অনেকেই ভেবেছিলেন ৪৮ দলের বিশ্বকাপ একঘেয়ে হবে। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, ম্যাচগুলি হয়তো একতরফা হবে। তাঁদের ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে চলেছে ফিফা বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026)। গ্রুপ পর্বের শেষ দিকে এসে ছোট দেশগুলোর গোলরক্ষকদের অসাধারণ পারফরম্যান্স ইতিমধ্যেই মন জয় করে নিয়েছে। কেপ ভার্দের ভোজিনহা ও কুরাসাওয়ের এলয় রুমের পর এবার আলোচনায় ইরানের গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্দ। একসময় যাঁর ঠিকানা ছিল কেয়ার অফ ফুটপাথ। জীবিকা ছিল রাস্তা সাফাইয়ের কাজ। সেই আলিরেজা ইরানের স্বপ্নের সওদাগর। তাঁর 'বীরত্বে'ই বেলজিয়ামকে রুখে দিয়েছে ইরান।
রবিবার সোফাই স্টেডিয়ামে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের নয়ে থাকা বেলজিয়ামের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র ইরানের। সাত সেভে দলের নায়ক ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার আলিরেজা। তিনিই যেন 'রক্ষাকবচ'। দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে তিনিই ম্যাচের সেরা। অনেকেই হয়তো জানেন না, তাঁর আত্মত্যাগের গল্প। ইরানের লোরেস্তান প্রদেশের দরিদ্র যাযাবর কুর্দি লাক পরিবারে জন্ম। ছোটবেলা কেটেছে চরম অভাবের মধ্যে। দিন আনি দিন খাই অবস্থা! তাই ছেলে ফুটবল খেলুক, চাইত না পরিবার। কিন্তু কেবল স্বপ্ন দেখাই নয়, স্বপ্নপূরণ করতে মরিয়া আলিরেজা কিশোর বয়সেই বাড়ি থেকে পালিয়ে তেহরান রওনা দেন।
ছবি সংগৃহীত।
চকমকি পাথর দেখলে চোখ যেমন ধাঁধিয়ে যায়, রাজধানীতে এসে অনেকটা তেমনই অবস্থা হয়েছিল তাঁর। নতুন শহর। নতুন পরিবেশ। সব কিছুই অচেনা। আশ্রয়ের জায়গা নেই! মাসের পর মাস ফুটবল ক্লাবের বাইরে ফুটপাথে রাত কাটিয়েছেন। মনে করতেন, যদি ঠান্ডায় জমেই যেতে হয়, তাহলে ঘাসের কাছাকাছি থাকাই ভালো। দু'বেলা দু'মুঠো খাওয়ার জন্য ঝাড়ুদারের কাজ করেছেন। কখনও গাড়ি ধোয়া, টায়ার পরিষ্কারের কাজ। কখনও পোশাক কারখানা কিংবা পিৎজার দোকানে ময়দা মেখেও দিন গুজরান করতে হয়েছে তাঁকে। ছোটবেলায় ভেড়া চরানোর সময় 'দালপারান' নামে এক স্থানীয় খেলায় পাথর ছোড়ার অভ্যাসই গড়ে তুলেছিল শারীরিক শক্তি। সেখান থেকে হালফিলের ফুটবল ইতিহাসে দীর্ঘতম থ্রো ও দীর্ঘতম ড্রপ কিকের জন্য দু'টি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের মালিক বেইরানভান্দ। ২০১৬ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে তিনি ৬১.০০২ মিটার (২০০.১৪ ফুট) দূরে থ্রো করে বিশ্বরেকর্ড গড়েন। এছাড়া তাঁর দীর্ঘতম ড্রপ কিকের দূরত্ব ৭৮.০১৪ মিটার (২৫৫.৯৫ ফুট)। যা আজও ফুটবলপ্রেমীদের বিস্মিত করে। এককথায়, এই কীর্তি সত্যিই অবিশ্বাস্য!
তবে বেলজিয়াম ম্যাচে দূরপাল্লার থ্রো নয়, আলোচনায় দুর্ভেদ্য গোলকিপিং। বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী দলের একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে ইরানকে এনে দিয়েছেন মূল্যবান এক পয়েন্ট। এদিকে মাঠের বাইরেও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি ইরান। রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও ভিসা জটিলতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বেস ক্যাম্প করতে পারেনি তারা। মেক্সিকোতে অনুশীলন করে ম্যাচের আগে আমেরিকা ঢুকতে হচ্ছে দলটিকে। এত বাধার মাঝেও লড়াকু মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে 'টিম মেল্লি'। দুই ম্যাচে দুই পয়েন্ট নিয়ে এখনও নকআউট পর্বে ওঠার আশা বাঁচিয়ে রেখেছে ইরান। সেই স্বপ্নের সওদাগর আলিরেজা। তাঁর জীবনের গল্পই এখন উদাহরণ।
