একটা ক্যুইজ দিয়ে শুরু করা যাক, আমেরিকার মাটিতে স্পেনের জাতীয় দলের সঙ্গে ইতিহাসের প্রথম গোল্ড ডিস্ক পাওয়া গানের সম্পর্ক কী?
আপনি হয়তো ভাবছেন, কোথায় ভারতের স্বাধীনতা পূর্ব যুগের গোল্ড ডিস্ক পাওয়া গান। আর ২০২৬ এসে আমেরিকায় স্পেনের বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026) ফুটবলের অভিযান। এই দুইয়ের মিলের সম্ভাবনা আদৌ কি সম্ভব? তাহলে বলব, সম্ভব। মারাত্মকভাবেই সম্ভব।
৪১-এর সেই বিখ্যাত জ্যাজ ক্ল্যাসিক, গ্লেন মিলার অর্কেস্ট্রার ‘চ্যাটানুগা চু চু’ ইতিহাসের প্রথম গান, যা গোল্ড ডিস্ক পেয়েছিল। আর সেই গানের চ্যাটানুগা শহরের বিখ্যাত বেইলর স্কুলের সবুজ মখমলের মতো মাঠে দাঁড়িয়ে যখন লুই দে লা ফুয়েন্তে তাঁর স্ট্র্যাটেজি সাজাচ্ছেন, তখন টেনেসির পাহাড় ঘেঁষে ট্রেনের একটা নতুন ইঞ্জিন স্টেশন থেকে ছিটকে বেরনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর এই আধুনিক ইঞ্জিনের বয়স, মাত্র ১৮ বছর। লামিনে ইয়ামাল।
কিছু স্প্যানিশ সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধি, যাঁরা এই মুহূর্তে নিউ ইয়র্কে এসেছেন ব্রাজিল ম্যাচ কভার করতে, তাঁদের সঙ্গেও স্পেনের জাতীয় শিবিরের (Spain Football Team) খবর জানতে চাইলে, একটাই শব্দ বেরিয়ে আসছে, ইয়ামাল, ইয়ামাল আর ইয়ামাল। বার্সেলোনা থেকে উড়ে আসা এই এক চিলতে যুবককে নিয়ে স্প্যানিশ মিডিয়া যা শুরু করেছে, তাকে এক কথায় ‘হিস্টিরিয়া’ বলা চলে। কেনই বা বলবে না? গত এপ্রিলে হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটের পর যখন ইয়ামালের সামনে আমেরিকার বিশ্বকাপ প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন লাগছে, সেই মুহূর্তে সমগ্র স্পেনে যেন জাতীয় শোক নেমে এসেছিল। লা ফুয়েন্তের তাসের ঘরের সবচেয়ে দামি টেক্কাটাই তো খসে পড়ার অবস্থায়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর চ্যাটানুগার এই ঐতিহাসিক বেইলর স্কুলের হাই-পারফরম্যান্স সেন্টারে ইয়ামাল যখন আবার পুরোপুরি অনুশীলনে ফিরল, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে স্প্যানিশ মিডিয়া লিখেছিল, “দ্য রেড ফিউরি ইজ ব্যাক!”
