বিহারের এক সবজি বিক্রেতার ভিডিও ঘিরে তোলপাড় সোশাল মিডিয়া। অভিযোগ, ফ্যাকাশে শসাকে টাটকা ও চকচকে দেখাতে তাতে মাখানো হচ্ছিল কৃত্রিম সবুজ রং। সেই ভিডিও সামনে আসতেই ফের প্রশ্ন উঠছে, শুধু শসা নয়, আমাদের প্রতিদিনের খাবার থেকে ঠিক কতটা কৃত্রিম রং শরীরে ঢুকছে?
আর ভয়টা এখানেই। কারণ এই রং শুধু রাস্তার খাবারেই নয়, লুকিয়ে রয়েছে শিশুদের টুথপেস্ট, ক্যান্ডি, ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল বা প্রক্রিয়াজাত শস্য, কাশির সিরাপ, চিপস, কেক, আইসক্রিম থেকে শুরু করে প্রায় সব প্যাকেটজাত খাবারেই।
২০২৪ সালে কর্ণাটক, তামিলনাড়ু ও গোয়া সরকার ক্যান্ডি ও মাঞ্চুরিয়ানে রোডামিন বি-র মতো ক্ষতিকর রং নিষিদ্ধ করে। কর্ণাটকে পানিপুরি ও কাবাবেও কৃত্রিম রঙের ব্যবহার নিয়ে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কারণ, খাবারকে বেশি উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় দেখাতে অনেক ছোট দোকান বা রাস্তার বিক্রেতারা সস্তার রাসায়নিক রং ব্যবহার করেন।
খাবারে স্বাস্থ্যঝুঁকি। ছবি: সংগৃহীত
কোন রং বৈধ, কোনটা বিপজ্জনক?
ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফএসএসএআই (FSSAI) সীমিত মাত্রায় ৮ ধরনের সিন্থেটিক রং ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে টারট্রাজিন, সানসেট ইয়েলো, কারমোজিন, অ্যালুরা রেড ও এরিথ্রোসিন। এই রং নির্দিষ্ট মাত্রায় ব্যবহার আইনত অনুমোদিত। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় সেই সীমা মানা হয় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গবেষণায় দেখা গিয়েছে এরিথ্রোসিন বা রেড ডাই-৩ অতিরিক্ত মাত্রায় ব্যবহার থাইরয়েড টিউমারের ঝুঁকি বাড়ায়। সেই কারণেই আমেরিকার এফডিএ (FDA) ধাপে ধাপে এই রং খাদ্যে ব্যবহার বন্ধ করার পথে হাঁটছে।
আমাদের দেশে খাবারে কৃত্রিম রঙের সীমা সাধারণত ১০০ পিপিএম (ppm) পর্যন্ত। কিন্তু বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, কিছু ম্যাঙ্গো শেক, মিষ্টি ও বেকারির খাবারে এই সীমার থেকেও বেশি রং ব্যবহার হয়েছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হল, অনেক জায়গায় খাবারে ব্যবহার হচ্ছে শিল্পকারখানার জন্য তৈরি নিষিদ্ধ রং, যেমন মেটানিল ইয়েলো ও রোডামিন বি। অভিযোগ হলুদ গুঁড়ো, ব্যাসন, লাড্ডু, ক্যান্ডি বা মাঞ্চুরিয়ানের মতো খাবারেও এই রং মিলেছে।
চকচকে দেখলেই সবসময় ভালো নয়। ছবি: সংগৃহীত
শিশুদের শরীরে কী প্রভাব পড়তে পারে?
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কিছু কৃত্রিম খাদ্য রং শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত চঞ্চলতা, আচরণগত পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। যদিও সব শিশুর ক্ষেত্রে একই প্রভাব দেখা যায় না।
চিকিৎসকদের মতে, খাদ্য-রং সরাসরি এডিএইচডি (ADHD) বা মানসিক সমস্যার কারণ, এমন প্রমাণ এখনও মেলেনি। তবে যেসব শিশুর আগে থেকেই আচরণগত সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে উপসর্গ বাড়তে পারে। এ ছাড়া অতিরিক্ত রঙিন প্রসেসড খাবারে সাধারণত পুষ্টিগুণ কম থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে তা শরীরের ক্ষতি করতে পারে।
কীভাবে সতর্ক থাকবেন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, শিশুদের যতটা সম্ভব টাটকা ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ানো উচিত। প্যাকেটজাত খাবার কেনার আগে অবশ্যই লেবেল পড়ে দেখুন। 'আর্টিফিসিয়াল কালার' বা 'সিস্থেটিক কালার' লেখা থাকলে সতর্ক হোন।
খুব বেশি উজ্জ্বল বা অস্বাভাবিক রঙের খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো। চিপস, ক্যান্ডি বা রঙিন স্ন্যাকসের বদলে ফল, দই বা ঘরোয়া খাবার বেছে নিন। কারণ, চকচকে রং দেখলেই খাবার ভালো, এমন ধারণা এখন সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি।
