাসিন্দা। ‘ইউস্কারা’-র অত্যাশ্চর্য বিশেষত্ব হল, ভুবনের কোনও ভাষার সঙ্গেই তার ন্যূনতম কোনও সাযুজ্য নেই। স্পেনীয়। ফরাসি। ইংরেজি। কিছুর সঙ্গেই নেই। ‘ইউস্কারা’-র ব্যাকরণ আলাদা। বাচন-কায়দা আলাদা। শব্দবন্ধও স্বতন্ত্র।
মিকেল ওয়ারজাবালের যা ফুটবল-ভাষা, তা-ও এ পৃথিবীতে দেখা যায় না বড়। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দশ সেন্টার ফরোয়ার্ডের তালিকা তৈরি করতে বসলে, স্পেনীয়র নামখানা রাখতে, মন কিছুতেই সায় দেবে না। কিলিয়ান এমবাপে। হ্যারি কেন। লাউরেতো মার্টিনেজ। ম্যাথায়াস কুনহা। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। আর্লিং হালান্ড। এঁদের জ্যোতির্ময় উপস্থিতির পাশে কোথায় আর মিকেল ওয়ারজাবাল?
তার উপর চেহারায় ন্যূনতম চটকদারি নেই। ট্যাটুর দেখনদারি নেই। মিকেল ওয়ারজাবাল গোটা বছর কোথায় থাকেন, কী করেন, ক’টা গোল করেন, কেউ জানে না। জানতেও চায় না। দিন কয়েক আগে এক সাক্ষাৎকারে ২০১০ বিশ্বজয়ী স্পেনের তারকা ফুটবলার দাভিদ ভিয়া বলেছিলেন, “ওয়ারজাবালের সবচেয়ে বড় অসুবিধে হল, ও রিয়াল সোসিয়াদাদে খেলে। যারা কি না চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলে না। আর স্পেনে যারা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ খেলে না, গোটা বছর তাদের উপর সেভাবে নজর থাকে না। অথচ অসামান্য স্ট্রাইকার মিকেল।’’
সামান্য ভুল বলেননি ভিয়া। চলতি বিশ্বকাপে ছ’টা গোল হয়ে গিয়েছে কিলিয়ান এমবাপের। আর্লিং হালান্ডের গোল-সংখ্যা পাঁচ। ভিনিসিয়াস জুনিয়রের চার। এবং মিকেল ওয়ারজাবালেরও চার। লিওনেল মেসির সাত। তার মধ্যে নকআউটে শেষ বত্রিশের ম্যাচে রাল্ফ র্যাঙ্গনিকের অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে জোড়া গোল! যে বিশ্বকাপ নকআউটে গোল পেতে ছ-ছ’খানা ফুটবল-মহাযজ্ঞ লাগল হাজার কেরিয়ার গোলের দিকে ছোটা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর! কিন্তু এত কিছুর পরেও মিকেল ওয়ারজাবালকে ফুটবল-দুনিয়া খেয়াল করবে না, লিখে দেওয়া যায়। এমনকী স্পেন তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জিতলেও না। ‘বাস্ক’ প্রদেশের বিরল ভাষা বলা ভদ্রলোক কখনওই মহাতারকা নন যে! তা সে যতই তিনি বুত্রাগুয়েনোর পর বিশ্বকাপ নকআউটে গোল করা একমাত্র স্প্যানিশ স্ট্রাইকার হন। তা সে যতই তিনি গত বছর থেকে ইউরোপীয় স্ট্রাইকারদের মধ্যে গোল সংখ্যার বিচারে আর্লিং হালান্ডের ঠিক পরেই থাকুন।
জীবনে রিয়াল সোসিয়াদাদের বাইরে কোনও ক্লাবে খেললেন না ওয়ারজাবাল। এমন নয় যে, খেলতে পারতেন না। পারতেন। কিন্তু খেলেননি। ফ্রান্সিসকো তোত্তি, পাওলো মালদিনি, রায়ান গিগস, গ্যারি নেভিলদের ‘বংশধর’ ওয়ারজাবাল। যাঁরা জীবনে একটা ক্লাবের বাইরে কখনও খেলেননি। গত বছর সোসিয়াদাদের হয়ে পনেরোটা গোল করেছেন ওয়ারজাবাল। শুনলে আশ্চর্য লাগবে। কিন্তু ওয়ারজাবালের সেই গোল-ক্ষুধার জন্ম হয়েছিল ফুটবল নয়, হকি খেলে! শৈশবে হকি খেলতেন স্পেনীয় স্ট্রাইকার। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “ছোটবেলায় হকি খেলতাম আমি। প্রচুর গোলও করতাম। হকি খেলার সময় ভেতর থেকে একটা আওয়াজ শুনতে পেতাম আমি। যে আমাকে বলত, একটা গোল মিস হলে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে না। কিছুই আসবে-যাবে না। গোল ঠিকই পেয়ে যাবে তুমি। পেয়ে যাবেই।” আসলে শৈশব থেকে গোলের গন্ধ পেতেন ওয়ারজাবাল। বলতেনও, “গোলের গন্ধ ঠিক পেয়ে যাই আমি। ভেতর থেকে সেই স্বরটা আমাকে আজও বলতে থাকে, জায়গায় পৌঁছোও। গোল ঠিক পাবে তুমি।”
পেয়েছেন। পাচ্ছেন। শেষ তিনটে ইউরোপীয় মহা টুর্নামেন্টের ফাইনালের তিনেটেতেই গোল ছিল ওয়ারজাবালের। দু’টো নেশনস লিগ ফাইনাল। একটা ২০২৪ ইউরো ফাইনাল। একটা নেশনস লিগ বাদে বাকি দু’টো টুর্নামেন্টে জয়ী হয়েছে ওয়ারজাবালের স্পেন। এবারও স্পেনকে বিশ্বজয়ী হতে গেলে আরও গোল করতে হবে ওয়ারজাবালকে। আলভারো মোরাতার কথায়, যাঁর পায়ে গোলের ‘সেন্সর’ বসানো রয়েছে! দ্বিতীয় বিশ্বজয়ের মোক্ষে যাঁর উপর সবচেয়ে বেশি ভরসা করছেন দাভিদ ভিয়া। বলেছেন, “ওয়ারজাবালের সবচেয়ে বড় প্লাস, লামিন ইয়ামাল। লামিন বিপক্ষের সব অ্যাটেনশন কেড়ে নেবে। ওকে ফাঁকায় ছেড়ে।” ভালো তো। মিকেল ওয়ারজাবাল গোলটা শুধু পেলেই হল!