শুধু স্প্যানিশ মিডিয়াই বা বলি কেন? নিউ ইয়র্ক অথবা নিউ জার্সির এই যে মেটলাইফ স্টেডিয়াম, সেখান থেকে বের হলে উলটোদিকের বিশাল বিল্ডিংয়ে যে দু’জন ফুটবলারের ম্যুরাল করেছে বিখ্যাত জুতো প্রস্তুতকারী সংস্থা ‘অ্যাডিডাস’, তার মধ্যে একজন ফুটবলারের নাম, লিওনেল মেসি। আরেকজন ইয়ামাল। বিশ্বফুটবলে এই মুহূর্তে এখন এতটাই জনপ্রিয়তা স্পেনের এই বিস্ময় বালকের।
তবে স্প্যানিশ মিডিয়ার খবর কিন্তু শুধু ইয়ামালে আটকে নেই, গোটা দলটার ভেতরকার পরিকল্পনা আর প্রস্তুতি নিয়েও কিন্তু চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। লা ফুয়েন্তের এই দলে কিন্তু এবার অসাধারণ এক ভারসাম্য রয়েছে। মাঝমাঠে রদ্রি আর পেদ্রির মতো মস্তিষ্ক, ডিফেন্সে এমেরিক লাপোর্তের মতো চিনের প্রাচীর, আর গোলপোস্টে নীচে বাজপাখির মতো প্রসারিত, উনাই সিমোনের বিশ্বস্ত হাত। এই অসামান্য, অভিজ্ঞ ডিফেন্সিভ থার্ডের ওপর ভর করেই সামনে ডানা মেলছে ইয়ামাল আর নিকো উইলিয়ামসের তারুণ্যের গতি। পেরুর বিরুদ্ধে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে যখন এই দুই তরুণ স্পিডমাস্টারকে ছাড়া স্পেন মাঠে নেমেছিল, তখন সব থেকেও কিন্তু দলটাকে ভীষণ ছন্নছাড়া লেগেছিল। আর তাতে চ্যাটানুগার জাতীয় শিবিরে ফেরার পর সতীর্থরা যেভাবে ইয়ামাল আর নিকো উইলিয়ামসকে অভ্যর্থনা জানিয়েছে, তাতেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, পেরুর বিরুদ্ধে স্পেনের পারফরম্যান্সে ছন্নছাড়া দেখানোর আসল কারণ কী।
চ্যাটানুগা শহরটার একটা নিজস্ব ঐতিহাসিক গাম্ভীর্য রয়েছে। টেনেসি নদীর পাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বিখ্যাত ‘লুকআউট মাউন্টেন’। আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সেই রক্তক্ষয়ী ‘ব্যাটল অফ চ্যাটানুগা’র সাক্ষী এই অঞ্চল। স্প্যানিশ কোচ লুই দে লা ফুয়েন্তে হয়তো শিবিরে বসে তাঁর ছেলেদের সেই যুদ্ধের ইতিহাস শুনিয়েই উদ্বুদ্ধ করছেন, বিশ্বকাপ অভিযান শুরু আগে। কারণ স্পেনের প্রথাগত তিকিতাকা ফুটবল এখন আর শুধু পাসের ফুলঝুরি নয়, দে লা ফুয়েন্তের ফুটবল মানেই হল, গতি, প্রেসিং আর গতি। সঙ্গে স্ট্র্যাটেজির আধুনিকীকরণ।
১৫ জুন আটলান্টায় কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে স্পেনের বিশ্বকাপ অভিযান। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের বন্ধুরা বলছিলেন, কোচ খুব ভালো করেই জানেন, চোট থেকে ফিরেই ইয়ামাল পক্ষে হয়তো প্রথম ম্যাচেই পুরো ৯০ মিনিট খেলা সম্ভব নয়।। তাই দে লা ফুয়েন্তে হয়তো শুরুতে দানি ওলমো বা ফেরান তোরেসকে দিয়ে আক্রমণ সাজিয়ে ইয়ামালকে দ্বিতীয়ার্ধে ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। কারণ, ইয়ামাল বা নিকো মাঠে থাকা মানেই প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে আতঙ্ক।
ইতিহাসের সেই ‘চ্যাটানুগা চু চু’ ট্রেনটা এক সময় কয়লার ধোঁয়া উড়িয়ে ছুটে চলত আমেরিকার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। এবার টেনেসির এই ঐতিহাসিক পাহাড়ি উপত্যকা থেকে দে লা ফুয়েন্তের ট্রেনটা ছাড়ছে। গন্তব্য? ফুটবল বিশ্বের শেষ সীমানা, যেখানে অপেক্ষা করে আছে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি। আর সেই ট্রেনের ইঞ্জিনে বসে ১৮ বছরের এক তরুণ, যার পায়ে স্পেনের কোটি কোটি মানুষের স্বপ্ন। নাম-লামিন ইয়ামাল।
